সোহেল তাজকে ছাড়ছে না সরকার by নিখিল ভদ্র

তানজিম আহমেদ সোহেল তাজের প্রতিমন্ত্রীর পদ ত্যাগের বিষয়টি গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের অনুরোধ আমলে নেয়নি সরকার। ফলে প্রতিমন্ত্রী পদে বহাল থাকছেন তিনি। একই সঙ্গে তাঁর ব্যাংক হিসাবে প্রতিমন্ত্রী হিসেবে পারিতোষিক ও অন্যান্য ভাতা পাঠানো হবে।


মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে চিঠি দিয়ে বিষয়টি জানানো হয়েছে সোহেল তাজকে।
অন্যদিকে সংসদ সদস্যের পদ থেকেও সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেননি স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ। তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী পদত্যাগপত্র জমা দেওয়া হয়নি। সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র গ্রহণ করা দূরে থাক, ৯০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে প্রয়োজনে তাঁকে ছুটি দিয়ে তাঁর সদস্য পদ টিকিয়ে রাখা হতে পারে বলে আভাস পাওয়া গেছে স্পিকারের কথায়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভঁূইঞা জানিয়েছেন, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পেশ না করায় তিনি প্রতিমন্ত্রী পদে বহাল থাকছেন। সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর পদত্যাগপত্র রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানোর বিধান রয়েছে।
সরকারের এ অবস্থানের কথা গত বৃহস্পতিবার সোহেল তাজকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে গতকাল বুধবার কালের কণ্ঠকে বলেছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোশাররাফ হোসাইন ভূঁইঞা। তিনি বলেন, 'প্রধানমন্ত্রী যেভাবে বলেছেন আমরা চিঠিতে তারই প্রতিফলন ঘটিয়েছি। এটা রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, এখানে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের কিছু করার নেই।'
গত ১৬ এপ্রিল মন্ত্রিপরিষদ সচিবকে লেখা এক চিঠিতে সোহেল তাজ তাঁর ব্যাংক হিসাবে প্রতিমন্ত্রীর পারিতোষিক ও ভাতা না পাঠানোর অনুরোধ করেছিলেন। পরদিন অন্য এক চিঠিতে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের অনুরোধ করেন। জানা গেছে, ওই অবস্থায় পরবর্তী করণীয় নির্ধারণের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে একটি সারসংক্ষেপ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা পাওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে সোহেল তাজের এমপি হোস্টেলের ঠিকানায় চিঠি পাঠিয়ে সরকারের অবস্থান জানানো হয়েছে।
মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সই করা চিঠিতে বলা হয়েছে, 'গত ৩১ মে ২০০৯ তারিখে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে প্রদত্ত আপনার পদত্যাগপত্র তিনি মহামান্য রাষ্ট্রপতির নিকট পেশ করার কার্যক্রম গ্রহণ করেননি। এ অবস্থায় আপনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতিমন্ত্রী পদে বহাল আছেন। সুতরাং আপনার পদত্যাগ গেজেট বিজ্ঞপ্তি আকারে প্রকাশের প্রশ্ন আসে না। আপনি প্রতিমন্ত্রী পদে বহাল আছেন বিধায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার কার্যালয় প্রচলিত নিয়মে আপনার প্রাপ্য পারিতোষিক ও ভাতাদি আপনার ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা করেছে।'
সোহেল তাজ তাঁর চিঠিতে বেতন-ভাতার জন্য কোথাও কোনো স্বাক্ষর করেন না বলে জানিয়েছিলেন। এর জবাবও দেওয়া হয়েছে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের চিঠিতে। সোহেল তাজকে জানানো হয়েছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের মাসিক পারিতোষিক ও ভাতাদি পরিশোধের জন্য তাঁদের স্বাক্ষরের প্রয়োজন হয় না। দুই মাস ধরে শুধু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নন, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের আওতাধীন সবার বেতন-ভাতা ও পারিতোষিকের টাকা সরাসরি প্রাপকের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ই-ট্রান্সফার করা হচ্ছে।
গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসন থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সোহেল তাজের পদত্যাগপত্র গত ২৩ এপ্রিল স্পিকারের কার্যালয়ে জমা দেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আবু কাওসার। স্পিকার তখন ঢাকার বাইরে ছিলেন। এক দিন পর ফিরে তিনি এ ঘটনা নিয়ে আগামী অধিবেশনে তাঁর সিদ্ধান্ত জানাবেন বলে সাংবাদিকদের জানান। কিন্তু গতকাল স্পিকার এ বিষয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেন। সংসদ ভবনে নিজ কার্যালয়ে তিনি জানান, সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী না হওয়ায় সোহেল তাজের পদত্যাগপত্রটি গ্রহণ করা যায়নি।
