ফিলিস্তিন-ইসরায়েলের অপরাধ ও তার দিনক্ষণ by ইউরি আভনেরি

কোনো কোনো সপ্তাহে সংবাদকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে একটিমাত্র শব্দ। গত সপ্তাহের সে রকম শব্দটি ছিল ‘দিনক্ষণ’।
ইসরায়েলি সরকার ইসরায়েলের সেরা ‘মিত্র’ (অর্থাৎ যিনি মার্কিন ইসরায়েলপন্থী লবি আইপ্যাকের অতি বিশ্বস্ত) যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনকে অপদস্থ করেছে, আর থুতু ছুড়েছে প্রেসিডেন্ট ওবামার মুখে। একেই বলে ‘মোক্ষম মুহূর্ত’।


পূর্ব জেরুজালেমে নতুন এক হাজার ৬০০ ইহুদি বসতবাড়ি স্থাপনের ঘোষণাটি এক দিন আগে দিলেও এ সমস্যা হতো না। কিংবা আরও তিন দিন পরে দিলেও তা হতো চমৎকার। কিন্তু ঠিক যেদিন জো বাইডেনের সঙ্গে ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর সান্ধ্যভোজে বসার কথা, সেদিনই এমন ঘোষণা বুমেরাং হয়ে গেছে।
পূর্ব জেরুজালেমে আরও এক হাজার কি ১০ হাজার কি এক লাখ ইহুদি বসতি করলেও আসলে আমেরিকার কোনো সমস্যা নেই। সমস্যার কারণ কাজটি নয়, তা করার সময়। ফরাসিরা যেমন বলে, অপরাধীর চেয়ে বাজে হলো আহাম্মক। ইসরায়েল সে রকম এক আহাম্মকিই করেছে। এ সপ্তাহের আলোচিত দ্বিতীয় শব্দটি তাই ‘আহাম্মক’।
রাজনীতিতে সফল হলে নাকি আহাম্মকি করতে হয়। ভোটাররা বিচক্ষণ নেতা পছন্দ করেন না। তাঁদের সামনে সাধারণ মানুষ হীনম্মন্য বোধ করেন। অন্যদিকে বোকাটে নেতাকে তাঁরা মনে করেন আমজনতার কাতারের লোক। তাহলেও রাজনীতিতে আহাম্মকিরও একটা সীমা থাকা চাই। বিষয়টা নিয়ে আমি অনেক ভেবেছি। হয়তো একদিন এ বিষয়ে একটা পিএইচডি থিসিসই লিখে ফেলব।
আমার থিসিসটি হবে এ রকম: অন্যান্য বিষয়ের মতো রাজনীতিতেও হরহামেশা আহাম্মকির ঘটনা ঘটে। কিন্তু এর কোনো কোনোটি বিপর্যয় ঘটানোর আগেই থামে, কোনো কোনোটি চলতেই থাকে। এটাই কি নিয়ম, নাকি ব্যতিক্রম? আমার উত্তর হলো, অবশ্যই এটা একটা নিয়ম। বিষয়টা ঘটে এভাবে: কেউ যখন শাসক মহলের স্বার্থের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো ফালতু কাজ শুরু করে, মাঝপথেই তা থামিয়ে দেওয়া হয়। তা আমলাদের কারও না কারও চোখে পড়ে, এবং তিনি তা ওপরের মহলকে জানান এবং শিগগিরই কেউ না কেউ ঠিক করে যে ভুল হচ্ছে।
অন্যদিকে, কোনো ভুল কাজ শাসক মহলের স্বার্থের পক্ষে গেলে তা চলতেই থাকে। আমলাদের হাত থেকে হাতে যেতে যেতে প্রত্যেকেই সেটাকে স্বাভাবিক বলে ধরে নেয়। এভাবে ভুল তার চরম পরিণতির দিকে গড়াতে থাকে।
আমার মনে আছে, প্রথমে আমি বিষয়টি খেয়াল করেছিলাম ১৯৬৫ সালে। তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট হাবিব বৌরগুইবা একটা শক্ত পদক্ষেপ নিলেন: তিনি জেরিকোর বৃহত্তম শরণার্থীশিবিরে বক্তৃতা দিলেন এবং আরবদের ইসরায়েলকে স্বীকৃতি দেওয়ার আহ্বান জানালেন। শহরটি তখন জর্ডানের শাসনে ছিল। আরব দুনিয়ায় বিষয়টি বিরাট বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল।
কিছু সময় পর একটি ইসরায়েলি সংবাদপত্রে প্রকাশিত হলো যে, বৌরগুইবা জাতিসংঘ সদর দপ্তরে এক সংবাদ সম্মেলনে ইসরায়েলকে ধ্বংসের ডাক দিয়েছেন। ঘটনাটা আমার কাছে অদ্ভুত লাগল। আমি অনুসন্ধান করে দেখলাম, প্রতিবেদক ভুলভাবে ‘হ্যাঁ’কে ‘না’ বুঝেছেন। কীভাবে এটা ঘটল? সাংবাদিক যদি উল্টো ভুলটি করতেন, যেমন গামাল আবদেল নাসের ইসরায়েলকে আরব লীগে গ্রহণের জন্য আবেদন জানিয়েছেন বলে সংবাদ করা হতো, সঙ্গে সঙ্গে সংবাদটি থামিয়ে দেওয়া হতো। কেউ একজন প্রশ্ন তুলত, এমনটা তো হওয়ার কথা নয়, বিষয়টা খতিয়ে দেখো তো? কিন্তু বৌরগুইবার বেলায় কেউ ভাবেনি যে কোনো ভুল হচ্ছে।
