গতকাল সমকাল-দক্ষিণ সুদান—পৃথিবীর নব্যতম স্বাধীন রাষ্ট্র by ফারুক চৌধুরী

গত ৯ জুলাই সুদান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পৃথিবীর নব্যতম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল দক্ষিণ সুদান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের অভ্যুদ্বয়ের সঙ্গে বর্তমানের দরিদ্র ও স্বল্পোন্নত এ দেশটির একটি জায়গায় মিল রয়েছে। তা হলো, একটি বৃহত্তর দেশ সুদান থেকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে বিচ্ছিন্ন হয়ে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা অর্জন।

তবে মিলের এখানেই শেষ আর তার পরেই রয়েছে অমিলের সুদীর্ঘ ফর্দ। বর্তমানের বাংলাদেশ আর পশ্চিমে অবস্থিত পাকিস্তানের মাঝে ছিল প্রায় হাজার মাইলের ভৌগোলিক দূরত্ব। আমরা মূলত ভাষা এবং সংস্কৃতিভিত্তিক একটি দেশ। দক্ষিণ আফ্রিকায় রয়েছে নানা ভাষা, ভিন্ন সংস্কৃতি আর বিরাট সংখ্যক ‘ট্রাইব’ বা গোষ্ঠীর বিচিত্র এক ‘মোজাইক’। আমাদের জন্ম ছিল গণতন্ত্রের স্বপ্ন নিয়ে দ্বিমেরুর পৃথিবীতে। আমাদের প্রধান মিত্র ছিল তদানীন্তন সোভিয়েত ইউনিয়ন ও আমাদের প্রতিবেশী ভারত। বহুমেরুর বর্তমান পৃথিবীর সব রথী-মহারথীই দক্ষিণ সুদানের বন্ধুত্বকামী মিত্র। জাতিসংঘের সদস্যপদ লাভ করতে আর বিশ্বের বিভিন্ন দেশের স্বীকৃতি লাভ করতে আমাদের কত না কাঠখড় পোড়াতে হয়েছিল। আর স্বাধীন দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা উৎ সবে উপস্থিত ছিলেন খোদ জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুন আর কম হলেও উত্তর সুদানসমেত বিশ্বব্যাপী ৩০টি রাষ্ট্রের সুউচ্চ রাষ্ট্রীয় কার্যালয়ের প্রতিনিধি। স্বাধীন বাংলাদেশের যাত্রা শুরু ছিল শূন্য কোষাগার নিয়ে। দক্ষিণ আফ্রিকার বিদেশি সাহায্যপুষ্ট কোষাগার অর্থে উপচে পড়ছে। দক্ষিণ সুদানের আবির্ভাব হলো সুদীর্ঘ সশস্ত্র সংগ্রামের পর, ২০০৫ সাল থেকে ছয় বছরব্যাপী একটি নির্দিষ্ট আর্থ-রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে একটি পূর্বনির্ধারিত দিনক্ষণে। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশের আবির্ভাবের দিনক্ষণটি ছিল নাটকীয় এবং অনির্ধারিত। ভূগর্ভস্থিত সম্পদে, বিশেষ করে, জ্বালানি সম্পদে দক্ষিণ সুদান ঐশ্বর্যশালী। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ, এখনকার জানামতে, খুবই সীমিত। আমরা ক্ষুদ্রাকার, জনবহুল, আপেক্ষিকভাবে সুসংহত একটি দেশ আর ডজন ডজন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীসংবলিত দক্ষিণ সুদান প্রজাতন্ত্রের দুই লাখ ৩৯ হাজার বর্গমাইলজুড়ে (আমাদের ৫৬ হাজার বর্গমাইল) বাস করে বেশি হলে প্রায় এক কোটি (আমাদের ১৬ কোটি) মানুষ। আমরা দক্ষিণের বঙ্গোপসাগর ছাড়া