জনশক্তি রফতানি ও বিশ্ব শ্রমবাজার by শামস সাইদ

বাংলাদেশ একটি জনবহুল দেশ। কর্মক্ষম জনগণের তুলনায় তেমন কর্মসংস্থান বাংলাদেশে নেই। কিংবা সে ধরনের ক্ষেত্র অতি সহজে বাংলাদেশে তৈরি হবে এমনটাও নয়। তাই কর্মসংস্থানের জন্য, নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটানোর জন্যই মানুষ বিদেশে পাড়ি জমায়।


মূলত সত্তর দশক থেকেই বাংলাদেশের শ্রমিকরা মধ্যপ্রাচ্যে পাড়ি দেওয়ার মিছিল শুরু করে। এর আগে কিছু মানুষ বিদেশে গেলেও কর্মসংস্থানের জন্য এভাবে দলবেঁধে পাড়ি দেওয়াটা চোখে পড়ার মতো ছিল না। পরে এর সংখ্যা প্রতিনিয়তই বাড়তে থাকে। এখন এমন পর্যায়ে এসে দাঁড়িয়েছে যে, বাংলাদেশের প্রধান অর্থনৈতিক খাতও এখন বৈদেশিক শ্রমবাজারের ওপর নির্ভর। আর শ্রমবাজারের প্রধান মার্কেট হচ্ছে মধ্যপ্রাচ্য। সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশি শ্রমিক প্রায় আশি লাখ। কিন্তু নানা কারণেই বাংলাদেশ এই বৃহত্তর শ্রম মার্কেট হারাতে বসেছে। শ্রমবাজার বিপর্যয়ের পেছনে কূটনৈতিক ব্যর্থতা অনেকাংশেই দায়ী। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে ড. ইউনূস ও পদ্মা সেতু ইস্যু নিয়ে সম্পর্কের অনেক অবনতি হয়েছে। সৌদি আরবের সঙ্গেও কূটনৈতিক সম্পর্ক তেমন অন্তরঙ্গ নয়। খালাফ হত্যা নিয়ে বাংলাদেশ সন্তোষজনক কোনো জবাব দিতে পারেনি। এ নিয়েও সৌদি আরব বাংলাদেশের ওপর অনেকটা অখুশি। তাছাড়াও সরকার সম্পর্ক উন্নয়নে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। যার রেশ অনেকটা শ্রমবাজারের ওপর পড়েছে। এসব কারণে দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরব বাংলাদেশ থেকে জনশক্তি নিচ্ছে না। তার ওপর মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি দেশে গণতন্ত্রের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ার কারণে বাংলাদেশের অনেক শ্রমিককে শূন্য হাতে ফিরে আসতে হয়েছে। সে সব দেশেও আপাতত শ্রমিক রফতানি বন্ধ রয়েছে।
সম্প্রতি মধ্যপ্রাচ্যের আর এক বড় শ্রমবাজার সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে। হঠাৎ করে আরব আমিরাতে শ্রমবাজার বন্ধ হয়ে যাওয়া বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, সৌদি আরবের পরই এটি হচ্ছে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় শ্রমবাজার। অন্যদিকে দীর্ঘদিন সৌদি আরবে জনশক্তি রফতানি বন্ধ থাকার পরও শিগগিরই সে দেশে জনশক্তি রফতানির কোনো সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না।
বাংলাদেশের প্রধান কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক যে দুটি খাত রয়েছে তার ওপর বারবার অশুভ শক্তি ভর করছে। দেশের গার্মেন্ট শিল্পকে এক প্রকার অশুভ শক্তি নানাভাবেই অস্থির করে তোলে। অন্যদিকে জনশক্তি রফতানির পেছনেও একপ্রকার অশুভ শক্তি কার্যক্রম চালাচ্ছে। যার ফলে জনশক্তি রফতানিতে প্রতিনিয়তই ধস নামছে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, অশুভ শক্তির কালো থাবা থেকে এ দুটি খাত রক্ষা করতে না পারলে অচিরেই কর্মসংস্থান বিপর্যয়ের মধ্যে পড়বে দেশ। সে সঙ্গে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ও ঘটবে। কেননা এই দুটি খাত একটার সঙ্গে অন্যটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। বিশেষ করে এই মুহূর্তে সরকারের জনশক্তি রফতানির দিকে গুরুত্ব আরোপ করা উচিত। পত্রিকায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানতে পারলাম, গত জুলাইয়ে ১১৯ কোটি ডলার রেমিট্যান্স এসেছে। আর গত ঈদের দুই সপ্তাহে প্রবাস থেকে রেমিট্যান্স এসেছে ৭৪ কোটি ডলার। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের মতো রাষ্ট্রের পক্ষে বৈদেশিক কর্মসংস্থান ছাড়া বিকল্প অর্থনৈতিক খাত সৃষ্টি করা কঠিন ব্যাপার। তাছাড়াও গোটা অর্থনৈতিক অবস্থা অনেকটাই নির্ভর করছে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ওপর। বৈদেশিক রেমিট্যান্স কমে গেলে দেশীয় অর্থনীতি হুমকির মুখে পড়বে।
জনশক্তি রফতানিতে যখন এই দুর্যোগের ঘনঘটা তখন আমাদের শ্রম ও প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী বললেন, এ সম্পর্কে মন্ত্রণালয়ের কিছু জানা নেই। এটা শুধু আমাদের জন্য নয়, দেশের জন্যও এক বিস্ময়কর সংবাদ। এই মুহূর্তে সরকারের আরও বেশি সতর্ক হওয়া উচিত। সে সঙ্গে কূটনৈতিক তৎপরতা আরও বৃদ্ধি করতে হবে। যেসব দেশ বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ ঘোষণা করেছে সেসব দেশে গিয়ে কী কারণে বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়া বন্ধ করেছে সেসব সমস্যা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
shamssaid11@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.