নিখোঁজদের জন্য প্রতীক্ষা

নিহত ব্যক্তিদের পরিবারে মাতম। যাঁরা বেঁচে আছেন তাঁদের অনেককেই আশ্রয় নিতে হয়েছে খোলা আকাশের নিচে। প্রশাসনের উদ্যোগে ত্রাণ বিতরণ এখনো ভালোভাবে শুরু হয়নি বলে ঝড়ে দুর্গত হাজার হাজার মানুষ রয়েছেন মানবেতর অবস্থায়।


ওদিকে মেঘনাপারে সকিনা বেগম ও রাবেয়া বেগমের মতো অসংখ্য মানুষের চোখ দূরে দিগন্তের দিকে। নিখোঁজ স্বজনরা হয়তো ফিরে আসবেন- এই আশায় তাঁরা পথ চেয়ে আছেন। কিন্তু প্রতীক্ষা আর ফুরায় না।
গত বৃহস্পতিবার ভোররাতের ঝড়ে লণ্ডভণ্ড হয় হাতিয়া, ভোলা ও সন্দ্বীপের বিস্তীর্ণ জনপদ। ঝড়ের আগে মেঘনা ও বঙ্গোপসাগরে গিয়ে এখনো ফেরেননি ভোলার প্রায় ১৪০০ জেলে ও মাঝি-মাল্লা। এ ছাড়া কক্সবাজার উপকূলে নিখোঁজ রয়েছেন পাঁচ শতাধিক জেলে। ওদিকে বরগুনায় ফেরেননি ৬৫ জেলে।
মনপুরায় গতকাল দেখা যায়, নিখোঁজ ব্যক্তিদের জন্য স্বজনরা দিগ্বিদিক ছোটাছুটি করছেন। কেউ যাচ্ছেন সাগর মোহনায় আবার কেউ বা নিকটজনদের খুঁজছেন উত্তাল মেঘনার আঁকাবাঁকা পথে। আ. লতিফ মাঝির বাড়ি মনপুরার হাজিরহাটে। বুধবার রাতে ১০ মাঝি-মাল্লাসহ মেঘনায় মাছ ধরতে যাওয়ার স্মৃতিচারণা করে তিনি বলেন, 'আকাশতন নাইমা কে যেন আমাগরে আচমকা আছার মারছে। রাইতের ঘুটঘুইটা অন্ধকারে আমরা ব্যাবাকে নদীর মইধ্যে হারায়া যাই। ওই রাইতের ঘটনায় আমাগো ৯ জন বাইচা গেলেও ছোট ভাই ফরিদের খোঁজ পাই নাই।' হাজিরহাটের মেঘনাপারে বসে কাঁদছিলেন কুলছুম বিবি। কারণ জিজ্ঞেস করতেই কুলছুম বিবি জোরেই যেন হাউমাউ করে কেঁদে ওঠেন। বলতে থাকেন, 'সেকান্দর তুই কইরে...। তোর মায় তোর লাইগা গাংগের পাড়ে বইয়া আছে।' কুলছুম বিবি জানান, তাঁর ছেলের সঙ্গে মাছ ধরতে যাওয়া মাঝি-মাল্লাদের সবাই ফিরে এলেও খবর নেই সেকান্দরের। একইভাবে নিখোঁজ স্বামীদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন দুই গৃহবধূ সকিনা ও রাবেয়া।
ঝড়ের কবল থেকে ফিরে আসা জেলে ইউনুছ মাঝি, সেলিম মাঝি, জাহাঙ্গীর মাঝি, আবদুর রব মাঝি, কালাম মাঝি ও নীরব মাঝি জানান, শুক্রবার দুপুর পর্যন্ত ৩০০ মাছ ধরার ট্রলার উদ্ধার হয়েছে। এখনো ৪০০ ট্রলার ও ১১০০ জেলে নিখোঁজ রয়েছেন বলে তাঁরা দাবি করেন। মনপুরার হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা ও উপজেলা পল্লী দারিদ্র্য বিমোচন ফাউন্ডেশনের মাঠকর্মী মো. ইসমাইল হোসেন লিটন জানান, তাঁদের এনজিরও ঋণ নেওয়া অনেক জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। এ ছাড়া ঝড়ে বিধ্বস্ত ঘর নির্মাণের জন্য লোক না পাওয়ায় তাঁর মতো ক্ষতিগ্রস্ত পাঁচ শতাধিক লোক এখনো খোলা আকাশের নিচে মানবেতর জীবন যাপন করছেন।
মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. অহিদুল ইসলাম গতকাল বিকেলে বলেন, ঝড়ের শিকার হওয়ার পর গতকাল সকালে উপজেলার ঢালচরে ১২ দিনের এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। জেলে ও মাঝি-মাল্লার অভিযোগের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, ৫২১ ট্রলারের নিখোঁজ রয়েছেন ১৩৮০ জন জেলে। তবে ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত মনপুরা উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম পরিদর্শন করে জেলা প্রশাসক খোন্দকার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ২৫-৩০ জন জেলে এখনো নিখোঁজ রয়েছেন। বাকিরা সবাই ফেরত এসেছেন।
ঝড়ে উপকূলীয় দ্বীপজেলা ভোলার চরফ্যাশন ও মনপুরা উপজেলার চারটি ইউনিয়ন লণ্ডভণ্ড হয়ে যায়। ঘূর্ণিঝড়ে ওই দুই উপজেলায় গতকাল পর্যন্ত ছয়জন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আহত হয়েছে শতাধিক। সহস্রাধিক ঘরবাড়ি বিধ্বস্ত হয়েছে। ঝড়ের কবলে পড়ে শত শত ট্রলার ও একটি সি-ট্রাক ডুবে গেছে।
হাতিয়া : নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার বয়ারচরের চেয়ারম্যান ঘাট থেকে মাঝনদীতে মাছ ধরতে যাওয়া দেড় শতাধিক ট্রলারের মধ্যে ২৬টি গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরে আসেনি। বাংলানিউজকে এ তথ্য দিয়েছেন বয়ারচর চেয়ারম্যান ঘাট মৎস্য সমিতির সাধারণ সম্পাদক আকতার মিয়া। সন্ধ্যায় এ সংবাদ লেখা পর্যন্ত ট্রলারগুলোর খোঁজে সন্ধান তৎপরতা চালাচ্ছিলেন স্থানীয় জেলেরা। তবে সরকারি পক্ষ থেকে কোনো উদ্ধারদল ট্রলার উদ্ধার করতে আসেনি বলে অভিযোগ করেন অনেকেই। প্রশাসনের উদ্ধারদল তৎপর হলে উদ্ধারকাজ আরো এগিয়ে যেত বলেও মন্তব্য করেন তাঁরা।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের গাফিলতিতে হাতিয়ায় ঘূর্ণিঝড়ে এত বেশি ক্ষতি হয়েছে অভিযোগ করে নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম বাংলানিউজকে বলেন, হাতিয়ার জাহাজমারা ইউনিয়নে সাতটি ট্রলার ফিরে এলেও এখন পর্যন্ত শতাধিক ট্রলার নিখোঁজ রয়েছে। এসব ট্রলারের প্রতিটিতে ৭ থেকে ১০ জন করে জেলে রয়েছেন।
কক্সবাজারে পাঁচ শতাধিক জেলে নিখোঁজ : ঝড়ে বঙ্গোপসাগরের কক্সবাজার উপকূলে জেলার অর্ধসহস্রাধিক জেলে নিয়ে কমপক্ষে ৫০টি মাছ ধরার ইঞ্জিনচালিত নৌকা নিখোঁজ রয়েছে। কক্সবাজার জেলা ফিশিং বোট মালিক সমিতির সহসভাপতি নুরুল ইসলাম নুরু জানান, ঝড়ে কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ার ১০০টিরও বেশি নৌকা নিখোঁজ হয়ে যায়। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরে এসেছে অর্ধশতাধিক নৌকা। তিনি জানান, ঝড়ের কবলে পড়ে অনেক নৌযান খুলনা, বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন উপকূলে গিয়ে আশ্রয় নেয়। এবারও এ রকম হয়ে থাকতে পারে। ফিরে আসা জেলেদের উদ্ধৃতি দিয়ে তিনি জানান, ১৪টি ট্রলার সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়ে সাগরে বিলীন হয়েছে।
