রাজনীতি শিল্প ও শিল্পীবৃন্দ by মোহাম্মদ নুরাল হক

রাজনীতি একটি শিল্প এবং এই শিল্পে নতুন সরকারের প্রথম কাজ হলো দেশে 'রুল অব ল' অর্থাৎ 'আইনের শাসন' প্রতিষ্ঠা করা_ বক্তব্যটি মিয়ানমারের বিরোধী দলের নেত্রী অং সান সু চির (সমকাল, ৩ এপ্রিল ২০১২, পৃষ্ঠা ৫), যার নামের সঙ্গে অন্য কোনো বিশেষণ দ্বারা বিশেষায়িত করার প্রয়োজন হয় না। মিয়ানমারে সদ্য অনুষ্ঠিত উপনির্বাচনের বিশাল বিজয়ের পরপরই এহেন বক্তব্য, এই নেত্রীর।


রাজনীতি যদি শিল্প হয়, তাহলে রাজনীতিবিদরা শিল্পী। ফেরা যাক বাংলাদেশে। বাংলাদেশের রাজনীতি শিল্পে তথা রাজনীতির শিল্পী রাজনীতিবিদদের দিকে। সাধারণভাবে শিল্পী বলতেই আমাদের সামনে ভেসে ওঠে সৌম্য, সম্ভ্রান্ত আর আলোকিত এক বা একাধিক মুখ। দল ও মত নির্বিশেষে যাদের কথা ও উপদেশ শুনতে ইচ্ছা করে সময়ের ও সুযোগের সীমাবদ্ধতার বাইরেও।
তাহলে বাংলাদেশের রাজনীতি নামক শিল্পটির ইদানীংকার বেহাল দশা কেন? কেন সাধারণ মানুষ আজকাল রাজনীতিবিদদের এড়িয়ে চলতে চায়? স্বার্থান্বেষীরা ছাড়া বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ কেন আজকাল রাজনীতির বাইরে জীবন পরিচালিত করতে আগ্রহী? বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম! এসবের উত্তর খুবই সহজ ও সরল। বাংলাদেশের রাজনীতি বর্তমানে ক্ষমতা আর ধন-সম্পদের বেড়াজালে আবদ্ধ। এক কথায় আজ দুর্বৃত্তায়নের শিকার। এর দায় ও দায়িত্ব নিশ্চিতভাবে রাজনীতিবিদদেরই।
বাংলাদেশের রাজনীতি কবে, কোথায় ও কীভাবে দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে তা আজ সবচেয়ে বড় বিষয় নয়। বড় বিষয় হলো রাজনীতির শিল্পীদের হাতে রাজনীতি নামক শিল্পকর্মটি দুর্বৃত্তায়িত হয়েছে, হচ্ছে বা হবে কেন? কেন রাজনীতির বেশির ভাগ শিল্পীর প্রতি আজ মানুষের এত অনীহা তথা ঘৃণা? এর প্রধান কারণটিও অং সান সু চি দ্ব্যর্থহীনভাবেই উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেছেন, 'রাজনীতি নামক শিল্পে নতুন সরকারের প্রথম কাজ হলো দেশে রুল অব ল অর্থাৎ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করা।'
বেশ কিছু দিন আগে একটি লেখায় আমি উল্লেখ করেছিলাম, স্বাধীনতার পর থেকে অদ্যাবধি বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি কম-বেশি শাসিত হয়েছে 'আইনের শাসনের' পরিবর্তে 'শাসনের আইন' দ্বারা। অর্থাৎ গত চলি্লশ বছরে সব সরকারই জনগণের সামনে ক্রিয়াশীল চরিত্র প্রদর্শন না করে সব সময়ই নির্বিচারে প্রতিক্রিয়াশীল ভূমিকাই পালন করেছে। রাষ্ট্রের এহেন আচরণের মূল দায়-দায়িত্ব হলো নিশ্চিতভাবেই নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে যাদের অবস্থান তাদের। এ ক্ষেত্রে কথামালার জট সৃষ্টি করে অথবা যে কোনো দোষারোপের যুক্তি উপস্থাপন করে নীতিনির্ধারকদের কোনোভাবে পার পাওয়ার কোনো উপায়ই নেই। সময়ের ব্যবধানে 'স্পেড ইজ অলওয়েজ এ স্পেড'।
বাংলাদেশে বিগত দুই দশকের সামরিক শাসনের দোহাই দিয়ে আমাদের রাজনীতির শিল্পীরা যেভাবে দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত হতে চান, তা নিতান্তই হাস্যকর। কারণ বিগত সাত দশকের সামরিক শাসনের পর আজ মিয়ানমারে সু চির নেতৃত্বেই গণতন্ত্রের সুবাতাস বইতে শুরু করেছে। অথচ সু চির দল কিন্তু এখনও ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। সদ্যসমাপ্ত উপনির্বাচনে মাত্র তেতালি্লশ আসনে জয়ী হয়েই চারদিকে গণতন্ত্রের জয়জয়কারের আশাবাদ। কই সু চির নেতৃত্বে মিয়ানমারে তো দোষারোপের কোনো রাজনীতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না? অথচ এখন সু চিরই এককালের ঘনিষ্ঠ সহচর উ মিন্ত মিয়ানমারের বর্তমান প্রেসিডেন্টের (সামরিক জান্তা) অর্থনৈতিক উপদেষ্টার মতো পদে আসীন।
ঠিক একই রকমের ঘটনা কিন্তু ঘটেছিল দক্ষিণ আফ্রিকায়। স্বাধীনতার পরপরই নেলসন ম্যান্ডেলার ভাইস প্রেসিডেন্ট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল এফ ডবি্লউ ডি ক্লার্ক নামে একজন শ্বেতাঙ্গকে। সে সময় দক্ষিণ আফ্রিকাজুড়ে এই ব্যক্তিটি ঘৃণিত হিসেবে পরিচিত ছিল চরম বর্ণবৈষম্যের হোতা হিসেবে।
সে সময় রাজনীতির বিশ্ববিখ্যাত শিল্পী নেলসন ম্যান্ডেলাই কিন্তু আবার তারই স্ত্রী, তখনকার মন্ত্রী উইনি ম্যান্ডেলার বিরুদ্ধে হত্যার অভিযোগে তাকে বিচারের মুখোমুখি করে শাস্তি দেন নিদ্বর্িধায়। 'আইনের শাসন' কাকে বলে, ভাবুন তো পাঠকবৃন্দ? অথচ অপরাধীদের আইনের শাসনের আওতায় আনা দূরে থাক, বাংলাদেশের রাজনীতির শিল্পীদের অপূর্ব ছোঁয়ায় এখন ডজনে ডজনে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত খুনি, ভয়ঙ্কর মাস্তান ও চিহ্নিত দাগি আসামি জেল থেকে বেরিয়ে মুক্ত বাতাসে বিচরণ করছে সগৌরবে। কাজেই বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সু চি-ম্যান্ডেলার মতো রাজনীতির শিল্পীদের দেখানো পথ ধরে চলা ছাড়া গণতন্ত্র বাস্তবে রূপ দেওয়ার অন্য কোনো পথই নেই। সত্য হলো, হিংসা হিংসা বাড়ায়, বিভেদ বিভেদ বাড়ায়। এই সহজ কথা সহজভাবে বুঝতে হবে সহসাই। এটা যত তাড়াতাড়ি হয় ততই মঙ্গলজনক।

ব্রিগেডিয়ার (অবসরপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ নুরাল হক, পিএসসি :কলাম লেখক
haquenoor@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.