ঈদ আনন্দ- মঞ্চে মজার ঘটনা

মামুনুর রশীদ ১৯৬৫ সাল থেকে একজন মঞ্চকর্মী হিসেবে নিজের যেটুকু মেধা-শ্রম আছে, তা মঞ্চের কাজে ব্যয় করার চেষ্টা করছি। এই দীর্ঘ সময়ের নাট্যচর্চায় কখনো মহড়া কক্ষে, আবার কখনো বা মঞ্চে অসংখ্য ঘটনা আমাদের স্মৃতিতে জায়গা নিয়ে আছে।


গুলির ব্যবহার নিয়ে নাটকে প্রায়ই নানা মজার কাণ্ড ঘটে যেত। গুলি তো করব, কিন্তু শব্দ হবে কীভাবে? এ নিয়ে নানা চিন্তা! একসময় ঠিক করা হলো, টেপ রেকর্ডারের মাধ্যমে গুলির শব্দটি করা হবে। কিন্তু নাটকের প্রদর্শনীর সময় ঘটল মজার কাণ্ড! মঞ্চে গুলি করা হয়েছে, কিন্তু অনেকক্ষণ পর হঠাৎ গুলির শব্দ হলো। দর্শকদের মধ্যেও হাসির রোল পড়ে গেল। আরেকবার গুলির শব্দের জন্য পটকা ব্যবহার করা হলো। গুলি করা হচ্ছে একদিকে, আর পটকা ফুটছে অন্যদিকে। যেখান থেকে পটকা ফুটানো হচ্ছে, তা দর্শকেরা দেখতে পাচ্ছে, তাই তারাও হাসছে।
অনেক অভিনেতাকে দেখা যেত তারা অভিনয়ের ব্যাপারে ‘সুপার সিরিয়াস’। নাটক শুরু হওয়ার অনেকক্ষণ আগে থেকেই চরিত্র নিয়ে এত বেশি ভাবতে থাকে যে শেষে দেখা যায় নাটকে তার দৃশ্যটি এসে গেছে, অথচ সে মঞ্চে প্রবেশের কথাটিই ভুলে গেছে। এ রকম অনেকবার অনেকের বেলায় ঘটেছিল।
১৯৯৬ সালে আরণ্যকের নাটক জয়জয়ন্তীর প্রদর্শনী হচ্ছিল মহিলা সমিতি মিলনায়তনে। মিলনায়তনের মাঝখানে কাঠের পাটাতন দিয়ে মঞ্চ তৈরি করা হয়েছিল। ঘটনা হলো, আমাদের দলের দীর্ঘদেহী অভিনেতা ছিলেন আলী মামুন। মঞ্চে প্রবেশের আগে থেকে আমরা খুব শঙ্কায় ছিলাম, যদি তিনি মঞ্চ ভেঙে নিচে পড়ে যান! নাটকে তাঁর দৃশ্যে মামুন মঞ্চে প্রবেশ করলেন এবং পাটাতন ভেঙে যথারীতি নিচে পড়ে গেলেন। দর্শকসহ সবার মধ্যে তখন হাসির রোল। আমরা তখন বিষয়টি তাৎক্ষণিক অভিনয়ের মাধ্যমে সামলে নিয়েছিলাম।
আরেকটি মজার কথা বলে ইতি টানতে চাই। আমার একটি নাতি আছে। ওর নাম জারিফ। বয়স তখন পাঁচ-ছয় বছর। যেই আমি মঞ্চে উঠলাম, তখনই সে দর্শকসারি থেকে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, ‘মিয়া ভাই’!
তারপর আর কি! দর্শকেরা হাসল। আমি অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে অভিনয় চালিয়ে গেলাম।

