জন্মদিন-অধ্যাপক রেহমান সোবহান: স্যারের প্রতি by এম এম আকাশ

আমার প্রত্যক্ষ শিক্ষক না হওয়া সত্ত্বেও যে ব্যক্তিকে আমি ‘স্যার’ বলি, তিনি হচ্ছেন অধ্যাপক রেহমান সোবহান। স্যারের সঙ্গে ঠিক প্রথম কবে পরিচয় হয়েছিল, তা এখন আর আমার মনে নেই। কমপক্ষে ৩০-৩৫ বছর তো হবেই। তবে তাঁর সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচিতির আগেই, ১৯৭৪ সালে যখন আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে প্রথম বর্ষে পা দিই, তখনই তাঁর সম্পর্কে জানতে পারি।


তখন তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে তাঁর অন্য সহযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশে ‘সমাজতান্ত্রিক’ অর্থনীতি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রথম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। সে সময় অর্থনীতি বিভাগের করিডরে চারজন অর্থনীতিবিদের নাম খুবই শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হতো। তাঁরা হলেন অধ্যাপক নুরুল ইসলাম, অধ্যাপক আনিসুর রহমান, অধ্যাপক মোশাররফ হোসেন ও অধ্যাপক রেহমান সোবহান। তাঁরা প্রত্যেকেই ছিলেন নিজ নিজ স্বাতন্ত্র্যমণ্ডিত প্রখর ব্যক্তিত্ব। এর মধ্যে অনেকের দৃষ্টিতে সবচেয়ে বেশি স্বপ্নচারী সমাজতন্ত্রী ছিলেন অধ্যাপক আনিসুর রহমান। অধ্যাপক নুরুল ইসলামকে দেখা হতো অনেকটা আদ্যোপান্ত পেশাদার দক্ষ একজন অর্থনীতিবিদ হিসেবে। অধ্যাপক মোশাররফ হোসেনকে ভাবা হতো মাটির অনেক কাছাকাছি একজন ভূমিপত্র হিসেবে। তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক রেহমান সোবহানের বৈশিষ্ট্য ছিল অনেক দিক দিয়েই বেশ কিছুটা অনন্য ও ব্যতিক্রমধর্মী। অধ্যাপক রেহমান সোবহান ছিলেন একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। স্বপ্নের সমাজতন্ত্রের প্রতি হূদয়ের টান থাকলেও বাস্তবতার প্রতি বুদ্ধিদীপ্ত আকর্ষণ তিনি কখনোই ছাড়তে পারেননি। তাই আসলে তিনি হচ্ছেন ‘স্বপ্নের সমাজতন্ত্র’ এবং ‘রূঢ় বাস্তবতার’ মধ্যে সেতুবন্ধন নির্মাণের লক্ষ্যে নিবেদিত একজন অবিরাম একাগ্র গবেষক। একই সঙ্গে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ দেশের একগুচ্ছ সমাজ-মনস্ক তরুণ অর্থনীতিবিদের অন্যতম অভিভাবক বা প্রেরণাদাতা ‘মেন্টর’।
এতগুলো ‘বিশেষণ’ আরোপের পর থমকে দাঁড়িয়ে ভাবছি, ‘ভুল বললাম কি?’ না। আমার মনে হয়, আমি ঠিকই বলেছি। ১৯৯০-এ সোভিয়েত ব্যবস্থার যখন বিপর্যয় হলো, চীনেও যখন নতুন বাজার সমাজতন্ত্রের জয়-জয়কার, তখন আমরা অনেক দুর্বলচিত্ত মানুষকে দেখেছি—হয় ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন অথবা উটপাখির মতো বালিতে মুখ গুঁজে কঠিন সত্যের মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছেন। অধ্যাপক রেহমান সোবহান এ সময় এ দুটোর কোনোটাই করেননি। নিজের পুরোনো স্বপ্নটাকে নতুন বাস্তবতায় সৃজনশীলভাবে পুনর্গঠিত করে নিয়েছেন মাত্র। সৃজনশীল গবেষক অধ্যাপক রেহমান সোবহান এই ৭৫ বছর বয়সে ব্যাপৃত হয়েছেন নতুন এক মৌলিক গবেষণায়। তাঁর গবেষণার বিষয় নতুন ধরনের মালিকানাপদ্ধতি নির্মাণ, যা