স্পিকার বলেন, "কার্যপ্রণালি বিধির ১৭৭(১) বিধিতে বলা হয়েছে, পদত্যাগপত্রে 'পদত্যাগ করতে ইচ্ছুক' কথাগুলো লেখা থাকতে হবে। কিন্তু সোহেল তাজের চিঠিতে সে বিষয়টি উল্লেখ নেই। ওই বিধিতে আরো বলা হয়েছে, পদত্যাগপত্র স্বহস্তে লিখিত হতে হবে। কিন্তু সোহেল তাজের পদত্যাগপত্রটি টাইপ করা।"
স্পিকার আরো বলেন, 'গত ২৩ এপ্রিল বাংলাদেশ সময় ১০টা ৫০ মিনিটে জনৈক আবু কাওসার পদত্যাগপত্রটি জমা দিয়েছেন, যখন আমেরিকার সময় রাত ১২টা ৫০ মিনিট। পদত্যাগপত্রে তারিখ দেওয়া হয়েছে ২৩ এপ্রিল। তাহলে কিভাবে আমেরিকা থেকে মাত্র ৫০ মিনিটে চিঠি বাংলাদেশে পৌঁছাল?'
জমা দেওয়া পদত্যাগপত্রে সোহেল তাজের স্বাক্ষর ও তারিখ ভিন্ন হাতের লেখা বলে দাবি করেন আবদুল হামিদ। তিনি বলেন, 'গণমাধ্যমে সোহেল তাজের চিঠিটি দেখানো হয়েছে। ওই চিঠিতে কোনো তারিখ ছিল না। আমার অফিসে যেটি এসেছে, সেখানে তারিখ লেখা। স্বভাবতই বোঝা যায়, তারিখ অন্য কেউ লিখেছে। একজনের স্বাক্ষর থাকলে সেখানে অন্য কেউ তারিখ লিখতে পারে না। এ ছাড়া স্বাক্ষর ও তারিখ দুই ব্যক্তির আলাদা কালিতে লেখা বলে মনে হয়েছে। সাংবিধানিক কোনো বিষয়ে এ ধরনের কাজ করা যায় না।'
আবু কাওসারের পরিচয় সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে আবদুল হামিদ বলেন, 'একজন এমপি শুধু একজন এমএলএস ও অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর নিয়োগ করতে পারেন। তবে ওই দুজনের নিয়োগ সংসদের মাধ্যমে হতে হবে। আবু কাওসার নামের যিনি পদত্যাগপত্র দিয়েছেন, তাঁর পরিচয় আমাদের কাছে স্পষ্ট নয়। ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে তাঁর পরিচয় জানা গেলেও সংসদের কেউই তাঁকে চেনে না। এ ছাড়া তাঁর নম্বরে যখন স্পিকারের দপ্তর থেকে ফোন করা হয়, তখন সেটি কেউ রিসিভ করেনি। আমি অন্য অফিস থেকে ফোন করিয়ে দেখেছি। তখন ফোন করলে সেটি রিসিভ করা হয়।' তিনি আরো বলেন, 'এ ছাড়া পদত্যাগপত্রটি সোহেল তাজ স্বেচ্ছায় দিয়েছেন কি না সেটা আমি নিশ্চিত নই। তিনি যুক্তরাষ্ট্রে থাকার কারণে সেটা জানার উপায়ও নেই। তিনি যে অস্ত্রের মুখে পদত্যাগপত্র দেননি, সেটা আমি বুঝব কী করে?'
আবদুল হামিদ বলেন, 'স্পিকার হিসেবে আমার কাজ হচ্ছে সংবিধান ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী কাজ করা। তিনি (সোহেল তাজ) সাংবিধানিক ও কার্যপ্রণালি বিধি অনুযায়ী সশরীরে উপস্থিত হয়ে পদত্যাগপত্র জমা দিলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এর বাইরে কিছু করণীয় নেই।'
জানা গেছে, সোহেল তাজের সংসদ অধিবেশনে অনুপস্থিতি ৫৪ কার্যদিবস হয়েছে। টানা ৯০ দিন অনুপস্থিত থাকলে তাঁর সদস্যপদ বাতিল হতে পারে। আর সেটা হতে পারে আগামী বাজেট অধিবেশনেই। তবে তাঁর সদস্যপদ টিকিয়ে রাখার বিষয়ে বিকল্প ভাবা হচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, কোনো সদস্য স্পিকারকে না জানিয়ে টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তাঁর পদ বাতিল হয়ে যাবে। তবে এরপরও স্পিকারের এখতিয়ার রয়েছে। স্পিকার চাইলে তাঁকে ছুটি দিতে পারেন। সোহেল তাজ ছুটি চাননি সে ক্ষেত্রে ছুটির বিষয়টি কেন আসছে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, 'সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরীও তো আমার কাছে ছুটি চাননি। তবে এ দুজনের কেস ভিন্ন। বিষয়টি সময় আসলে দেখা যাবে।'
সোহেল তাজ পদত্যাগপত্র গ্রহণের অনুরোধ জানিয়েছেন কি না জানতে চাইলে স্পিকার বলেন, 'টেলিফোনে তাঁর সঙ্গে আমার আলাপ হয়েছে। তখন তিনি আমাকে চিঠিটি গ্রহণের অনুরোধ করলেও আমি তাঁকে জানিয়েছি, চিঠিটি পরীক্ষা করা হচ্ছে। উনি আমার কাছে সময় জানতে চেয়েছিলেন, কত দিনের মধ্যে এটি গ্রহণ করা হবে। আমি বলেছি, এটা পরীক্ষাধীন বিষয়। সময় নির্দিষ্ট করা সম্ভব নয়।'
মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে সোহেল তাজ প্রতিমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগের প্রায় তিন বছরের মাথায় গত ২৩ এপ্রিল সংসদ সদস্যপদ ছাড়তে পদত্যাগপত্র জমা দেন। রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে তোলপাড় শুরু হয়। ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে বর্তমান সরকার গঠন করা হলে তিনি স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। ওই বছরের জুনে মন্ত্রিসভা থেকে তিনি পদত্যাগ করেন। তবে পদত্যাগের পরও তাঁকে দপ্তরবিহীন মন্ত্রী হিসেবে বহাল রাখে সরকার।

No comments

Powered by Blogger.