ভারতে মাওবাদ-আদর্শ যখন কলুষিত হয় by কুলদীপ নায়ার

বস্তার জঙ্গলের প্রান্তে চিন্তাগুফা নামের ছোট্ট এক গ্রামে ঝুলছে নিরাপদ পর্যটনের সেই দিনগুলোর একটি সাইনবোর্ড: ‘ওয়েলকাম টু হেভেন’। বস্তার জঙ্গল মাওবাদী উগ্র বামপন্থী নকশালের ঘাঁটি। কয়েক দিন আগে এখান থেকেই অপহূত হয়েছেন জেলা ম্যাজিস্ট্রেট অ্যালেক্স পল।


মাওবাদী নকশালপন্থীরা যে বার্তা ছড়িয়ে দিতে চেয়েছেন তা হলো, বিপ্লব আসবে বন্দুকের নল দিয়ে; চীনের কমিউনিস্ট নেতা মাও জে দং কুমিনতাংয়ের হাত থেকে ক্ষমতা ছিনিয়ে নিতে এই দর্শনের চর্চা করতেন।
মাও জে দং কেন সফল হয়েছিলেন, আর নকশালপন্থীরা কেন সফল হতে পারেননি, তা বিপ্লবের ক্ষেত্রে একটা শিক্ষা বলে বিবেচিত হতে পারে। চীনে কমিউনিস্টরা কমিউনিজমের যে আদর্শ অনুসরণ করতেন, জনগণকেও সেই আদর্শে বিশ্বাসী করে তুলতে সক্ষম হয়েছিলেন। ভারতের মাওবাদীরা বছর পঞ্চাশেক আগে পশ্চিমবঙ্গের নকশালবাড়ি গ্রাম থেকে যখন যাত্রা শুরু করেন, তখন তাঁরা নিঃসন্দেহে আদর্শবাদীই ছিলেন। কিন্তু বন্দুকের ব্যবহার করতে করতে তাঁরা পথ হারিয়ে ফেলেন, নিরাপত্তার জন্য তাঁদের আশ্রয় নিতে হয় গভীর জঙ্গলে। তাঁরা ভূমিহীনদের ভূমি দিয়েছেন, কিছু কিছু জায়গায় ‘মুক্তাঞ্চল’ গড়ে তুলেছেন; কিন্তু জনগণের মন জয় করতে পারেননি। মাওবাদীরা ভূমিহীন মজুর আর চাষিদের মধ্যে সমীকরণ করেননি, অথচ তাঁদের ‘বিপ্লবের’ অংশ করতে চেয়েছেন। মাও জে দংয়ের অনুসারীরা ছিলেন জনগণের বাহিনী। মাওবাদীরা কিছু কিছু এলাকায় খুব জোর যা করেছেন, তাতে তাঁদের বলা যায় ভূমি-সংস্কারক। নিরাপত্তার জন্য তাঁরা খোলামেলা অঞ্চলের চেয়ে বেশি পছন্দ করেন গভীর জঙ্গল, পুলিশের সদস্যদের অপহরণ বা হত্যা করেন। তাঁরা স্বীকার করেন যে জনগণের কাছে তাঁদের আদর্শের তেমন কোনো আবেদন নেই। অর্থনৈতিকভাবে অনগ্রসর অঞ্চল বা আদিবাসীদের খনিজসহ অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ রাষ্ট্রীয় মদদে বড় বড় করপোরেশনগুলো গ্রাস করে নিচ্ছে বলে মাওবাদীরা যখন তাদের পক্ষে দাঁড়ান, তখন তাঁরা দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন বটে। কিন্তু তারপর কী ঘটে? কয়েক দশক ধরে ভারতের মাওবাদীরা এটাই করে আসছেন। নিজেদের মতো করে একটা ‘লাল করিডর’ তৈরির বাইরে তাঁরা যাননি, তাঁদের যত বিপ্লব ওই ‘করিডরের’ মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কিন্তু ওই করিডর যে রাষ্ট্র আবার দখল করে নেবে, তা তো সময়ের ব্যাপার মাত্র। কারণ, বন্দুকের নলই যদি সব ক্ষমতার উৎস হয়ে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রের কাছে তো বন্দুক আছে তাঁদের চেয়ে হাজার হাজার গুণ বেশি। আজ হোক আর কাল, ন্যাশনাল কাউন্টার টেররিজম সেন্টার (এনসিটিসি) বিদ্রোহ দমনের জন্য সমন্বিত অভিযান চালাবেই।
