রাজধানীতে বাসচাপায় দুই সাংবাদিক নিহত

রাজধানীতে গতকাল শুক্রবার বাসচাপায় নিহত হয়েছেন দুই সাংবাদিক। সন্ধ্যায় ধানমণ্ডি ২ নম্বর সড়কে স্টার কাবাবের সামনের রাস্তায় দুর্ঘটনার শিকার হন ইংরেজি দৈনিক দ্য ইনডিপেনডেন্টের জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক বিভাষ চন্দ্র সাহা (৪৫)।


এর আগে দুপুরে শাহবাগ এলাকায় রূপসী বাংলা হোটেলের কাছে বাসচাপায় নিহত হন বরিশালের স্থানীয় দৈনিক মতবাদ পত্রিকার ফটো সাংবাদিক শহীদুজ্জামান টিটু (৩৮)। এ নিয়ে পাঁচ মাসে রাজধানীতে সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন সাংবাদিক প্রাণ হারালেন।
মোটরসাইকেলে করে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার অপরাধ বিভাগের প্রধান বিভাষ দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। দুর্ঘটনার পর বিক্ষুব্ধ জনতা বাসটিতে আগুন ধরিয়ে দেয়। কয়েকটি বাসও ভাঙচুর করা হয়। একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। ঘটনাস্থলে উপস্থিত হওয়া সাংবাদিকরা অভিযোগ করেন, পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের নামে শোকাহত সাংবাদিকদেরও লাঞ্ছিত করে। তারা অকারণেই অন্তত চারটি ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে। এ সুযোগে পালিয়ে যায় ঘাতক বাসচালক। সাংবাদিকরা দোষী বাসচালকের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন। এসব দাবির সঙ্গে পুলিশের আচরণের প্রতিবাদে আজ শনিবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচির ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (ক্র্যাব) নেতারা।
এক পুলিশ কর্মকর্তা জানান, সজল নামের চালকের এক সহকারী ও বাসটি আটক করা হয়েছে। এ ঘটনায় ধানমণ্ডি থানায় মামলা হয়েছে। বিভাষের মৃত্যুর জন্য বাসের চালকই দায়ী।
বিভাষের বাবার নাম ইন্দোভূষণ সাহা। বাড়ি জামালপুরে। রাজধানীর উত্তর শাজাহানপুরের ৩৩২ নম্বর বাড়িতে স্ত্রী তপতী সাহাকে নিয়ে থাকতেন তিনি।
বিভাষের মৃত্যু সংবাদ পেয়ে গতকাল সাংবাদিকদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। হাসপাতাল মর্গে স্বজন ও সহকর্মীরা ভিড় করলে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য তৈরি হয়।
এদিকে রিকশাযোগে শাহবাগ যাওয়ার সময় সড়ক দুর্ঘটনার শিকার হন টিটু। সঙ্গে ছিলেন তাঁর বন্ধু ডেসটিনি পত্রিকার সহসম্পাদক জান্নাতুল ফেরদৌস সোহেল। তিনিও আহত হয়েছেন। পথচারী ও পুলিশ বাসচালক নাঈম মোল্লাকে (২৫) বাসটিসহ আটক করেছে। এ ঘটনায় রমনা থানায় মামলা হয়েছে।
স্বজন ও সহকর্মীরা জানান, টিটু অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসা করানোর ও একটি দৈনিকে চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে ঢাকায় এসেছিলেন।
কর্মস্থলের কাছেই মর্মান্তিক মৃত্যু : ধানমণ্ডি থানার এসআই খালেদ মনসুর সাংবাদিকদের জানান, গতকাল সন্ধ্যা পৌনে ৬টার দিকে ২ নম্বর রোডে স্টার কাবাবের বিপরীতে পপুলার হাসপাতালের সামনে জিগাতলা অভিমুখী মৈত্রী পরিবহনের একটি বাস বিভাষের মোটরসাইকেলকে পেছন থেকে ধাক্কা দিলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়।
