বিক্ষুব্ধ মিসর-একটি বিপ্লবের মুখোমুখি by মানসুরা এজ-এলদিন

গত শুক্রবার কায়রোর পুরোনো অংশে বন্ধুদের সঙ্গে আমি এক শান্তিপূর্ণ মিছিলে অংশ নিয়েছিলাম। আমরা স্লোগান দিয়ে বলছিলাম, জনগণ চায় মোবারক সরকারের পতন ঘটুক। পুলিশ আমাদের দিকে বৃষ্টির মতো কাঁদানে গ্যাসের শেল ছুড়তে শুরু করল।


তখন আমরা চিৎকার করে বলতে লাগলাম, শান্তি! শান্তি! আমরা পুলিশকে বোঝাতে চাচ্ছিলাম, আমরা হিংসাত্মক কিছু করছি না, শুধু স্বৈরশাসন থেকে মুক্তির দাবি জানাচ্ছি। কিন্তু এর ফলে পুলিশের দল আরও উগ্র হয়ে উঠল, জনতার সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়ে গেল। নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে এক বন্ধুর সঙ্গে আমি ঢুকে পড়লাম একটা গলির মধ্যে। লোকজন আমাদের সাবধান করে দিল, আমরা যেন পাতালরেলের স্টেশনে আশ্রয় নিতে না যাই। তারা পালানোর অন্য একটা পথ আমাদের দেখিয়ে দিল। আর তাদের অনেকেই গিয়ে যোগ দিল রাস্তার বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে। শেষে এক ভদ্রলোক তাঁর গাড়িতে করে আমাদের পৌঁছে দিলেন।
পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে, তিউনিসিয়ার জুঁই বিপ্লবের সুবাস এসে পৌঁছেছে মিসরে। তিউনিস স্বৈরশাসক বেন আলী দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর ফেসবুক থেকে ডাক ছড়িয়ে পড়ল: এবার বিপ্লব করতে হবে মিসরে, ২৫ জানুয়ারি থেকে বিপ্লব শুরু করতে হবে। যেসব তরুণ-যুবক ফেসবুক আর টুইটারে এই ডাক দিচ্ছিল, এখানকার লোকজন তাদের নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করেছিল: দিনক্ষণ ঠিক করে বিপ্লবের স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে দেওয়া? বিপ্লব কি রোমান্টিক অভিসার? ইন্টারনেটের সামাজিক যোগাযোগ সাইটগুলোতে এ ধরনের প্রশ্ন তুলেছে অসংখ্য মানুষ; কিন্তু বিপ্লবের ডাক যখন অব্যাহতভাবে ছড়িয়ে পড়ছিল, তখন আমার মতো সংশয়বাদী মানুষও আশাবাদী হয়ে উঠছিল। টুইটার-ফেসবুক প্রজন্ম যেন দেশজুড়ে লাখ লাখ মানুষকে চোখের পলকে তাদের বিপ্লবের কাতারে শামিল করে নিল। এই প্রজন্মের বড় অংশই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে কখনো সক্রিয় ছিল না, কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্কও নেই। মোবারক গং বলছে, এই আন্দোলন-সংগ্রামের পেছনে মদদ দিচ্ছে মুসলিম ব্রাদারহুড দল; কিন্তু এটা মোটেও সত্য নয়। যারা এই আন্দোলন শুরু করেছে, তারা সরকারের দমন-পীড়নে আর পুলিশি বর্বরতায় জ্বলে উঠেছে। সরকারও শুরু থেকেই ভীষণ বর্বরভাবে দমন-পীড়ন চালিয়েছে, আশা করেছে যে হিংস্রভাবে বল প্রয়োগ করলেই মিসরে তিউনিসিয়ার মতো পরিস্থিতি ঠেকানো যাবে। কয়েক দিন ধরে মোবারকের পুলিশ এত পরিমাণ কাঁদানে গ্যাস ছুড়েছে যে কায়রোর বাতাসে যেন অক্সিজেন নেই, আছে শুধু কাঁদানে গ্যাস। ঘরবাড়ির ভেতরেও অনেক শিশু আর বয়স্ক মানুষ কাঁদানে গ্যাসে অসুস্থ হয়ে পড়েছে। কাঁদানে গ্যাসের পাশাপাশি প্রথমে ব্যবহার করা হয়েছে রাবার বুলেট, তারপর প্রাণঘাতী ধাতব বুলেট, মারা গেছে কয়েক ডজন মানুষ। সুয়েজ শহরে আন্দোলনকারীরা ছিল ভীষণ বিক্ষুব্ধ, সেখানে প্রথম দিনেই বেসামরিক নিরস্ত্র লোকজনের ওপর গুলি চালানো হয়েছে। আমার এক বন্ধু সেখানকার বাসিন্দা, তিনি আমাকে এক বার্তায় জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার সকালেই শহরটির চেহারা এমন হয়ে গিয়েছিল যেন ভয়াবহ একটা যুদ্ধ হয়ে গেছে। রাস্তাঘাট পুড়ে ছাই, যত্রতত্র পড়ে আছে লাশ। পুলিশের গুলিতে ওই শহরে আসলে কতজন মানুষের প্রাণ গেছে, সেই হিসাব বোধ হয় কোনো দিনই পাওয়া যাবে না।