গত সপ্তাহে জেরুজালেমে ঠিক এমনটাই ঘটেছে। প্রত্যেক সরকারি কর্মকর্তা জানে যে প্রধানমন্ত্রী পূর্ব জেরুজালেমের ইহুদীকরণ চান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বেশি চান, আর জেরুজালেমের মেয়র তো একপায়ে খাড়া। সুতরাং কোনো আমলা কেন পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনের নির্দেশ আটকে দেবেন? কোনো মার্কিন বাখোয়াজ সফরে আসছে বলে?
অতএব, আসলে সময়টা গুরুত্বপূর্ণ নয়, গুরুত্বপূর্ণ হলো কাজটা কী?
প্রেসিডেন্ট ক্লিন্টন দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়ার আগে তাঁর আমলে মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি আনার ব্যর্থতা ঢাকতে একটি শান্তি পরিকল্পনা ফেঁদেছিলেন। পরিকল্পনাটি যৌক্তিক হলেও তার মধ্যে একটা শুভঙ্করের ফাঁকি ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, জেরুজালেমের ইহুদি অংশ ইসরায়েলের সঙ্গে যাক আর মুসলিম অংশ যাক ফিলিস্তিনের সঙ্গে। তিনি ভেবেছিলেন এবং ঠিকই ভেবেছিলেন যে ইয়াসির আরাফাত এমন আপসে রাজি হবেন। কিন্তু এর পরিণতি সম্পর্কে কোনো ধারণা ক্লিন্টনের ছিল না।
বাস্তবে এটা হলো পূর্ব জেরুজালেমে ইহুদি বসতি স্থাপনের জন্য ইসরায়েলকে খোলাখুলি আমন্ত্রণ জানানো। কেননা পূর্ব জেরুজালেমকে ইহুদিদের দিয়ে ভরিয়ে ফেলা গেলে গোটা তীর্থশহরটিই ইসরায়েলের অংশ করে নিতে বাধা থাকে না। পরের প্রতিটি ইসরায়েলি সরকার এই কাজে তাদের সমস্ত সামর্থ্য নিয়োজিত করে। আমেরিকার প্রত্যেক ইহুদি জুয়াখানার মালিক আর ইউরোপের প্রতিটি পতিতালয়ের ইহুদি মালিককে এই কাজে তহবিল জোগানোর আহ্বান করা হয়।
আর এখন ফিলিস্তিনি বসতি উচ্ছেদের গতি আরও বেড়েছে। শান্তির জন্য এর চেয়ে বড় বাধা আর কিছু হতে পারে না। স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ছাড়া কোনো শান্তি আসবে না, আর পূর্ব জেরুজালেম ছাড়া কোনো ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র কায়েম হবে না। এ বিষয়ে সব ফিলিস্তিনি, মরক্কো থেকে ইরাক পর্যন্ত সব আরব এবং নাইজেরিয়া থেকে ইরান পর্যন্ত সব মুসলিম দ্বিধাহীন।
আমরা যাকে টেম্পল মাউন্ট বলি, তা মুসলমানদের পবিত্র তীর্থক্ষেত্র আল-হারাম আল-শরিফ। এর গম্বুজে ফিলিস্তিনি পতাকা না ওড়া পর্যন্ত কোনো শান্তি সম্ভব নয়। এটাই লৌহ কঠিন বিধান। যতই বেদনাদায়ক হোক আরবরা শরণার্থীদের পুনর্বাসন কিংবা সীমান্ত প্রশ্নেও ছাড় দিতে পারে, কিন্তু তারা পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করার সংকল্প থেকে নড়বে না। সব জাতীয় ও ধর্মীয় আবেগ এই বিন্দুতে একাকার।
কেউ যদি শান্তি বিনষ্ট করতে চায়, তার কাজ হবে এখানেই আঘাত করা। জবরদখলকারী এবং তাদের সমর্থকেরা ভালো করেই জানে, ধীরে ধীরে মাউন্ট টেম্পল দখল করে নিয়ে সেখানকার মসজিদটি উচ্ছেদ করার পরিকল্পনা ত্যাগ না করলে কোনো দিন শান্তি আসবে না। এ পরিকল্পনা নিয়ে এগোনো মানে শান্তির সম্ভাবনাকে চিরতরে ছাই করে দেওয়া।