পূর্ব, পশ্চিম আর উত্তরে ভারত পরিবেষ্টিত, আর সম্পূর্ণ স্থল পরিবেষ্টিত দক্ষিণ সুদানকে ঘিরে রয়েছে পূর্বে ইথিওপিয়া, দক্ষিণে কেনিয়া, উগান্ডা আর কঙ্গো, পশ্চিমে সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক আর উত্তরজুড়ে তো রয়েছেই বিশালাকার উত্তর সুদান, যা এখন থেকে সেই নামেই পরিচিত হবে। এখানেও আমাদের সঙ্গে রয়েছে অমিল। আমরা ১৯৭১ সালে পাকিস্তান নামটি চিরতরে বর্জন করেছি, যেমন ১৯৪৭ সালে করেছিলাম ‘ভারতের’ নাম; কিন্তু দক্ষিণ সুদান প্রজাতন্ত্র, অন্তত বর্তমানের জন্য ‘সুদান’ নামটি ধরে রেখেছে আর পূর্বেকার সুদান এখন ‘উত্তর সুদান’ হিসেবে পরিচিতিতেই প্রীত। ঐক্যবদ্ধ সুদানে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতা ছিল। এখন দক্ষিণ সুদানে একটি বিরাট জনগোষ্ঠীই স্থানীয় ধর্মাচারে বিশ্বাসী এবং এক হিসাবে জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেক ক্যাথলিক এবং অ্যাঙ্গলিকান খ্রিষ্টান।
বিশ্বের রথী-মহারথীদের (যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, চীন, ভারত) দক্ষিণ সুদানের প্রতি এই বিরাট আগ্রহ আর ভালোবাসার কারণ অনুধাবন করা দুরূহ নয় মোটেও। তা হচ্ছে জ্বালানি ছাড়াও দেশটির ভূগর্ভস্থিত খনিজসম্পদ, লোহা, তামা, ক্রোমিয়াম, দস্তা, টাংস্টেন, সোনা, রুপা এবং পানিবিদ্যুৎ সঞ্চালনের বিপুল সম্ভাবনা। দক্ষিণ সুদানের নীল নদ বিধৌত উর্বর ভূমি ভবিষ্যতে বিশ্বের একটি মূল্যবান কৃষিভান্ডার হয়ে উঠতে পারে। মনে পড়ে আজ থেকে তিন বছর আগে আমি যখন দক্ষিণ সুদান সফর করেছিলাম, তখন আবুধাবি সরকার (নিঃসন্দেহে পাশ্চাত্যের উৎ সাহে) সুদানে ৭০ হাজার একর কৃষি ভূমি ইজারা নেওয়ার পদক্ষেপ নিচ্ছিল। ‘ব্র্যাকের’ পরিচালনায় সম্পৃক্ত রয়েছি এবং দক্ষিণ সুদানে কর্মরত ব্র্যাক কর্মীদের ভাবনা তো এই ছিল যে আমাদের যদিও বিত্ত নেই, কৃষিজ্ঞান তো রয়েছে। সুদানে কৃষিক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো কেন অবদান রাখতে পারবে না? দক্ষিণ সুদানকে নিচে ওড়া হালকা বিমানে আকাশ থেকে দেখা ছিল একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা। দক্ষিণ সুদান থেকে ফিরে এসে লিখেছিলাম। স্থানে স্থানে রয়েছে জলাধার, খালবিল, নদনদী, অববাহিকা যেগুলো সব গিয়ে মিশেছে নীল নদে। মনে হয়েছিল যে বিজ্ঞান আর প্রযুক্তির ব্যবহারে দক্ষিণ সুদান একদিন বাংলাদেশের মতোই শস্য-শ্যামল হয়ে উঠতে পারে।
দক্ষিণ সুদানে রয়েছে জ্বালানি তেলের বিপুল ভান্ডার এবং সেখানে চীন ও ভারত (অন্যান্য পাশ্চাত্য শক্তিবর্গের পাশে) তাদের অবস্থান সুসংহত করছে। তিন বছর আগেই দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবার এক কামরাবিশিষ্ট বিমানবন্দর থেকে বেরিয়েই চোখে পড়েছিল বেজিং হোটেলের একটি বিরাটাকার সাইনবোর্ড এবং আমরা দক্ষিণ সুদানে ব্র্যাকের কর্মিসভা করেছিলাম একটি ভারতীয় হোটেলে।
