'ভদ্রলোকের দেশ' বনাম উন্নয়ন by লুৎফর রহমান রনো

শুধু বাংলাদেশে নয়, সারা বিশ্বে 'উন্নয়ন উন্নয়ন', 'দারিদ্র্য দূরীকরণ' ইত্যাদি স্লোগান- বলা উচিত এই সরকারি স্লোগানের ব্যাপকতা এবং অন্যদিকে এর অন্তঃসারশূন্যতার দিকটি আমাদের এ সম্পর্কে ভাবতে বাধ্য করে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থাগুলো সমানতালে এই স্লোগানের পক্ষে যুক্তি, সুফল ও সাফল্যের দৃষ্টান্ত প্রচার করে


চলেছে। এর সূত্র ধরে চীনকে, এখন ভারতকেও আগামী বিশ্বের আর্থিক দুনিয়ার নিয়ন্ত্রক বলে উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করছে। খটকা লাগে, আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক সংস্থা বা উদার বাজারবাজদের প্রচারণায় জাপান ও মালয়েশিয়ার নাম তেমন করে উচ্চারিত হচ্ছে না ইদানীং।
ইদানীং বাংলাদেশের বন্দনা করতেও দ্বিধা করছেন না বিশ্বের মুরবি্বরা। হিলারি তো বললেনই, বাংলাদেশ একটি 'মডেল দেশ', বিশেষ করে নারীর ক্ষমতায়ন, উন্নয়ন সম্ভাবনা ও পরিকল্পনার কারণে। বাংলাদেশের কিছু অর্থনীতিবিদ ও ক্ষমতাসীন ব্যক্তি বলছেন, মধ্যআয়ের দেশরূপে এ দেশের উত্তরণ ঘটবে অচিরেই। এ সবই ভালো কথা, মন্দের মহামারির মধ্যে। সর্বোপরি ডিজিটাল দেশের স্বপ্ন তো আমাদের প্রধানমন্ত্রীর। হ্যাঁ, তবে যে ধারায় উন্নতি সাধনের উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং যুক্তরাষ্ট্র সেই স্বপ্নের পথের সহযোগী হবে- সে উন্নয়নের সম্ভাব্য আকৃতি সম্পর্কে আলোচনা হলো এই সীমিত শব্দের নিবন্ধের লক্ষ্য। শুরুতে প্রায় শত বছর আগের রবীন্দ্রনাথের 'রাশিয়ার চিঠি' থেকে জরুরি উদ্ধৃতি 'মুখে আমরা যাই বলি, দেশ বলতে আমরা যা বুঝি সে হচ্ছে ভদ্রলোকের দেশ। জনসাধারণকে আমরা বলি ছোটলোক; এই সংজ্ঞাটা বহুকাল থেকে আমাদের অস্থিমজ্জায় প্রবেশ করেছে। ছোটলোকদের পক্ষে সকল প্রকার মাপকাঠিই ছোট। তারা নিজেও সেটা স্বীকার করে নিয়েছে। তাদের প্রকাশ অনুজ্জ্বল, অথচ দেশের অন্তত বারো আনা অনালোকিতা। ভদ্র সমাজ তাদের দেখতেই পায় না, বিশ্বসমাজের তো কথাই নেই।'
আজকের বিশ্বে উন্নয়নের যে তোড়জোড় শুরু হয়েছে, তার সুফল ভোগ করছে ওই ভদ্রলোকরা। উদাহরণ রয়েছে একেবারে হাতের কাছে- ভারতে। ভারতের অর্থনৈতিক অগ্রগতির কথা কেউ অস্বীকার করবে না, নব্বইয়ের দশক থেকে ভারত তার বাজারকে বিদেশি পুঁজির কাছে সঁপে দেয়। সরকারি ক্ষেত্রগুলো বেসরকারীকরণ ও ব্যাংক-বিত্ত উদারীকরণের মাধ্যমে অর্থনৈতিক সংস্কার শুরু করে। বর্তমানে হিসাব করে দেখা গেছে, গত কয়েক দশকে ভারতে সৃষ্টি হয়েছে বিরাট একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণী। সংখ্যায় প্রায় ২০ কোটি। পরিসংখ্যানে পাওয়া যায়, ভারতের মোট কৃষিজমির প্রায় ৬০ শতাংশ এবং মোট আয়ের প্রায় ৫০ শতাংশ এরাই উপভোগ করছে। আর এরাই প্রধানত রাজনৈতিক