গদ্যকার্টুন-ঢাকার গৌরব কেন ঢাকা থাকবে? by আনিসুল হক

ঢাকা দ্বিতীয় হয়েছে। প্রথম হতে পারেনি। প্রথম হয়েছে জিম্বাবুয়ের রাজধানী হারারে। ইস, বাংলাদেশ হারল জিম্বাবুয়ের কাছে! ক্রিকেটে তো আমরা হারাই জিম্বাবুয়েকে। এটাতে হেরে গেলাম! না, এই পরাজয়ে মন খারাপ করবেন না। বরং আগে শুনুন এটা কোন প্রতিযোগিতা। পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহর কোনটা।                                                                                                          


একটি তালিকা প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। মার্সার কোয়ালিটি অব লিভিং সার্ভে আর ইকোনোমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিট একটি জরিপ করে এ তালিকা প্রকাশ করেছে।
পৃথিবীর সবচেয়ে বাসযোগ্য শহরের তালিকায় প্রথম হয়েছে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনা। এর পরে আছে জুরিখ আর জেনেভা। বাংলাদেশের ঢাকা পেয়েছে ১৩৮তম স্থান । অবশ্য এটা যৌথভাবে আছে আলজিয়ার্সের সঙ্গে। এমনকি পাকিস্তানের করাচি, নাইজেরিয়ার লাগোস, সেনেগালের ডাকার শহরও ঢাকার চেয়ে অধিকতর বাসযোগ্য।
৩৯টি সূচকের ভিত্তিতে করা হয়েছে এই জরিপ। উল্লেখযোগ্য বিবেচ্য বিষয়গুলো হলো—নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যকর পরিবেশ, সংস্কৃতি, প্রাকৃতিক পরিবেশ, বিনোদন, রাজনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ও গণপরিবহন ব্যবস্থা।
এসব যদি বিবেচ্য সূচক হয়ে থাকে, তাহলে ঢাকা কেন ১৩৮ নম্বরে থাকবে, ঢাকা উঠে আসবে পৃথিবীর এক নম্বর বসবাসযোগ্য শহরের সম্মানজনক স্থানে।
বিষয়টা আমরা খাতওয়ারি আলোচনা করে দেখতে পারি।
সূচক ১: নিরাপত্তা
এ রকম নিরাপদ শহর পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি আছে কি? এটি হলো একটি অভয়াশ্রম। যেকোনো অপরাধ করে এ শহরে এসে নিরাপদে বসবাস করা যায়। এমনকি অন্য দেশের অপরাধীরা এই দেশে বাসা ভাড়া নিয়ে আরামেই থাকে। কেবল তাদের কাউকে আইনশৃঙ্খলা কর্তৃপক্ষ ধরে যখন বাইরে পাঠিয়ে দেয়, তখনই বিদেশী গণমাধ্যমের মাধ্যমে সেসবের খবর আমরা জানতে পারি।
সূচক ২: শিক্ষা
এ শহরে সরকার বিরোধী দলকে উপযুক্ত শিক্ষা দিয়ে থাকে। সে জন্য নাম পরিবর্তন নামের একটি নতুন ধরনের শিক্ষাপদ্ধতি এ শহরে প্রচলিত আছে। কাজেই শিক্ষার ক্ষেত্রে এ শহর পিছিয়ে আছে—জরিপকারীদের এ দাবি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
সূচক ৩: স্বাস্থ্যসেবা
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে এ শহর বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। যেমন—পৃথিবীতে আর কোথাও কি ক্যান্সারের চিকিত্সা নিশ্চয়তা সহকারে করা হয়? বিনা অপারেশনে পাইলসের চিকিত্সার উপশম অতি অল্প খরচে নিশ্চিতভাবে দেওয়া হয়? এ শহরের পথে-ঘাটে বাসের জানালায় যেসব প্রচারপত্র বিলি করা হয়, তার একটাও যদি প্রমাণ হিসেবে আমরা আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থাপন করি, পুরো পৃথিবী মেনে নিতে বাধ্য হবে যে চিকিত্সাসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ঢাকাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ স্থান। কিংবা আপনি পঙ্গু হাসপাতালের আশপাশে গিয়ে দেখতে পারেন, হাত-পা ভাঙার জন্য কত ক্লিনিক এখানে আপনার সেবায় সদা প্রস্তুত। এমনকি আপনার যদি চিকিত্সার দরকার নাও হয়, তাহলেও আপনার মাথায় বাড়ি দিয়ে এখানে চিকিত্সার ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে। আমাদের ক্লিনিকগুলোর প্রতিনিধিরা এতই তত্পর যে আপনার ডান পা এক ক্লিনিকে তো বাঁ পা আরেক ক্লিনিকে ভর্তি করানোর ব্যবস্থা তারা করে ফেলবে। এর পরেও বলা হবে, এ শহরে স্বাস্থ্যসেবা অপ্রতুল!