মো. মুক্তার আহমেদ ও মনির হোসেন নামের দুজন প্রত্যক্ষদর্শী জানান, সাংবাদিকের মোটরসাইকেলটি সিটি কলেজের দিক থেকে জিগাতলার দিকে যাচ্ছিল। মোড় থেকে আসা দ্রুতগতির বাসটি পেছন দিক থেকে ধাক্কা দিলে মোটরসাইকেল আরোহী ছিটকে পড়েন। আর চালক বাস না থামিয়ে তাঁর মাথার ওপর চাকা উঠিয়ে দেয়। তখন হেলমেট ভেঙে তাঁর মাথা থেঁতলে যায়।
বিভাষের সহকর্মীরা জানান, যেখানে দুর্ঘটনা ঘটে তার কাছেই বিভাষের কর্মস্থল। তিনি ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল থেকে অফিসে ফিরছিলেন। ঘটনার পর তাঁর মরদেহ পপুলার হাসপাতালে রাখা হয়।
বিভাষের লাশ সন্ধ্যার পর ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মর্গে নেওয়া হয়। সেখানে স্বজন ও সহকর্মীরা ভিড় করেন। ছুটে যান স্ত্রী তপতী সাহা ও বোন বেবী সাহা। সবার কান্নায় পরিবেশ ভারি হয়ে ওঠে।
প্রগ্রেসিভ লাইফ ইনস্যুরেন্সের সিনিয়র এক্সিকিউটিভ তপতী বিলাপ করে বলেন, 'এই বুঝি ভগবানের ইচ্ছা ছিল? আমি বেঁচে থেকে কী করব? আমাকে হাসপাতালে নিয়ে আসার কথা ছিল, এখন তিনি নিজেই লাশ হয়ে হাসপাতালে...।' প্রসঙ্গত, আজ ঢাকা মেডিক্যালে তপতীর টিউমার অপারেশন হওয়ার কথা। স্ত্রীর অপারেশনের পূর্বপ্রস্তুতি নিতেই বিভাষ হাসপাতালে গিয়েছিলেন।
সহকর্মী রুখসানা ইয়াসমিন জানান, বিভাষ ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যোগ দেন। ১৯৯৪ সালে ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার মাধ্যমে প্রথম সাংবাদিকতা শুরু করেন।
শোক থেকে ক্ষোভ : বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন, ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়ন, জাতীয় প্রেসক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনসহ সাংবাদিকদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা বিভাষের মরদেহ দেখতে হাসপাতালে ছুটে যান। তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় সাংবাদিক নেতারা দোষী বাসচালককে গ্রেপ্তার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার দাবি জানান। নেতারা দুর্ঘটনাস্থলে পুলিশের উসকানিমূলক আচরণেরও প্রতিবাদ জানান। রমনা জোনের এডিসি মাহবুবুর রহমান ও ধানমণ্ডি থানার ওসি মনিরুজ্জামান ঘাতক বাসটিকে রক্ষা ও চালককে পালাতে সহায়তা করেন বলেও অভিযোগ করেন তাঁরা। ক্র্যাব সভাপতি আকতারুজ্জামান লাবলু কালের কণ্ঠকে বলেন, "পুলিশের বিতর্কিত আচরণের প্রতিবাদ এবং বিভাষের 'নির্মম হত্যার' বিচার দাবিতে আজ সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করা হবে। আমরা কালো ব্যাজ ধারণ করব। এখান থেকে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে।"
ধানমণ্ডি থানার ওসি মনিরুজ্জামান দাবি করেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে একটি গুলি ছোড়া হয়েছে। তবে তখন সেখানে কোনো সাংবাদিক ছিলেন না। তিনি জানান, গত রাতে বিভাষের ফুফাতো ভাই রথীন্দ্রনাথ সাহা বাদী হয়ে চালক ও হেলপারকে আসামি করে মামলা করেছেন।