দক্ষিণ সুদান দেশটির সৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র অপরিসীম আগ্রহ প্রদর্শন করে আসছে দুই দশক ধরে। তাই ৯ জুলাই ২০১১ সালে দেশটি স্বাধীন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা আর যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ক্যামেরন স্বীকৃতি জানিয়ে ‘গৌরব’ বোধ করলেন। মনে পড়ে পাশ্চাত্যের অধিকাংশ দেশগুলোর স্বীকৃতি লাভ করার জন্য আমাদের অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে হয়েছিল এবং পাকিস্তানের কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধুর প্রত্যাবর্তনের আগে অধিকাংশ দেশেরই স্বীকৃতি থেকে আমরা বঞ্চিত ছিলাম। ভূগর্ভে জ্বালানি তেল ধারণ না করার জ্বালা যে কত, তা বাংলাদেশ ভালো করেই জানে। ওয়াশিংটনে বাংলাদেশ ‘লবি’ গঠন করতে আমরা হিমশিম খেয়ে যাই। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের বিগত তিনজন প্রেসিডেন্টই ‘সুদান ককাস’ নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্র ‘কংগ্রেসের’ একটি দ্বিপক্ষীয় গোষ্ঠীকে কতই না সহায়তা প্রদান করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ দক্ষিণ সুদানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক একটি ভূখণ্ডে (আরব-আফ্রিকা আর লোহিতসাগর হয়ে উন্মুক্ত ভারত সাগরের অনন্ত নীলে) তাদের প্রভাব বিস্তারে আগ্রহী। যেমন রয়েছে ভারত আর চীনও। সময়ই বলে দেবে এটা দক্ষিণ সুদানের সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য। দক্ষিণ সুদানের সরকার এবং রাজনীতিবিদেরা তাঁদের অনুকূল অবস্থিতির ফায়দা ওঠাবেন, না আত্মকলহে লিপ্ত হয়ে দেশটির সর্বনাশ ডেকে আনবেন, তা নির্ভর করবে তাঁদেরই ওপর। এটা নিশ্চিত যে, পাশ্চাত্য শক্তিবর্গ দক্ষিণ সুদানের মারফত উত্তর সুদানকে (যাকে আরব বিশ্বের একটি অংশ বলে বিবেচনা করা হয়) চাপের মধ্যে রাখতে চাইবে। দক্ষিণ সুদানের প্রেসিডেন্ট সালভা কির মায়ারডিট দেশে-বিদেশে তাঁর ভূমিকা পালনে কতটুকু দূরদর্শিতা প্রদর্শন করবেন, তা আমাদের এখনো অজানা।
আমি মনে করি, দক্ষিণ সুদানের সঙ্গে বাংলাদেশের সহযোগিতার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। আমাদের শান্তি সেনারা গত বছরগুলোতে শান্তি রক্ষা ছাড়াও বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে লিপ্ত রয়েছেন। আমার যত দূর মন পড়ে, দক্ষিণ সুদানের রাজধানী জুবার প্রধান চত্বরটির প্রাথমিক কাজ সম্পন্ন করেছিলেন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর প্রকৌশলীরা। দক্ষিণ সুদানে গিয়েই জেনেছিলাম এবং পরে লিখেছিলামও যে