ক্ষমতা ও সামাজিক মর্যাদার অধিকারী। অন্যদিকে প্রায় ৪৫ কোটি মানুষের আয় দৈনিক এক ডলারের কম। মহাজনের দেনার দায়ে অতিষ্ঠ কৃষক আত্মহত্যা করে বছরে শত শত জন। ভারতে বিশ্বের সবচেয়ে বেশি শিশুশ্রমিক। শিশু মৃত্যুর হার অপরিবর্তনশীল। ভারতের চেন্নাইয়ের তিরুপুরে পোশাক শিল্পের (বিশেষ করে সুতি-বোনা) সেরা কেন্দ্র। শুধু সেখানের বস্ত্র শিল্প ২০০৮ সালে আয় করেছিল ৮০ বিলিয়ন, ২০০৯-এ তা উন্নীত হয় ১২০ বিলিয়ন রুপিতে। দেশের এই উন্নয়ন বা ভদ্রলোকদের জন্য যারা নিজেদের জীবন নিঃশেষ করে চলেছে, তাদের জীবনের কথা এরূপ, 'সম্প্রতি জানা গেছে, ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে দুই বছর গণ্য করে তিরুপুরে পোশাক শ্রমিক। তাদের স্বামী-স্ত্রী-সন্তানের আত্মহত্যার সংখ্যা ৯০০ জন। ... এ সংখ্যা ২০০৯ সালে ছিল ৪৯৫ জন।... এ বিপুল আয় আর সমৃদ্ধি এনেছিল যারা, তাদের জীবন পিষে ফেলা দারিদ্র্য, অতিরিক্ত কাজ, নাজুক চাকরি, লে-অফ, জীবন গুঁড়িয়ে দেওয়া কর্জের বোঝা, ঋণদাতাদের ও তাদের পোষা গুণ্ডাদের হাতে হয়রানির ফলে আত্মহত্যা ছাড়া
উপায়ান্তর ছিল না।
বাংলাদেশের উন্নয়নের সূচনা-অধ্যায়ে এসবের ইঙ্গিত শুরু হয়ে গেছে যে তা বলার বাকি থাকে না। আমাদের পোশাকশ্রমিকের খবর অজানা নয়। এই নিপীড়িত শ্রমিকের পক্ষে কেউ কথা বললে তারও যে নিস্তার নেই, সে দৃষ্টান্তও তৈরি হয়েছে, বিশেষ করে আমিনুলের মৃত্যু আমাদের আগামীকালের বার্তা দিচ্ছে। চীনের বিশ্বজয়ী উন্নতির পেছনেও এমন অনেক কান্না জুড়ে আছে। প্রায় ৫০ কোটি মানুষ গ্রাম ছেড়ে শহরে অভিবাসিত হয়েছে। যারা সস্তা নির্মাণকাজে নিয়োজিত রয়েছে বা অত্যন্ত শোচনীয় জীবন যাপন করছে। আর উদ্ভব ঘটেছে প্রায় ৩০ কোটি ভদ্রলোকের (মধ্যবিত্ত শ্রেণীর)। ঢাকাসহ বড় বড় শহরে আমাদেরও ভদ্রলোকদের বিলাসী জীবনযাপন দেখছি, তাদের ঝকঝকে প্রাইভেট গাড়ির কারণে রাস্তায় অন্য কোনো যানের চাকা ঘোরা কঠিন হয়ে উঠেছে। বাড়িভাড়া এমন মাত্রায় বেড়েছে যে কথিত ভদ্রলোক ছাড়া বাকিরা বস্তিতে থাকতে হবে অথবা মূল শহরের বাইরে চলে যেতে বাধ্য হবে।
দুনিয়াজুড়ে যে উন্নয়নের শোরগোল, তার লক্ষ্য এই ভদ্রলোক তৈরি। গরিবের রক্তে-ঘামে কিছুসংখ্যক ভদ্রলোকের জীবনের শান-মান বৃদ্ধি পায়। আর সরকারি তহবিল ও ক্ষমতাবৃত্তের মানুষ হৃষ্টপুষ্ট হবে ঠিকই। দেশের উন্নয়নও হচ্ছে, হবে। কিন্তু 'ছোটলোকের' পরিবর্তন হবে না। বিশেষজ্ঞদের ধারণা বাংলাদেশেও খুদে আম্বানী, টাটা-মিত্তালদের উদয় হবে, আর দেশের ৮০ শতাংশ সম্পদ ভোগ করবে মাত্র ১০ শতাংশ লোক। ৯০ শতাংশ লোকের মধ্যে কাড়াকাড়ি চলবে বাকিটুকু নিয়ে এবং এ বৈষম্য ক্রমে বাড়তেই থাকবে। কারণ অর্থ-সম্পদ দ্রুত একদিকে কেন্দ্রীভূত হবে, অন্যদিকে ঘনীভূত হতে থাকবে দারিদ্র্য।
লেখক : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.