আফজাল হোসেন
সেলিম আল দীনের কেরামত মঙ্গল নাটকের ঘটনা। ঢাকা থিয়েটার প্রযোজিত এই নাটকে চশমা ডাকাত চরিত্রটি করতাম আমি। এই চরিত্রটি সারাক্ষণ চশমা পরে থাকে, এ জন্যই নাম চশমা ডাকাত। চরিত্রের প্রয়োজনে পুরো নাটকেই কালো চশমা পরে থাকতাম আমি। ওই ডাকাতের ভাষা, আচার-আচরণ, অভিব্যক্তি ছিল অত্যন্ত কুৎসিত। আবার নাটকটিতে আমার সহশিল্পীও তেমন ছিল না। চশমা ডাকাতের বেশির ভাগ সংলাপ ছিল দর্শকের সঙ্গে।
একদিনের ঘটনা। নাটকের একটি দৃশ্যে ভুল করে চশমা ছাড়াই মঞ্চে উঠেছি আমি। মঞ্চে ওঠার পর বুঝতে পারলাম, ভুল হয়ে গেছে। যেহেতু আমার সংলাপগুলো ছিল অশ্লীল, ফলে চশমা পরা অবস্থায় যত সহজে সংলাপ বলতে পারতাম, চশমা ছাড়া দর্শকের চোখে চোখ রেখে ওই অশ্লীল সংলাপ বলা কঠিন হয়ে পড়ল। এমনিতেই চরিত্রটি আমার ব্যক্তিগত জীবনের ঠিক উল্টো। ফলে চশমা ছাড়া মঞ্চে উঠে খুবই অস্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে পড়লাম। নিজেকে সামলাতেই ব্যস্ত তখন আমি। এদিকে আমাকে এভাবে নাস্তানাবুদ হতে দেখে মঞ্চের বাইরে বন্ধুরা তো হেসেই খুন।
ছোটবেলার আরেকটি ঘটনাও যথেষ্ট হাস্যোদ্দীপক। তখন আমি সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র। গ্রামের বন্ধুরা মিলে একবার নবাব সিরাজদ্দৌলা নাটক মঞ্চস্থ করার সিদ্ধান্ত নিলাম। রাত-দিন খেটে মহড়া শেষে মঞ্চে আনা হলো নাটক। বাবা ও দাদাকে খুব ভয় পেতাম আমি। আমার ধারণা ছিল, নাটকটির প্রদর্শনীর দিন তাঁরা আমার অভিনয় দেখতে আসবেন না। আমার বাবা ছিলেন অনেক লম্বা। অনেক মানুষের মধ্যেও সহজে তাঁকে চেনা যেত। সিরাজদ্দৌলা নাটকে অভিনয় করছি, হঠাৎ দেখলাম দর্শকের পেছনে দাঁড়িয়ে একমনে আমার অভিনয় দেখছেন বাবা। আমার চোখে চোখ পড়তেই নিজেকে লুকিয়ে ফেললেন তিনি। ঘটনাটি মনে হলে এখনো নিজের মধ্যে হাসির ঢেউ খেলা করে।

নূনা আফরোজ
মঞ্চে কেটে গেল বেশ কিছু সময়। কিন্তু সেই অর্থে মজার ঘটনা আমার জীবনে তেমন ঘটেনি। আসলে ছোটকাল থেকে আমি সব ব্যাপারে অনেক বেশি সিরিয়াস থাকতাম। সিরিয়াস থাকার কারণেই মজার কিছু ঘটত কম। আমার থিয়েটার-জীবনেও তাই। মজার ঘটনা খুঁজে পাই না।
তবে সিরিয়াস থাকার ফলে কিছু অন্য ধরনের মজার কাণ্ড ঘটেছে। বাস্তবে নয়, স্বপ্নে। যেমন স্কুলজীবনের কথা বলি। স্কুলজীবনে আমি প্রায়ই একটি স্বপ্ন দেখতাম, পরীক্ষা শুরু হয়ে গেছে, অথচ আমি পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে পারিনি। দৌড়াতে দৌড়াতে যখন পরীক্ষার হলে ঢুকব, আমাকে ঢুকতে দেবে না, কারণ আমি প্রবেশপত্র নিয়ে আসিনি। দৌড়ে বাসায় যাচ্ছি প্রবেশপত্র আনতে। পুরোটাই অনিশ্চয়তা, জানি না ফিরে এসে পরীক্ষা দেওয়ার সময় আর থাকবে কি না!
এ রকম একটা অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুমটা ভেঙে যেত।
থিয়েটার নিয়ে এখন আমি প্রায়ই একটা স্বপ্ন দেখি। শো শুরু হয়ে গেছে, আমি পৌঁছাতে পারিনি। হাঁপাতে হাঁপাতে যখন পৌঁছালাম, দেখি কস্টিউম আনিনি। কী করি! কী করি!! ঢাকা শহরে যে ট্রাফিক জ্যাম, আমি কি কস্টিউম এনে আজকের নাটকের শো করতে পারব?
চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে যায়।