এ ট্রলারগুলোর মধ্যে রয়েছে মহেশখালীর ঘটিভাঙ্গা এলাকার মান্নান বহদ্দার ও আজগর আলীর মালিকানাধীন দুটি ট্রলার, কক্সবাজার শহরের মধ্যম নুনিয়াছড়া এলাকার জয়নাল আবেদীন কম্পানির মালিকানাধীন এফবি কায়সার, একই এলাকার শফিকুর রহমান কম্পানির মালিকানাধীন এফবি আশা, মহেশখালীর কুতুবজুম এলাকার সিরাজ বহদ্দারের একটি, কক্সবাজার শহরের নতুন বাহারছড়ার সিদ্দিক আহমদ কম্পানির একটি এবং আমির হোসেন কম্পানির একটি ট্রলার রয়েছে। এ ছাড়া এফবি নাফিস, এফবি শাহিন-২, এফবি নুরে জান্নাতুল ফারিসতা, এফবি হিরো নামের আরো চারটি ট্রলার এবং কুতুবদিয়ার বাদশা বহদ্দার, সাধন বহদ্দার ও সফর বহদ্দারের মালিকানাধীন ফিশিং বোট বিধ্বস্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
কুতুবদিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফিরোজ আহমেদ জানান, সাগরে নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
বরগুনা : বরগুনায় ঝড়ের কবলে পড়ে পাথরঘাটার চারটি মাছধরা ট্রলারসহ ৬৫ জন জেলে নিখোঁজ রয়েছেন। পাথরঘাটা ট্রলার মালিক সমিতি গতকাল সকাল থেকে এসব জেলেকে উদ্ধারে অনুসন্ধান শুরু করেছে। এদিকে বৈরী আবহাওয়ার কারণে কয়েক শ ট্রলার পাথরঘাটার বিভিন্ন স্থানে নিরাপদে আশ্রয় নিয়েছে। পাথরঘাটা মৎস্যজীবী ট্রলার শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আবদুল মান্নান ও মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মোস্তফা চৌধুরী জানান, নিখোঁজ ট্রলার চারটি হচ্ছে- এফবি আলাউদ্দীন হাফিজ, এফবি তরিকুল, এফবি এ হোসেন ও এফবি মা। কোস্টগার্ড পাথরঘাটা কন্টিনজেন্টের কমান্ডার লে. নাঈম মো. ইশতিয়াক আহম্মেদ জানান, জেলে নিখোঁজ হওয়া-সংক্রান্ত কোনো তথ্য তাঁদের কাছে নেই। তবে বিষয়টি খোঁজ নিয়ে দেখা হবে।
বিপন্ন জীবন : ভোলার বিচ্ছিন্ন দ্বীপ মনপুরায় গতকাল পর্যন্ত কোনো ধরনের ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি বলে অভিযোগ উঠেছে। দুর্গতরা বলছেন, প্রশাসনের পক্ষ থেকে ত্রাণ বরাদ্দের ঘোষণা করা হলেও বিকেল পর্যন্ত কোনো ত্রাণসামগ্রী পৌঁছেনি সেখানে। চরফ্যাশন উপজেলার বিচ্ছিন্ন ঢালচর এলাকার বহু মানুষ এখনো খোলা আকাশের নিচে বসবাস করছেন বলে জানান স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম পাটোয়ারী। হাজিরহাট ইউনিয়নের বাসিন্দা এনজিওকর্মী লিটন অভিযোগ করেন, তাঁর বিধ্বস্ত ঘরের ভেতর এখন বৃষ্টির পানি পড়ছে। এতে তিনি পরিবারের ১৬ জন সদস্য নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তিনি এ পর্যন্ত কোনো ত্রাণ পাননি বলেও অভিযোগ করেন।
এদিকে গতকাল সকালে ঢাকা থেকে লঞ্চযোগে মনপুরায় এসেছেন ভোলা জেলা প্রশাসক মোস্তাফিজুর রহমান। লঞ্চের ভেতরেই তাঁর সঙ্গে কথা হয় ত্রাণের বিষয়ে। তিনি বলেন ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার জন্য পর্যাপ্ত ত্রাণসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখনো কেন পৌঁছল না, তা ক্ষতিয়ে দেখা হচ্ছে।