শুক্রবার পুরোনো কায়রোর ওই মহল্লা থেকে পালিয়ে বন্ধুদের সঙ্গে রওনা করলাম নতুন কায়রোর কেন্দ্রস্থল তাহরির স্কয়ারের দিকে (ফ্রিডম স্কয়ার, চলমান আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র)। পথে যোগ দিলাম তরুণ-যুবকদের এক মিছিলে। কিছুদূর যাওয়ার পর আমরা শুনতে পেলাম, তাহরির স্কয়ারের দিক থেকে ভেসে আসছে বিক্ষোভকারীদের গর্জন, বুলেটের শব্দ, আর্তচিৎকার। মুহূর্তে মুহূর্তে আমাদের সংখ্যা ও অবস্থানের জায়গা বেড়ে চলল। দোকানিরা বিক্ষোভকারীদের মিনারেল ওয়াটারের বোতল দিচ্ছিল, বিক্ষোভে অংশ নেয়নি এমন অনেক সাধারণ মানুষ এনে দিচ্ছিল নানা ধরনের খাবার। ঘরবাড়ির জানালা ও ব্যালকনিগুলোতে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দেখছিল নারী ও শিশুরা। এক অভিজাত নারী রাস্তার ধার দিয়ে একটা বেশ দামি গাড়ি চালিয়ে যেতে যেতে বিক্ষোভকারীদের উদ্দেশে বলছিলেন, মনোবল ধরে রাখো, শহরের অনেক জায়গা থেকে লাখ লাখ মানুষ শিগগিরই এসে যোগ দেবে তোমাদের সঙ্গে।
তাহরির স্কয়ারে পৌঁছার চেষ্টা করে বেশ কয়েকবার ব্যর্থ হয়ে আমরা রাস্তার পাশে একটা ক্যাফেতে বসলাম একটু দম নিতে। সেখানে বসে ছিল সরকারের কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা বাহিনীর তিন কর্মকর্তা, প্রত্যেকেই সাদা পোশাকে। দূর থেকে ভেসে আসছিল গুলি ও চিৎকারের শব্দ; ক্যাফেতে টিভি চলছিল, আল-জাজিরা জানাচ্ছিল কত মানুষকে মেরে ফেলা হয়েছে, জখম হয়েছে কত মানুষ। কিন্তু তিন কর্মকর্তাকে দেখা গেল এমন নির্বিকার, যেন কিছুই হয়নি, কোথাও কিছু ঘটছে না। নিরাপত্তা বাহিনীর এই লোকেরা সাধারণ মানুষের বেশে সারা শহরে লোকজনের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি করে বেড়াচ্ছেন।
শুক্রবার বিকেল থেকে ঘণ্টায় ঘণ্টায় বেড়ে উঠছিল নৈরাজ্য। রাত নেমে আসতে আসতে আগুন জ্বলে ওঠে থানাগুলোতে, জ্বলতে থাকে সারা দেশে ক্ষমতাসীন ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টির অফিসগুলো। রাতে খবর পেলাম, জাতীয় জাদুঘরে ভাঙচুর-লুটতরাজ শুরু হয়েছিল, জাদুঘরকে রক্ষা করার জন্য তিন হাজার স্বেচ্ছাসেবী মানববন্ধন করে ঘিরে রেখেছে। রাতে কারফিউ জারি হয়ে গেল, আমি বাসায় ফিরতে পারলাম না, পার্লামেন্ট ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভবনের কাছাকাছি এক বন্ধুর বাসায় থেকে যেতে বাধ্য হলাম। জানালা দিয়ে দেখতে পেলাম, একটা গ্যাস স্টেশনের কাছে বিক্ষোভকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে, পুলিশ হয়তো চাচ্ছিল, গ্যাস স্টেশনটিতে যেন বিস্ফোরণ ঘটে। কারফিউ, পুলিশের নির্বিচার গোলাগুলি কোনো কিছুতেই বিক্ষোভ থামল না। গুলির শব্দও চলল সারা রাত।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষেপিত অনুবাদ
মানসুরা এজ-এলদিন: মিসরীয় ঔপন্যাসিক।

No comments

Powered by Blogger.