আজাদ আবুল কালাম
আমাদের দলের প্রযোজনা সার্কাস সার্কাস-এর একটি আমন্ত্রণ-প্রদর্শনীর ডাক এল। একটি অভিজাত ক্লাবের ছোট্ট মঞ্চে বিশিষ্টজনেরা একটি হাসির নাটক দেখে হাসতে চান। হাসতে হাসতে কুটিকুটি হয়ে গড়াগড়ি খেতে চান। আমরা আনন্দিত। নিয়মিত প্রদর্শনীর বাইরে এ ধরনের আমন্ত্রণ অর্থনৈতিকভাবে দলটির জন্য বেশ লাভজনক। প্রদর্শনী শুরু হওয়ার কথা এক শনিবার সন্ধ্যা সাতটায়, আমরা সব প্রস্তুত। ক্লাবটির পানশালা অভিনয় মঞ্চের ঠিক নিচে। সেখানকার গত রাতের ধ্বংসস্তূপ আমাদের বিশেষ আগ্রহ উদ্রেগ করে, আর হতাশ করে দর্শকসারিতে বসা মাত্র তিনজন দর্শক। তাঁদের মধ্যে একজন আয়োজক, বাকি দুজন বয়সের ভারে এই সন্ধ্যায় ঝিমান। আয়োজক একবার বলেন, প্রদর্শনী আটটায় হলে ভালো হয়। এক ঘণ্টা পেছাল অভিনয়। দ্বিতীয়বার জিজ্ঞেস করলেন, প্রদর্শনী কতক্ষণের? দুই ঘণ্টা শুনে ভ্রু-কুঞ্চন। ৬০ থেকে ৭০ মিনিট করার অনুরোধ।
অগত্যা সাতটার প্রদর্শনী শুরু হয় আটটা ৩০-এ, মাত্র ১২ জন ক্লান্ত দর্শকের সামনে। প্রথম দৃশ্যের পর আমি ইমন, শতাব্দী, রাহুল, লাফিয়ে লাফিয়ে দৃশান্তরে যাই। জাহাঙ্গীর মাথায় হাত দেয়—ওর অ্যান্টি সিন পার হয়ে গেছে ওর অজান্তেই। আমরা তখন সবাই এক অসহায় মানসিক অবস্থায় পতিত হই। আমাদের বেদনা হাসিতে রূপ পায়। আমরা সবাই লক্ষ করি, মঞ্চে আমরা আমাদের হাসি নিয়ন্ত্রণ করতে পারছি না এবং একজন থেকে আরেকজনে হাসি সংক্রমিত হচ্ছে, কেউ জানে না যেন কখন কোন দৃশ্যের মৃত্যু হবে। দুই ঘণ্টার নাটক ৪৫ মিনিটে এক তামাশায় শেষ হয়। আমরা দর্শকদের অভিবাদন করি। হাসির দমক নিয়ন্ত্রণ করতে আমাদের পেট ব্যথা করে, ১২ জন দর্শক হাঁপ ছেড়ে বাঁচার মতো বেদম হাততালি দেয়।
নাটক প্রদর্শনীর হাসির গল্পটি আসলে আমাদের গভীর বেদনার গল্প। প্রদর্শনীর শেষে মলিন আমরা যার যার বাড়ি ফিরি।

আনিসুর রহমান
সময়টা ’৯৫ কি ’৯৬ সাল। ভারতের ওড়িশা গিয়েছিলাম থিয়েটার সেন্টারের হয়ে ইদারা নাটকের শো করতে। নাটকটি মান্নান হীরার লেখা। নির্দেশনা দিয়েছিলেন শহিদুল আলম সাচ্চু। সেখানে মঞ্চটাকে মাটির মঞ্চ বোঝানোর জন্য পুরো মঞ্চ ঢেকে দেওয়া হয়েছিল চট দিয়ে। যা-ই হোক, নাটকে তখন তুমুল উত্তেজনা। দর্শকেরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে আছেন মঞ্চের দিকে। ঠিক এ রকম সময়ে সাচ্চু ভাই মঞ্চে উঠতে গিয়ে মঞ্চের চটের সঙ্গে পা বেঁধে চিতপটাং হয়ে পড়ে গেলেন। আর প্রায় সঙ্গে সঙ্গে সাচ্চু ভাইয়ের সহশিল্পী বলে ওঠল, ‘স্যার, পড়ে গেলেন নাকি?’ সাচ্চু ভাইয়ের অবস্থা তখন ভয়ানক সঙ্গিন। কী করবেন বুঝে উঠতে পারছিলেন না। শেষমেশ নিজের মতো কোনো একটা সংলাপ দিয়ে মঞ্চ থেকে বেরিয়ে এলেন।
মজার ব্যাপার হচ্ছে, সবাই মনে করেছিল এটিও নাটকেরই অংশ। কিন্তু আসলে তা ছিল না। এ ঘটনা যখনই মনে পড়ে, তখনই আমার হাসি পায়।
২০০৪ সালের আর একটি ঘটনা। মহাশ্বেতা দেবীর একটি উপন্যাস অবলম্বনে বিরসা কাব্য নামের নাটক রচনা করেছিলেন মাসুম রেজা। আর নাটকটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন শামসুল আলম। সেই নাটকে এমন একটা দৃশ্য ছিল, আমাকে একা একা কথা বলতে হবে জঙ্গলের সঙ্গে, লতাপাতার সঙ্গে, পোকামাকড়ের সঙ্গে। দৃশ্যটি ছিল প্রায় ৯ থেকে ১০ মিনিটের। আমি যথারীতি অভিনয় করে যাচ্ছি, এমন সময় দেখলাম, মঞ্চে অনেক জীবন্ত আরশোলার ওড়াউড়ি! কী ভয়ানক কাণ্ড! আমি আবার আরশোলাকে ভয় পাই যমের মতো। সুতরাং আমার দলের সবাই ভাবল, এবার নিশ্চয় কোনো না কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলব আমি। কিন্তু শেষাবধি তেমন কোনো অঘটন ঘটেনি। যদিও সেই মুহূর্তে ভীষণ ভয়ের মধ্যে ছিলাম। এই ঘটনাও আমার জীবনের একটা অন্যতম মজার ঘটনা।

No comments

Powered by Blogger.