উন্নয়ন ফোরামের বৈঠক-বহুপক্ষীয় যোগাযোগ প্রয়োজন by রাশেদা কে চৌধুরী

বাংলাদেশ উন্নয়ন ফোরাম নামে এখন আমাদের উন্নয়ন সহযোগীদের যে বৈঠক অনুষ্ঠিত হয় আশির দশকে তা হতো এইড কনসোর্টিয়াম নামে। ক্রমাগত বিবর্তনের ফলে এটা হয় প্যারিস কনসোর্টিয়াম। নব্বইয়ের শতকে গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতা নেওয়া পর এর নামকরণ হয় বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরাম বা বিডিএফ।


তখন থেকেই এই ফোরামের গুণগত উত্তরণ লক্ষ করছিলাম। তারা তো আর দাতা নয়, তারা আমাদের উন্নয়ন সহযোগী। এক অর্থে তারা আমাদের দান দেন, এটা কোনো ঋণ না।
উন্নত দেশগুলোর কাছে আমরা একটা উন্নয়নশীল দেশ। আমরা উন্নয়নে সহযোগিতা চাইছি। সেটা এমন অবস্থায় আসা উচিত নয়। এ ক্ষেত্রে এটাকে ঋণ বলা যায়। যে কারণে বাংলাদেশের অবস্থাটা ধীরে হলেও ক্রমাগত উন্নতি হয়েছে। আমরা এখন গ্রহীতার অবস্থান থেকে সহযোগী। এটা একদিনে হয়ে ওঠেনি, এটা হয়েছে ধীরে ধীরে। এখন এমন একটা জায়গায় এসেছে বিশেষ করে গত সপ্তাহে সমাপ্ত বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ফোরামের বৈঠকে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। আমরা এখন আর ভিক্ষা চাই না, এটা এখন দৃশ্যমান। বাংলাদেশ উন্নয়ন কৌশল ঠিক করায় পিআরএসপি প্রণয়ন করেছে। স্বল্পমেয়াদি কৌশলগত পরিকল্পনা হিসেবে উন্নয়ন সহযোগীরা তা মেনে নিয়েছে। কিন্তু সবচেয়ে বড় সহযোগিতাটা হলো বাংলাদেশ তার আগামী পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় ফিরে যেতে যা যা প্রয়োজন তা করতে পেরেছে। সেটাও দাতা সহযোগীরা মেনে নিয়েছে। পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা করা কিন্তু বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত। আগে যেখানে দাতারা পরিকল্পনা দিত, এখন আমরা দিচ্ছি পরিকল্পনা, তারা গ্রহণ করছে। এটা আমাদের জন্য বিরাট অর্জন।
একটা গুণগত পরিবর্তন লক্ষণীয় ছিল প্রস্তুতি প্রক্রিয়ার দিক থেকে। যেমন এই প্রথমবারের মতো সরকারের কর্মকর্তা/নীতিনির্ধারকদের বাইরে সুশীল সমাজের বিশেষজ্ঞদের অতিথি বক্তা হিসেবে অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। এর ফলে এই বিডিএফ বৈঠকে গতানুগতিক ধারণার গুণগত পরিবর্তন হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, যখন সরকার উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে তাদের দর্শন, উন্নয়নচিন্তা ও কৌশলগুলো উপস্থাপন করেছে, তখন সেগুলো নিয়ে দাতারা আলোচনা করেনি। বরং সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গরা আলোচনা করেছেন। আমার মতে, এ ধরনের প্রক্রিয়ায় জনসম্পৃক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রে একটি ইতিবাচক দিক থাকবে। কিন্তু তার পরও মনে হয়েছে যে এই উন্নয়ন দর্শন ও কৌশলগুলো যদি ইতিপূর্বে আরও বৃহত্ পরিসরে আলাপ-আলোচনা ও বৈঠক করে অর্থাত্ এতে জনসম্পৃক্তি বাড়ালে নিশ্চয় সরকার উপকৃত হতো এবং জনগণও বেশি বেশি জানতে পারত। সেখানে গণমাধ্যমকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করার সুযোগ ছিল। প্রথম সে কার্যকরী অধিবেশনটা হয়েছিল, সেখানে শুরুতে সরকারের কার্যপত্র উপস্থাপনের পর সুশীল সমাজের পক্ষ থেকে যিনি বক্তব্য রেখেছেন, তিনি সদ্য অবসরপ্রাপ্ত একজন আমলা। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে বলতে চাই, দেশে বহু দক্ষ, অভিক্ষ ও পেশাদার মানুষ আছেন, যাঁদের দিয়ে প্রারম্ভিক বক্তব্যটা শুরু করলে ভালো হতো।
এখন যে বড় চ্যালেঞ্জটা বাংলাদেশের সামনে সেটা হলো, এই বৈঠকের পরবর্তী কাজগুলো ঠিকঠাক ভাবে করা। বিশেষ করে দুর্নীতি দমন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সরকার যে অঙ্গীকার করেছে, তা কতখানি কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হয় তা এখন দেখার বিষয়। অন্য দিকে উন্নয়ন সহযোগীরা নিজেদের দায়বদ্ধতা ও স্বচ্ছতা রক্ষায় ওই সভায় যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, সেটাও কতখানি রাখা হচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। এ ক্ষেত্রে যৌথ সহযোগিতায় কৌশল নামে উন্নয়ন বাংলাদেশকে যে কৌশলপত্র প্রণয়নের ও বাস্তবায়নের কথা উভয় পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তার কতখানি বাস্তবায়িত হয় তা দেখার জন্য আমরা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করব।
ইস্যুভিত্তিক আলোচনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান সুস্পষ্ট ছিল; কিন্তু সুশাসন, জ্বালানি, পরিবেশ বিপর্যয় ইত্যাদি খাতকে যে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেটা যথাযথভাবে উত্থাপিত হয়নি। একই সঙ্গে মানব উন্নয়নের বিভিন্ন খাত যেমন শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদিতে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত ছিল। তবে মোটামুুটিভাবে প্রত্যাশা, বাংলাদেশ গুণগতভাবে বৈদেশিক সহায়তার ব্যাপারে দিনে দিনে উত্তরিত হবে। বাংলাদেশ এখন এমন স্থানে পৌঁছেছে, যেখানে আমাদের আর সহজে পরমুখাপেক্ষী হতে হবে না। ভবিষ্যতের জন্য এ ধরনের ফোরামের প্রস্তুতিপর্বে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ ও পেশাদার গ্রুপগুলোর সঙ্গে এবং অন্যান্য অংশী যেমন শ্রমজীবী, নারী আন্দোলন এদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে অবস্থানগত পরিবর্তন প্রয়োজন। ইদানীং যেখানে রেডিও, টেলিভিশনের মাধ্যমে ক্রিকেট খেলা থেকে শুরু করে সংসদের অধিবেশন দেখার সুযোগ থাকে, সেখানে কৌশলগতভাবে এই অতিগুরুত্বপূর্ণ ধরনের সভার অধিবেশনগুলো সরাসরি গণমাধ্যমের সহায়তায় প্রচার করা যেতে পারে এবং ওয়েবসাইট ও ই-মেইলের মাধ্যমে মতামত প্রকাশ করার সুযোগ দেওয়া যেতে পারে।
রাশেদা কে চৌধুরী: তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা।

No comments

Powered by Blogger.