গোটা দক্ষিণ এশিয়ার শোষিত-দরিদ্রদের শোষণ থেকে মুক্ত করে আমলাতন্ত্রের হাতে বন্দী করে ফেলবে না, বরং পরিণত করবে মূলধারার অর্থনীতির একজন শক্তিশালী নায়কে। সূচিত হবে স্যারের ভাষায় ‘অন্তর্ভুক্তির অর্থনীতি’ (Inclusive Economy) এবং ‘অন্তর্ভুক্তির গণতন্ত্র’ (Inclusive Democracy)। স্যারের এই গবেষণায় কিছুটা শরিক থাকার সুবাদে স্যারের এ বাস্তবভিত্তিক স্বপ্নের কথাটা আমার জানা আছে। স্যার এ গবেষণাটি শুরুর সময় আমাকে বলেছিলেন, এটি হবে তাঁর জীবনের অন্যতম কাজ। স্যার নিশ্চয়ই এ কাজ সমাপ্ত করে যাবেন, এ প্রত্যাশাই আমরা করব।
একজন সফল মানুষ সম্পর্কে প্রায়ই বলা হয়, ‘তাঁর কীর্তির চেয়ে সে মহত্’। অধ্যাপক রেহমান সোবহান সম্পর্কে এ কথা নির্দ্বিধায় আমরা স্বীকার করব। মাত্র ২৬ বছর বয়সে তিনি রচনা করেছিলেন বিখ্যাত ‘দুই অর্থনীতি’ শীর্ষক রচনা—যেটি পাঠ করে তত্কালীন স্বৈরশাসক আইয়ুব খান প্রশ্ন রেখেছিলেন, ‘কে এই ছোকরা?’
এরপর তাঁর লেখা ও অবদান আর থেমে থাকেনি। দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত খাত, চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষ, আশির দশকে পরনির্ভরতার অর্থনীতি, বুর্জোয়া রাষ্ট্রব্যবস্থার সংকট, প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে প্রণীত তিন খণ্ডের টাস্কফোর্স রিপোর্ট, খেলাপি ঋণ ও ব্যাংক সংস্কার নিয়ে গবেষণা, ভূমি সংস্কার নিয়ে মৌলিক গ্রন্থ প্রণয়ন ইত্যাদি গবেষণা কাজের পাশাপাশি তিনি গড়ে তুলেছেন নানা প্রতিষ্ঠান। বিআইডিএসের পরিচালক ছিলেন তিনি। তার পর ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছেন এ দেশের অন্যতম ‘থিংক ট্যাংক’ সিপিডি। এখনো তিনি সিপিডির চেয়ারম্যানের পদে অধিষ্ঠিত থেকে নিয়মিত গবেষণা-চর্চা অব্যাহত রেখেছেন। ২০০৭ সালের মার্চ মাসে সিপিডি থেকে তিন খণ্ডে প্রকাশিত হয়েছে অধ্যাপক সোবহানের নির্বাচিত রচনাবলির সংকলন। অধ্যাপক সোবহানের ৭৩তম জন্মবার্ষিকীতে প্রকাশিত এ সংকলনের ভূমিকা-লেখক অমর্ত্য সেন ভূমিকায় লিখেছেন, ‘রাজনৈতিক অর্থনীতিবিদ এবং ইতিহাসবিদের জন্য এই রচনাবলি একটি রত্নভান্ডারবিশেষ। পাশাপাশি এ রচনাগুলো হচ্ছে এই কর্মময় বিশ্বের একজন নেতৃস্থানীয় যুক্তিবাদী সাহসী মানুষের জীবনের সাক্ষী, যার ভিত্তিতে আমরা তাঁর জীবনকে উদ্যাপনও করতে পারি। এই মহত্ সৃষ্টির অংশবিশেষ আগেই আমার দেখবার সৌভাগ্য হয়েছিল। তখনই আমি ভেবেছিলাম কী বিপুল মহত্ সৃষ্টি সামনে অপেক্ষা করে আছে। তিন খণ্ডে সমাপ্ত এই রচনাবলি সেই মহত্ কর্মময় জীবনের এক বিস্ময়কর বিবরণ।’
স্যারের কি কোনো সমালোচনা নেই? আছে। স্যার নিজেই সম্ভবত সে বিষয়ে খুবই সচেতন। তাঁর মুখে আত্মপ্রশংসা কখনো শুনেছি বলে মনে হয় না। এক সময় তিনি প্রথম আলোয় একটা কলাম লিখতেন, যার শিরোনাম ছিল—
‘আমার সমালোচক আমার বন্ধু’।
স্যারের সমালোচক বন্ধুরা স্যার সম্পর্কে একটি অভিযোগ করেন। আওয়ামী লীগের প্রতি স্যারের ঐতিহাসিক সহজাত পক্ষপাতিত্ব। আমি বলব, মজার ব্যাপার হচ্ছে, আওয়ামী লীগ স্যারকে কিন্তু ততটা বন্ধু এখন আর মনে করে না।

No comments

Powered by Blogger.