আশরাফুন, পারভিন, তারিন, আফসানা, আফরিন—এঁরা সুদানে কোনো বাংলাদেশি গৃহবধূ নন, তাঁরা যথাক্রমে আমাদের সেনাবাহিনীর লে. কর্নেল, মেজর এবং ক্যাপ্টেন। দেখেছিলাম, সেই সময়ে বাংলাদেশি সেক্টর কমান্ডার কর্নেল (বর্তমানে হয়তো বা মেজর জেনারেল) মিয়াজি সালাউদ্দিন কৃষি সম্প্রসারণ ক্ষেত্রে ব্র্যাকের সহযোগিতায় প্রশংসনীয় কাজ করছিলেন। শুনেছি যে তাঁর উত্তরসূরিরাও সেই কাজ অব্যাহত রেখেছেন। গতকালের (জুলাই ৯, ২০১১) প্রথম আলোতেই তো পড়লাম যে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর ইঞ্জিনিয়ারিং কোরের ক্যাপ্টেন বিপুল কুমার গুনির নেতৃত্বে ১০ সদস্যের একটি দল হেলিকপ্টারযোগে দক্ষিণ সুদানের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া ‘কিনিতা’ পর্বতে সার্বভৌম দক্ষিণ সুদানের পতাকা উত্তোলন করে স্থানীয় জনগণের বিপুল প্রশংসা অর্জন করেছে। আমাদের শান্তিরক্ষী বাহিনী আর ব্র্যাকের উপস্থিতির কারণে দক্ষিণ সুদানে বাংলাদেশ অপরিচিত নয় মোটেও। ২০০৭ সালেই ব্র্যাক দক্ষিণ সুদানে তার কর্মকাণ্ডের সূত্রপাত করে। তার পরের বছরই দেশটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল সফর করার অবকাশ আমার হয়েছিল এবং আমি এই বিশ্বাস নিয়েই ফিরেছিলাম যে দক্ষিণ সুদানে বাংলাদেশ একটি গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে সক্ষম। দক্ষিণ সুদানে এখন ব্র্যাকের ৬০০ জনেরও বেশি কর্মী রয়েছেন, যার মাঝে ৪৫ জন বাংলাদেশি। ইতিমধ্যে ক্ষুদ্রঋণ হিসেবে ব্র্যাক প্রায় আট মিলিয়ন ডলার বিতরণ করেছে এবং গ্রহীতার সংখ্যা ২৮ হাজারের কাছাকাছি। বাংলাদেশি এ সংস্থাটি কৃষি, স্বাস্থ্য এবং যুব প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে গবেষণাভিত্তিক সহায়তা প্রদান করছে। ব্র্যাকের কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন হচ্ছে ব্র্যাকেরই প্রচেষ্টায় পাশ্চাত্য, বিশেষ করে ব্র্যাকের যুক্তরাষ্ট্র শাখার মাধ্যমে। আমরা জানি, দক্ষিণ সুদানে আজ রথী-মহারথীদের সমাগম হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স, ভারত—এদের সবার চেষ্টাই হচ্ছে, সবে মিলে করি কাজ, জিতি, জিতি, নাহি লাজ। আমাদের অবস্থান সবার পিছে, সবার নিচে, সর্বহারাদের মাঝে। সেখানে রয়েছে সাফল্যের উজ্জ্বল সম্ভাবনা।
এ প্রবন্ধটি যখন লিখছি, অনুজপ্রতিম একজন সাংবাদিক বন্ধু যথার্থই প্রশ্ন রেখেছিলেন, বাংলাদেশে উত্তপ্ত রাজনীতির এই দিনে দক্ষিণ সুদান সম্বন্ধে আপনার এই লেখা কি কেউ পড়বে? নাই বা হলো কারও পড়া—তবু লেখাটি শেষ করলাম এই বিশ্বাসে যে, দেশের রাজনৈতিক প্রাত্যহিকতাকে ছাড়িয়েও একজন সাধারণ নাগরিকের দায়িত্ব রয়েছে।
ফারুক চৌধুরী: সাবেক পররাষ্ট্রসচিব। কলাম লেখক।
zaaf@bdmail.net

No comments

Powered by Blogger.