কমিউনিস্টরাও (মার্ক্সবাদী) একসময় একই রকমের দ্বিধায় পড়েছিলেন: কোন পথে যাবেন? সশস্ত্র বিপ্লবের, নাকি নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে? শেষ পর্যন্ত তাঁরা নির্বাচনী ব্যবস্থার পথই বেছে নিয়েছেন। স্বাধীন ভারতের প্রথম নির্বাচনে, ১৯৫৭ সালে তাঁরা কেরালা জয় করেছেন। দীর্ঘ সময় ধরে তাঁরা শাসনকার্য চালিয়েছেন পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায়। শেষে তাঁরা কেরালায় ও পশ্চিমবঙ্গে ক্ষমতা হারিয়েছেন এই কারণে যে জনগণের কাছে তাঁরা নিজেদের আবেদন ধরে রাখতে পারেননি। তাঁরা ও তাঁদের ক্যাডাররা রূঢ়ভাবে রাজ্যশাসন করেছেন, কিন্তু শ্রেণীহীন সমাজের আদর্শের প্রতি জনগণকে আকৃষ্ট করতে পারেননি। পশ্চিমবঙ্গের প্রয়াত মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু একবার আমার এক প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, তাঁর সরকার বেশি কিছু করতে পারেনি, কারণ শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে তিনি অনেক পদক্ষেপ নিতে পারেন না, কমিউনিস্ট হিসেবে তিনি যেগুলো নিতে চান।
কমিউনিস্ট ভাবাদর্শে বিশ্বাসী কট্টর শিখরাও একসময় ভীষণ আদর্শবাদী ছিলেন। এমনকি অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে তাঁদের পোস্টারগুলো দেখা যেত লাল কালিতে লেখা; তাঁরা কথা বলতেন এমন এক স্বায়ত্তশাসিত পাঞ্জাব প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন ও প্রতিজ্ঞা নিয়ে, যেখানে সাম্য আর ভ্রাতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হবে। কিন্তু নকশালপন্থীদের মতো তাঁদেরও অবক্ষয় ঘটে, তাঁরাও পরিণত হন এমন এক শক্তিতে, যে শক্তি টিকে থাকার জন্য বা দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অপহরণ আর হত্যার আশ্রয় নেয়। তাঁদের বিপ্লবীপনা ব্যর্থ হয়েছে এ জন্য নয় যে তাঁদের চেয়ে রাষ্ট্রের হাতে বন্দুক আছে বেশি, বরং এই জন্য যে তাঁদের প্রতি জনগণের সমর্থন ছিল সামান্য। আর যেটুকু জনসমর্থন তাঁদের ছিল, সেটুকুও তাঁরা হারাতে থাকেন অর্থহীনভাবে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে যাওয়ার ফলে।
অঙ্গীকার যখন অজুহাতে পরিণত হয়, তখন আদর্শ হারিয়ে যায়। ক্ষমতার উদগ্র বাসনা পেয়ে বসে। এমন পরিস্থিতিতে বিপ্লবী আর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে কোনো পার্থক্য থাকে না। কারণ, উভয়েরই লক্ষ্য অভিন্ন: যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা চাই। আদর্শ পেছনে পড়ে থাকে। উচ্চাভিলাষ আর কর্তৃত্বপরায়ণতা প্রবল হয়ে ওঠে। প্রধান লক্ষ্য হয়ে ওঠে সাফল্য, তা সে যতই ক্ষণস্থায়ী হোক। এর একটি মর্মান্তিক দৃষ্টান্ত হলেন মার্ক্সবাদীরা।
