যত্রতত্র বিলবোর্ড, উদাসীন কেন সিটি করপোরেশন?-বিজ্ঞাপন-বিলাসে মৃত্যুফাঁদ!

কবি শঙ্খ ঘোষ লিখেছিলেন, ‘মুখ ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে’; এখন বিজ্ঞাপন-বিলাস কেবল নগর ও নাগরিকের মুখই ঢাকছে না, প্রাণও কেড়ে নিচ্ছে। গত সোমবারের ঝড়-বৃষ্টিতে ঢাকার গুলশানে বিজ্ঞাপনের বিলবোর্ড ভেঙে পড়ায় প্রাণ গিয়েছে এক তরুণের আর গুরুতর আহত হয়েছেন আরও দুজন। বিলবোর্ড-উপদ্রব নতুন নয়, নতুন নয় এ ধরনের করুণ প্রাণহানি।


ঢাকা শহরে বড় আকারের বিলবোর্ডের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার, অথচ অনুমোদন আছে মাত্র ৩০০টির। বাহারি বিশাল বিশাল বিলবোর্ডে সড়কের দুই পাশের স্থাপনা ও খোলা জায়গাগুলো ভরে আছে। যেখানে-সেখানে মাথা তুলে আছে অনুমোদনহীন বিরাট বিরাট বিলবোর্ড। সেই উদ্ধত মাথা নির্মাণে ত্রুটির কারণে কখনো ঝড়ের আঘাতে, কখনো বা নিজস্ব ভারে ভেঙে পড়ে। জনসমাগমস্থলে এত বড় কাঠামো ভেঙে পড়া মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ারই সমান। গুলশানের ওই ঘটনায় দোকান কর্মচারীর মাথায় সে রকমই আকাশ ভেঙে পড়ায় তাঁর করুণ মৃত্যু হয়। বিধ্বস্ত হয় কয়েকটি গাড়ি এবং গুরুতর আহন হন কয়েকজন পথচারী। এটা নিছক দুর্ঘটনা নয়। নগরের আকাশ ঢেকে দিয়ে, বাতাস বইবার জায়গা আটকে যার যেমন খুশি তেমন হাজার হাজার বিলবোর্ড বসিয়ে দেওয়া স্পষ্টতই ঝুঁকিপূর্ণ ও বেআইনী কাজ।
কিন্তু এই উপদ্রবের বাড়াবাড়ি সামলানোর যেন কেউ নেই। অনুমোদনহীন বিলবোর্ডের আধিক্যের কথা সিটি করপোরেশনের না জানবার কথা নয়। অনেক সময় ভবন-মালিকেরাও বাড়তি কিছু পয়সার জন্য ভবনের সঙ্গের ‘স্পেস ভাড়া’ দেন। কিন্তু এগুলো যে প্রাণঘাতী, সেই হুঁশ কারও নেই। অথচ সরকারি নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু নীতির জায়গায় নীতি থাকে আর আকাশ আটকে যায় বিলবোর্ডে। বিজ্ঞাপনী ব্যবসা বাংলাদেশে এখন রমরমা। টাকার প্রতাপ যেখানে বেশি, সেখানে সিটি করপোরেশন দায়িত্ব পালনে গড়িমসি করে, পুলিশও থাকে উদাসীন আর বেঘোরে মৃত্যু ঘটে সাধারণ মানুষের।
অপরিকল্পিত ও নিয়ম-নীতি না মেনে বানানো ঢাকা শহরের বিলবোর্ডগুলো সামনে ঝড়ের দিনগুলোতে বড় ধরনের বিপর্যয় ঘটাতে পারে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাতাসের গতি, চাপ এসব বিবেচনায় না নিয়ে এবং মজবুত কাঠামো না বানানোর ফলে কখন যে কোন বিলবোর্ড ভেঙে কার মাথায় পড়বে, তা কেউ বলতে পারে না। তাই নগরের স্পেস ব্যবস্থাপনা সুচারু ও কঠোর হওয়া চাই। বিলবোর্ডের সংখ্যা ও আকার-আয়তন অবশ্যই নিয়ম-নীতির আওতায় আনতে হবে। নিষিদ্ধ করতে হবে যত্রতত্র তার ব্যবহার। কারও বিজ্ঞাপন-বিলাস অন্য কারও জন্য প্রাণঘাতী যাতে না হয়, তা দেখার দায়িত্ব সিটি করপোরেশনের।

No comments

Powered by Blogger.