গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ট্রাকের চাপায় একই পরিবারের চারজনসহ পাঁচজন নিহত-সিলেটে বাস-ট্রাক সংঘর্ষে নিহত ৮

সিলেটের বালাগঞ্জ উপজেলায় গতকাল শুক্রবার ভোরে ট্রাকের সঙ্গে বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে জেলা আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি, ঢাকার ব্যবসায়ী, চিকিৎসকসহ আট যাত্রী নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী ও তাঁদের মেয়েসহ ২৭ জন।


এদিকে গতকাল ভোররাতে গাইবান্ধা সদর উপজেলায় ট্রাকের চাপায় নিহত হয়েছেন পাঁচজন।
বালাগঞ্জে নিহত ব্যক্তিরা হলেন: সিলেটের আওয়ামী লীগ নেতা মুক্তিযোদ্ধা ইফতেখার হোসেন শামীম (৬২), ঢাকার কেরানীগঞ্জের কালিন্দী এলাকার ব্যবসায়ী আবদুল বাতেন (৪৫), তাঁর ছেলে আবির হোসেন (২০) ও ভাগনে অপু (২৪), মিরপুরের চিকিৎসক আফজাল হোসেন (৪৫), দক্ষিণ শাহজাহানপুরের অফিসার্স কলোনির রাজেশ্বর সিংহ (২৭) এবং হবিগঞ্জের চুনারুঘাটের শওকত আলী (৩৩)। নিহত অপর ব্যক্তির (৩০) পরিচয় মেলেনি।
গাইবান্ধায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন: সদর উপজেলার খামার পীরগাছা গ্রামের শ্যামল চন্দ্র (৩৫), স্ত্রী নমিতা রানী (২৮), ছোট ভাই কলেজছাত্র চন্দন কুমার (২৩) ও খালা কাঞ্চনবালা (৫৫) এবং একই গ্রামের ভ্যানচালক আশরাফ আলী (৫০)।
সিলেট: বালাগঞ্জ থানার পুলিশ ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বালাগঞ্জের ব্রাহ্মণশাসন এলাকায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে সিলেটগামী গ্রিনলাইন পরিবহনের একটি বাসের (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৩৯১০) সঙ্গে পাথরবোঝাই ট্রাকের (ঢাকা মেট্রো ট-১৬-১৪৬৭) মুখোমুখি সংঘর্ষ হয়। এতে বাসটির সামনের অংশ ও ডান পাশ দুমড়েমুচড়ে যায়। ঘটনাস্থলেই আওয়ামী লীগ নেতা ইফতেখারসহ পাঁচজন এবং হাসপাতালে ভর্তির পর তিনজন মারা যান।
দুর্ঘটনার পরপরই ট্রাকের চালক ও তাঁর সহকারী পালিয়ে যায়। পুলিশ দুর্ঘটনাকবলিত গাড়ি দুটি আটক করে।
নিহত ইফতেখার স্ত্রী নাজনিন হোসেন (৪৫) ও মেয়ে শেহরীন হোসেনকে (১৮) নিয়ে সিলেট ফিরছিলেন। বাসে থাকা পাঁচজন যাত্রী ছাড়া বাকি সবাই আহত হয়েছেন। এর মধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় আশরাফ আলী, এমরান আহমদ, বুলবুল আহমদ, জাকির, হোসেন, মোহাম্মদ আলী, শেখ আবু রহমান, দুলাল মিয়া, গোলাম কবির, শাহ মোহাম্মদ জামালউদ্দিন, জাহাঙ্গীর হোসেনসহ ২৭ জনকে সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে।
দুর্ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সরকারি চাকরিজীবী শামসাদ হোসাইন প্রথম আলোকে বলেন, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ১২টা ৫০ মিনিটের দিকে ঢাকার রাজারবাগ থেকে তাঁদের বাসটি সিলেটের উদ্দেশে রওনা হয়। হঠাৎ একটি ট্রাক সামনে থেকে সোজা বাসের ওপর ওঠে যায়।
বালাগঞ্জের তাজপুর ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন ব্যবস্থাপক শামসুল আলম বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে বাসের বডি কেটে হতাহতদের উদ্ধার করতে হয়েছে।
দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে মহাসড়ক (হাইওয়ে) পুলিশের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মোহাম্মদ হাবিব উল্লাহ দুর্ঘটনার প্রাথমিক কারণ সম্পর্কে প্রথম আলোকে বলেন, নিয়ম না মেনে ট্রাকের বডি বড় করা হয়েছে। এতে বাসটি ওভারটেক করতে গিয়ে পর্যাপ্ত জায়গা পায়নি। এ ছাড়া ট্রাকের ধারণক্ষমতা ১২ টন হলে এতে ৪০ টনের মতো পাথর বহন করা হচ্ছিল, যে কারণে চালক ট্রাকটির নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারেননি। ট্রাকের পাশে থাকা লোহার পাতগুলো বাসের ডান পাশে ঢুকে পড়ায় হতাহত বেশি হয়েছে।
জেলা প্রশাসক খান মোহাম্মদ বিলালের মতে, ট্রাকে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি মাল পরিবহন এবং দুটি যানের চালকদের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনাটি ঘটেছে।
দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসাইন।
গাইবান্ধা: অভিমান করে গত বৃহস্পতিবার রাত তিনটার দিকে বিষাক্ত কীটনাশক পান করেন সদর উপজেলার খামার পীরগাছা গ্রামের গৃহবধূ নমিতা রানী। স্ত্রীকে বাঁচাতে রিকশা-ভ্যানে করে গাইবান্ধা সদর হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা দেন শ্যামল। সঙ্গে ছিলেন ছোট ভাই চন্দন ও খালা কাঞ্চনবালা। গ্রামের রাস্তা পেরিয়ে ভ্যানটি গাইবান্ধা-পলাশবাড়ী সড়কে ওঠে। ভোর চারটার দিকে জেলা শহরের পুলিশ সুপার কার্যালয়সংলগ্ন ৭ নম্বর খাদ্যগুদামের সামনে পৌঁছামাত্র একটি ট্রাক ভ্যানটিকে চাপা দিয়ে পালিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলেই শ্যামল, নমিতা, চন্দন ও কাঞ্চনবালার মৃত্যু হয়। হাসপাতালে নেওয়ার পর মারা যান ভ্যানচালক আশরাফ।
পাঁচজনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন গাইবান্ধা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোস্তাফিজার রহমান। তিনি বলেন, এ ব্যাপারে থানায় মামলা হয়েছে। তবে ট্রাকটি আটক করা সম্ভব হয়নি।
গতকাল সকালে খামার পীরগাছা গ্রামে মাতম দেখা গেছে। নিহত শ্যামলের মা মমতা রানী বিলাপ করছেন, ‘হামার ব্যাটার বউয়োক বাঁচপার যায়া দুই ব্যাটা, বোনোক হারানো। হামরা কিচু বুজি ন্যা, তোমরা হামার ব্যাটাক আনি দ্যাও।’ এ সময় ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল শ্যামলের দুই শিশুকন্যা।
একইভাবে প্রলাপ বকছিলেন নিহত ভ্যানচালক আশরাফের স্ত্রী।

No comments

Powered by Blogger.