তালিকা প্রকাশ নয়, আইনকে নিজের পথে চলতে দিন-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নতুন ঘোষণা

শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের সম্পর্কে সংসদে হালনাগাদ না করা তালিকা প্রকাশ একটি অভাবনীয়, অবাক করা ঘটনা। এতে প্রমাণ মেলে যে এ মন্ত্রণালয়টি কার্যত নামকাওয়াস্তে চলছে। অদক্ষতা, ঔদাসীন্য ও নিয়ন্ত্রণহীনতা চরমে না পৌঁছালে এমন বিপর্যয় ঘটার কথা নয়।


এটা অবশ্য জাতীয় সংসদের প্রতি বর্তমান শাসক দলের ঢিলেঢালা দৃষ্টিভঙ্গিরও একটা বহিঃপ্রকাশ। সংসদে অসত্য তথ্য দেওয়া সারা দুনিয়ায় গর্হিত ব্যাপার হিসেবেই গণ্য হয়। বাংলাদেশে সংসদে দাঁড়িয়ে অশালীন, অসংসদীয় বক্তব্য প্রদানের একটা ধকল কাটতে না কাটতেই এ ঘটনা ঘটল। সন্ত্রাসী হিসেবে মৃত ব্যক্তির নাম প্রকাশ করার মতো ঘটনার দায়দায়িত্ব গ্রহণের যেন কেউ নেই। কোনো কিছুতেই জবাবদিহির যেন ব্যাপার নেই।
শেষ পর্যন্ত ১৭ মার্চ পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে গিয়ে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যা বললেন তা আরও অগ্রহণযোগ্য। তিনি শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের নতুন তালিকা শিগগিরই প্রকাশের অঙ্গীকার করলেন। এটা চূড়ান্ত বিচারে একটা বালখিল্যতা। তালিকা দিয়ে জনগণ কী করবে। সবচেয়ে বড় কথা, এটা আইনবিরুদ্ধও বটে। প্রচলিত আইনে শীর্ষস্থানীয় সন্ত্রাসীদের তালিকা প্রকাশ করার কোনো বিধান নেই। এ ধরনের তালিকা তৈরির কোনো নীতিমালা আছে বলে আমাদের জানা নেই। দলীয়করণের প্রবণতা উদগ্র হলে এ ধরনের তালিকাও দলীয়করণ-দোষে দুষ্ট হতে পারে।
কোথায় কারা সন্ত্রাস করছে, পুরোনো সন্ত্রাসীদের সঙ্গে নতুন কারা যুক্ত হচ্ছে, কারা কোন ধরনের সন্ত্রাস করছে—এসব নিয়মিত ও নিবিড় নজরদারি ও গোয়েন্দা-তত্পরতার মাধ্যমে চিহ্নিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন গোয়েন্দা সেল রয়েছে, তারা সক্রিয় থাকলে বা তাদের কোনো ধরনের রাজনৈতিক চাপ ছাড়া সে কাজটি করতে দিলে সন্ত্রাসীদের খোঁজখবর পাওয়া কোনো কঠিন কাজ নয়। একই সঙ্গে এসব সন্ত্রাসীর বিরুদ্ধে যদি যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তবে পুরোনো বা নতুন তালিকা প্রকাশের কোনো প্রয়োজন পড়বে না। প্রচলিত আইন ও নিয়মেই সন্ত্রাসীদের দমন করা সম্ভব হবে।
আমরা দেখছি দলীয় বিবেচনায় গুরুতর ফৌজদারি অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের মামলা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। দণ্ডিত পলাতক আত্মসমর্পণ না করেই ‘ক্ষমা’ পাচ্ছে। অনেকেই পাচ্ছে অবৈধ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা। সুপ্রিম কোর্টের রায় তামিল হচ্ছে না। আবার ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীরা’ শিকার হচ্ছে বিচার বিভাগবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের। এ রকম একটি অত্যন্ত অস্বস্তিকর, অমার্জনীয় দায়মুক্তির পরিবেশে আমাদের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জনগণের সামনে নতুন তালিকার মুলা ঝুলিয়েছেন। দেশের অনেক স্থানে সরকারদলীয় ক্যাডারদের কর্মকাণ্ডে মানুষ নিজেদের অনিরাপদ ভাবতে বসেছেন। তখন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসীদের শিগগিরই মূলোত্পাটনের’ ঘোষণায় এক ধরনের অসহায়ত্বই ফুটে ওঠে। তিনি বলেছেন, গডফাদারদের আইনের মুখোমুখি করে জনসমক্ষে তাদের নাম প্রকাশ করা হবে। অপরাধী যে-ই হোক তাকে দ্রুততার সঙ্গে বিচারে সোপর্দ করলেই হলো। জনগণ তখন তাদের নামধাম এমনিতেই জানতে পারবে। কাজের কাজ করার চেয়ে তালিকা প্রকাশে অতি উত্সাহ সংশয়ের জন্ম দেয়।
আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোকে সর্বাগ্রে আইনের আওতায় স্বাভাবিকভাবে চলতে দিতে হবে। রাজনৈতিক বা অন্য যেকোনো অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। তা হলেই কাজের কাজ কিছু হবে।

No comments

Powered by Blogger.