'চালকেরই অপরাধ' : গতকাল রাতে বিভাষের লাশ দেখতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে যান পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার, র‌্যাবের মহাপরিচালক মোখলেসুর রহমান, ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজীর আহমেদ, র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার এম সোহায়েলসহ পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকতারা। পুলিশের আচরণ-সংক্রান্ত সাংবাদিকদের অভিযোগ ও চালককে গ্রেপ্তারের দাবি তোলা হলে পুলিশের মহাপরিদর্শক হাসান মাহমুদ খন্দকার সাংবাদিকদের সমবেদনা জানান। রমনা জোনের ডিসি নূরুল ইসলাম বলেন, 'সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেপরোয়া গতিতে বাস চালানোর কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। বাসচালক ধাক্কা দেওয়ার পর না থামিয়ে চাপা দেয়। হেলপার প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে, তারা বাঁচার জন্যই এ কাজ করেছে।'
জানা গেছে, ময়নাতদন্ত শেষে বিভাষের লাশ রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গের হিমাগারে রাখা হয়। আজ সকাল ১০টায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি চত্বরে নেওয়া হবে। পরে রাজারবাগ শ্মশানঘাটে তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তিন ভাই ও দুই বোনের মধ্যে বিভাষ ছিলেন ছোট।
লাশ হয়ে ফিরলেন টিটু : রমনা থানার এসআই মনির হোসেন জানান, গতকাল দুপুর ১টার দিকে শাহবাগে রূপসী বাংলা হোটেল ক্রসিং এলাকায় মিরপুর থেকে সদরঘাটগামী ইউনাইটেড পরিবহনের একটি বাস একটি রিকশাকে পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেয়। বাসের ধাক্কায় রিকশার দুই যাত্রী ছিটকে পড়েন। ওই সময় ডান পাশে ছিটকে পড়া শহীদুজ্জামান টিটুকে চাপা দিয়ে বাসটি পালানোর চেষ্টা করে। ঘটনাস্থলেই মারা যান টিটু। পুলিশ পথচারীদের সহায়তায় বাসের চালক নাঈম মোল্লাকে আটক করে।
এসআই মনির জানান, নিহত টিটুর লাশ উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়। আহত সোহেলকেও ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। নিহত টিটুর মামাশ্বশুর মাসুদ পারভেজ বাদী হয়ে মামলা করেছেন।
মাসুদ পারভেজ জানান, গত বুধবার স্ত্রী রুমা ও চার বছরের ছেলে তাহসীনকে নিয়ে ঢাকায় আসেন টিটু। জিগাতলার শেরে বাংলা রোডে তাঁর বাসায় ওঠেন তাঁরা। স্ত্রীর চিকিৎসা এবং একটি প্রকাশিতব্য দৈনিকের বরিশাল ব্যুরো অফিসে চাকরির জন্য সাক্ষাৎকার দিতে এসেছিলেন তিনি।
বরিশাল অফিস জানায়, নগরীর কালীবাড়ী রোডে টিটুর বাসা। তাঁর বাবার নাম বদিউজ্জামান। তিন বোন ও দুই ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট ছিলেন। স্ত্রী ও চার বছরের ছেলে তাহসীনকে নিয়ে টিটু পরিবারের সঙ্গেই থাকতেন। স্থানীয় দৈনিক মতবাদ পত্রিকার ফটোসাংবাদিক টিটু এর আগে বরিশালের দক্ষিণাঞ্চল, আজকের বার্তা, আজকের পরিবর্তন, শাহনামা, সত্যসংবাদ ও বরিশাল প্রতিদিন পত্রিকায় কাজ করেছেন।
স্বজনরা জানিয়েছেন, গতকাল ময়নাতদন্ত শেষে টিটুর লাশ বরিশালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে আজ জানাজা শেষে বরিশালে তাঁর লাশ দাফন করা হবে।
উল্লেখ্য, গত ৮ জানুয়ারি 'আমাদের সময়'-এর সাংবাদিক দীনেশ দাস নিহত হন বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে। এর আগে গত বছরের ২৮ ডিসেম্বর কালের কণ্ঠের সিনিয়র রিপোর্টার নিখিল ভদ্র বাসের নিচে পড়ে এক পা হারান।

No comments

Powered by Blogger.