একইভাবে লঞ্চযোগে মনপুরায় এসেছেন সেখানকার সাবেক সংসদ সদস্য ও বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক নাজিমদ্দিন আলম। লঞ্চ থেকে নেমেই বিশাল মোটরসাইকেলের বহর নিয়ে তিনি ছুটে যান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার মানুষগুলোর কাছে। তিনি প্রথমে নিহত তিনজনের পরিবারের হাতে ১০ হাজার টাকা করে আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন। ক্ষতিগ্রস্ত মসজিদ, মন্দির ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ অন্যান্য অসহায়দের মধ্যেও আর্থিক সাহায্য প্রদান করেন তিনি। সকাল ১০টায় মনপুরায় ছুটে যান সেখানকার সরকারদলীয় সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ-আল-ইসলাম জ্যাকব। তিনি নিহতের পরিবারসহ ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে তাৎক্ষণিক পাঁচ লক্ষাধিক টাকার অর্থ সাহায্য প্রদান করেন। এ সময় ত্রাণসামগ্রী পৌঁছতে দেরি হওয়ায় তিনি জেলা প্রশাসকের কাছে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন।
মনপুরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. অহিদুল ইসলাম জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য সরকারিভাবে নগদ পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এখন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের মধ্যে ওই টাকা দেওয়া হচ্ছে। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় তিন লাখ টাকা দেওয়া সম্ভব হতে পারে। বাকি অর্থ পর্যায়ক্রমে দেওয়া হবে।
গতকাল হাতিয়া উপজেলা পরিষদ ভবনে এক অনুষ্ঠানে নিহত আট পরিবারকে সংসদ সদস্যের নিজ তহবিল থেকে ১০ হাজার টাকা করে এবং জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা, ২০ কেজি চাল ও দুই বান্ডেল করে ঢেউ টিন বিতরণ করা হয়। হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহিদুর রহমান জানান, জেলা প্রশাসন থেকে এ পর্যন্ত ৫০ টন চাল, দুই লাখ ৬০ হাজার টাকাসহ ১০৬ বান্ডেল টিন বরাদ্দ পাওয়া গেছে, যা বণ্টন শুরু করা হবে।
হাতিয়ার সংসদ সদস্য ফজলুল আজিম কালের কণ্ঠকে বলেন, ঝড়ের খবর পেয়ে তিনি হেলিকপ্টারে করে গত বৃহস্পতিবার বিকেলেই হাতিয়ায় পৌঁছেছেন। তিনি প্রতি নিহত ব্যক্তির পরিবারকে ১০ হাজার টাকা অর্থ সাহায্য দিয়েছেন। এ ছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদেরও নিজ তহবিল থেকে সাহায্য দেওয়া হবে।
ব্যাপক প্রচার ছিল : সরকারের ব্যাপক প্রচার ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও অনাকাঙ্ক্ষিত প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে বলে মন্তব্য করেছেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী। আন্তর্জাতিক দুর্যোগ প্রশমন দিবস-২০১২ উদ্‌যাপন উপলক্ষে গতকাল বিকেলে তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সম্মেলনে মন্ত্রী এ কথা বলেন। তিনি ঝড়ে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেন।
প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে কক্সবাজার অফিস, নিজস্ব প্রতিবেদক নোয়াখালী, ভোলা ও বরগুনা প্রতিনিধির পাঠানো তথ্যের ভিত্তিতে।

No comments

Powered by Blogger.