ইসরায়েলের যারা আরেকটু কম চরমপন্থী, তারা পূর্ব জেরুজালেমে জাতিগত শুদ্ধি চালাতে চায়: আরব বাড়িঘর গুঁড়িয়ে দেওয়া, আরবদের জীবনযাত্রা অসম্ভব করে তোলা। মধ্য ডানপন্থীরা চায়, পূর্ব জেরুজালেমের প্রতিটি ফাঁকা জায়গা ইহুদি বসতি দিয়ে ভরিয়ে দেওয়া হোক। সবার লক্ষ্যই আসলে এক।
ওবামা এবং তাঁর উপদেষ্টারা এই বাস্তবতা ভালো করেই জানেন। গোড়ায় তাঁরা ভেবেছিলেন, মিষ্টি মিষ্টি কথায় তাঁরা নেতানিয়াহু গংকে জবরদখল থামাতে রাজি করিয়ে দুই রাষ্ট্র সমাধানের প্রস্তাবটিকে এগিয়ে নেবেন। কিন্তু শিগগিরই তাঁদের টনক নড়ল যে ব্যাপক চাপ প্রয়োগ ছাড়া এটা সম্ভব নয়। ওদিকে চাপ দেওয়ার জন্য তাঁরাও প্রস্তুত নন।
কিছুটা করুণ চেষ্টাচরিত্র করে ওবামা ক্ষান্ত দেন। রাজি হন পশ্চিম তীরে ‘বসতি স্থাপন বন্ধ’ নামের প্রতারণা মেনে নিতে। এখন সেখানে আগের চেয়ে বিপুল বেগে ভবন নির্মাণ চলছে। নতুন বসতি স্থাপনকারীরাও বেজায় খুশি।
কিন্তু জেরুজালেমের বেলায় ইসরায়েল বা আমেরিকাকে কোনো লোকদেখানো চেষ্টাও করতে হয়নি। নেতানিয়াহু সোজাসুজি ওবামাকে বলে দিয়েছেন, তিনি ভবন বানানো চালিয়ে যাবেন। জবাবে ওবামা মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়েছেন। তাই জো বাইডেনের সফরের সময় ইসরায়েলি কর্মকর্তারা পূর্ব জেরুজালেমে ইসরায়েলি বসতি স্থাপন চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করায় আমেরিকার সঙ্গে ইসরায়েলের সমঝোতার কোনো বরখেলাপ হয়নি। গণ্ডগোলের কারণ অন্যায় কাজটি নয়, তার ঘোষণার ‘সময়’। জো বাইডেনের জন্য এটা সম্মানের প্রশ্ন আর আপসপন্থী ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের জন্য প্রশ্নটা অস্তিত্বের।
বিপুল মার্কিন চাপ এবং তাদের বশংবদ আরব দেশগুলোর ঠেসাঠেসিতে মাহমুদ আব্বাস নেতানিয়াহুর সঙ্গে সমঝোতায় বসতে রাজি হন। অথচ পরিষ্কারভাবে এ ধরনের আলোচনার ফল হলো, ফিলিস্তিনিদের আরও অপমান আর গঞ্জনার মুখে পড়া। ইসরায়েল যখন আগেভাগেই পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপন চালাবে বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে, তখন আর আলোচনার কী থাকতে পারে? যে এলাকাটি একসময় ফিলিস্তিনের হয়ে যাবে, তাতে কি কোনো সুস্থ মস্তিষ্কের ইসরায়েলি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করবে? যে পিঠাটি আপনি খেয়ে শেষ করছেন, তার ভাগ দেবেন বলে আলোচনার প্রস্তাব করা তো প্রতারণা।
মাহমুদ আব্বাস ভাবছেন হয়তো ভালো কিছু হবে। হয়তো ওবামা ইসরায়েলকে চাপ দিয়ে দুই রাষ্ট্র সমাধানকে সম্ভব করে তুলবেন। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। ওবামা তাঁর মুখ থেকে থুতু মুছে ফেলে ইসরায়েলকে বিনয়ী হাসি উপহার দিয়েছেন।
প্রবাদ আছে: কোনো হীনবল লোককে থুতু দিলে সে ভাব করবে যে ওটা থুতু নয়, বৃষ্টির পানি। কিন্তু এই প্রবাদ কি দুনিয়ার সবচেয়ে শক্তিশালী দেশের প্রেসিডেন্টের বেলায় খাটে?

প্যালেস্টাইন ক্রনিকল থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ ফারুক ওয়াসিফ
 ইউরি আভনেরি: লেখক ও সাবেক ইসরায়েলি এমপি, গুশ সালোম শান্তি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা।

No comments

Powered by Blogger.