গ্রামীণ ব্যাংকের এমডির অব্যাহতি

আইনগত জটিলতা দেখা দেওয়ায় বাংলাদেশ ব্যাংক গ্রামীণ ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের (এমডি) পদ থেকে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে অব্যাহতি দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ আদেশের বিরুদ্ধে ড. ইউনূস গতকাল বৃহস্পতিবার হাইকোর্টে রিট আবেদন করেছেন। গতকালই রিটের ওপর শুনানি শুরু হয়েছে।


গ্রামীণ ব্যাংকের ৯ জন পরিচালকও বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে আরেকটি রিট করেছেন। এখন আদালতই বিষয়টির আইনি সুরাহা করবেন। তবে বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সিদ্ধান্ত নিয়ে দেশের বিশিষ্টজনদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূস নোবেলবিজয়ী একমাত্র বাংলাদেশি এবং শুধু দেশে নয়, বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত গ্রামীণ ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতাও তিনি। তাঁরই নেতৃত্বে ক্ষুদ্র পরিসর থেকে গ্রামীণ ব্যাংক আজ এক মহীরুহে পরিণত হয়েছে। তাই অনেকের মতে, আইনি জটিলতা থাকলেও তাঁর মতো একজন বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিকে আরো সম্মানজনকভাবে বিদায় দেওয়া যেত। গ্রামীণ ব্যাংকে যেহেতু বাংলাদেশ ব্যাংকের বড় ধরনের বিনিয়োগ আছে, তাই আইনের ব্যত্যয় ঘটলে তারা সেখানে ব্যবস্থা নিতেই পারে। কিন্তু তাড়াহুড়া না করে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে বিষয়টির সমাধান করাটাই সব দিক থেকে কাম্য ছিল। আবার অনেকে মনে করেন, আইনি জটিলতার বিষয়টি নিয়ে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা ও বিতর্ক চলে আসছিল। একজন নোবেলবিজয়ী হিসেবে আইনের প্রতি আরো বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়ে তিনি নিজেই এ পদ থেকে সরে দাঁড়াতে পারতেন। একজন নোবেলবিজয়ী হয়ে সামান্য একটি এমডির পদ কেন তিনি আঁকড়ে থাকতে চাইছেন_অনেকে এমন প্রশ্নও করেছেন।
গ্রামীণ ব্যাংকের ক্ষুদ্রঋণ কর্মসূচি যেমন বিশ্বব্যাপী ব্যাপক প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি এর অনেক সমালোচনাও রয়েছে। দেশের শিল্পপতিদের জন্য যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক সর্বোচ্চ সুদের হার ১৩ শতাংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে, যেখানে বিত্তবানরা ৯ শতাংশ সুদে ফ্ল্যাট কেনার জন্য ঋণ পেতে পারে, সেখানে দেশের অতি দরিদ্র লোকজনকে গ্রামীণ ব্যাংক থেকে ৩০ শতাংশ সুদে ঋণ নিতে হবে কেন? আবার সেই ঋণ আদায়ে জোর-জুলুমেরও অভিযোগ রয়েছে। গ্রামীণ ব্যাংক দেশে নারীদের ক্ষমতায়নকে তাদের একটি প্রধান লক্ষ্য হিসেবে উল্লেখ করে। তাই নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে তারা ঋণ দিয়ে থাকে। কিন্তু ৩০ শতাংশ সুদে ঋণ নিয়ে তারা কতটা সক্ষমতা অর্জন করছে_তা নিয়েও বহু প্রশ্ন আছে। বরং নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়াতে এ দেশের গার্মেন্টশিল্প অনেক বেশি ভূমিকা রেখেছে। নারীদের মধ্যে শিক্ষার প্রসার, নানামুখী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে তাদের কর্মদক্ষতা বৃদ্ধি এবং ব্যাপক হারে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করা গেলেই কেবল নারীদের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে। নারী-পুরুষের সাম্য বৃদ্ধি পাবে। এ ক্ষেত্রে রাষ্ট্রকেই উদ্যোগ নিতে হবে। এনজিও কিংবা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন তাতে সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে।
এ দেশে অতি দরিদ্র লোকজনের ব্যাংকগুলোতে যাওয়ার যথেষ্ট সুযোগ না থাকায় শুধু গ্রামীণ ব্যাংক নয়, অনেক বেসরকারি সংস্থা বা এনজিওই দীর্ঘদিন ধরে ক্ষুদ্রঋণ কার্যক্রমের নামে দরিদ্র শোষণ করে আসছিল। ফলে কার্যক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণ দারিদ্র্য হাস নয়, দারিদ্র্য বৃদ্ধিতেই সহায়তা করেছে। অনেকে একে নব্য মহাজনি ব্যবস্থা বলেও অভিহিত করেছেন। গ্রামীণ ব্যাংকসহ যেসব সংস্থা বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মধ্যে ঋণ প্রদানের ব্যবসা চালিয়ে আসছে, তাদের সবাইকে একটি নির্দিষ্ট আইনের আওতায় আনাটা জরুরি হয়ে উঠেছে। তাই বিশিষ্টজনরা মনে করছেন, বাংলাদেশ ব্যাংক, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) এবং মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (এমআরএ) মিলে এ ক্ষেত্রে ক্ষুদ্রঋণকে দরিদ্রবান্ধব করার উদ্যোগ নিতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.