সূচক ৪: স্বাস্থ্যকর পরিবেশ
আমাদের পরিবেশ অবশ্যই স্বাস্থ্যকর। এ শহরে একজন শিশু জন্ম নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই সব রকম প্রতিকূল পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়া যাতে সে শিখে ফেলতে পারে, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। বাতাসে প্রচুর পরিমাণে কার্বন, ভাসমান কণা, সালফার ইত্যাদি ছড়িয়ে দিয়ে তার সহ্যক্ষমতাকে করে তোলা হয় ঘাতসহ। তাকে খাওয়ানো হয় ওয়াসার বর্জ্যমিশ্রিত পানি। ফলে সবজিতে দেওয়া হয় না না রাসায়নিক, মাছে দেওয়া হয় ফরমালিন। এসব একটু একটু করে ভক্ষণ করে আমাদের শিশুরা লাভ করে অপূর্ব রোগপ্রতিরোধক্ষমতা। এ কারণেই সোয়াইন ফ্লুই বলি আর বার্ডস ফ্লুই বলি, পৃথিবীর সব শহরে সুবিধা করতে পারলেও এই শহরে মোটেও পাত্তা পায়নি।
সূচক ৫: সংস্কৃতি
আমাদের ঢাকা শহরে আছে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, আছে শিল্পকলা একাডেমী। তারা প্রচুর পরিমাণে সংস্কৃতির চর্চা করে থাকে।
সূচক ৬: প্রাকৃতিক পরিবেশ
আমাদের ঢাকা শহরের পুরোটাই প্রাকৃতিক। আমাদের নাগরিকেরা প্রকৃতির ডাকে সাড়া দেয় প্রাকৃতিক পরিবেশেই।
সূচক ৭: বিনোদন
আমাদের নাগরিকদের মনে বিনোদনের কোনোই অভাব নেই। আমাদের রাজনৈতিক নেতারা প্রতিদিনই আমাদের জন্য নানা রকম বিনোদন জুগিয়ে থাকেন। আমরা তা চরমভাবে উপভোগ করে থাকি।
রাজনৈতিক-আর্থিক স্থিতিশীলতা
আমাদের এই দেশের মতো, এ শহরের মতো রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা আর কোথাও নেই। আমরা সব সময়ই সরকারি দলকে সব রকমের আনুকূল্য ও অগ্রাধিকার প্রদান করে থাকি। এ নিয়মের কোনো ব্যতিক্রম কখনো হয় না। অর্থনৈতিক দিক থেকেও আমরা সব সময় একই অবস্থা দীর্ঘকাল ধরে বজায় রাখতে সমর্থ হয়েছি।
সূচক ৮: গণপরিবহনব্যবস্থা
এ দেশে প্রায় এক কোটি লোক প্রতিদিন কাজে যায় একটি সক্রিয় এবং পরিবেশবান্ধব গণপরিবহনব্যবস্থা অবলম্বন করে। তা হলো হাঁটা। আমাদের লাখ লাখ পোশাকশ্রমিক রোজ হেঁটে অফিসে যায়। তাদের এই চলার পথটা যাতে একঘেয়ে না হয়ে পড়ে সে জন্য আমরা ব্যাপারটাকে হার্ডল রেসের মতো আকর্ষণীয় ও উত্তেজনাপূর্ণ করেছি। তাদের জন্য কোনো ফুটপাত নেই, ফুটপাতে আছে নির্মাণসামগ্রী, ফেরিওয়ালা, খোলা ম্যানহোল ইত্যাদি। এসব প্রতিবন্ধক পেরিয়ে লাখ লাখ মানুষ যখন গন্তব্যে পৌঁছায় তখন তাদের প্রতিদিনই যুদ্ধজয়ের আনন্দ দেয়।
এর বাইরেও মামলা জয়ের জন্য আমাদের হাতে রয়েছে এক চরম প্রমাণ। ঢাকা যদি পৃথিবীর সবচেয়ে বসবাসযোগ্য শহরই না হবে তাহলে এ ঢাকা শহরে জমির দাম এত বেশি কেন? কেন ঢাকার জনসংখ্যা রোজ বাড়ছে। কেন ঢাকা শহর থেকে সবাই দলে দলে পালাচ্ছে না?
কাজেই আমাদের উচিত এই জরিপকারী প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করে দেওয়া, যাতে করে তারা ঢাকার নাম ১৩৮ নম্বর থেকে কেটে এক নম্বরে নিয়ে আসতে বাধ্য হয়।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.