একটা সময় মাওবাদীরা পরিচিতি অর্জন করেছিলেন গরিব ও অসহায় মানুষের রুজি-রোজগার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার অঙ্গীকারে দৃঢ়তার জন্য। কিন্তু তাঁরা বন্দুকবাজে পরিণত হয়েছেন। কঠোর বিধিনিষেধের অধীনে কৃষক ও বেকার লোকেরা সুখী হয় কি না, বলা কঠিন। তা যদি হয়, তাহলে মাওবাদীদের তৈরি করা সব ‘মুক্তাঞ্চল’, যা নাকি গোটা ভারতের ছয় ভাগের এক ভাগ, ‘ধরার বুকে স্বর্গ’ হয়ে উঠত। কেননা ওসব মুক্তাঞ্চলে মাওবাদীরা নিজেরাই নিজেদের রাজা। কিন্তু আমি যতটুকু জানি, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীনে ভারতের অবশিষ্ট অংশের উন্নত এলাকাগুলো জনগণের কাছে মাওবাদীদের মুক্তাঞ্চলগুলোর চেয়ে অনেক ভালো, জনগণের কাছে তাদের জবাবদিহি অনেক অনেক বেশি।
এ কথা সত্য যে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অধীন অঞ্চলগুলোতে পুঁজিবাদী ব্যবস্থার অনেক দ্বন্দ্ব ও বৈপরীত্য আছে, কিন্তু সেখানে কোনো স্বৈরতন্ত্র বা একনায়কত্ব নেই। স্তালিনের অধীন রাশিয়া ছিল বসবাসের জন্য সবচেয়ে খারাপ দেশ। বা তাঁর উত্তরসূরি যাঁরা তার চেয়ে কম কঠোর ছিলেন, তাঁদের আমলের রাশিয়াও ছিল একই রকমের। চীনারা সম্পদশালী হয়েছে, কিন্তু তারা মুক্ত নয়। ‘বিগ ব্রাদার’ সব সময় তাদের ওপর নজর রাখছে। ভারতের মাওবাদীরা নিজেদের জন্য একটা মডেল তৈরি করে নিয়েছেন, সেটা মাও জে দংয়ের দর্শনের কাছাকাছি। কিন্তু তাঁদের উপলব্ধি করা উচিত যে, সর্বোত্তম বিপ্লবগুলোও ব্যর্থ হয়ে গেছে আদর্শের বিচ্যুতি ঘটার কারণে। মূল কথাটা হচ্ছে, যতই চাপ থাকুক না কেন, আদর্শকে কলুষিত করতে হয় না।
অপহরণ, মুক্তিপণ আদায় বা বোমা ফাটানোর মধ্য দিয়ে মাওবাদীরা সাময়িকভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেন, কিন্তু একসময় তাঁরা যেসব আদর্শের স্বপ্ন দেখতেন, সেগুলো এভাবে পূরণ হতে পারে না। লক্ষ্য অর্জনের পন্থাগুলো কী হবে, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পন্থা যদি দূষিত হয়, তাহলে লক্ষ্যও দূষিত হয়ে পড়তে বাধ্য। এই নীতির ভিত্তিতেই মহাত্মা গান্ধী আমাদের স্বাধীনতা এনেছিলেন। মাওবাদী বা অন্য যেকোনো বামপন্থী গোষ্ঠীর ভেবে দেখা উচিত, ৩০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে গান্ধী কেন সফল হয়েছিলেন, আর তাঁরা কেন তার প্রায় দ্বিগুণ সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও লক্ষ্য অর্জন থেকে আগের মতোই অনেক দূরে রয়ে গেলেন।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.