হরতালের চেয়েও বেশি ক্ষতি-আড়ত বাজার হোটেল-রেস্তোরাঁ দোকানপাট ক্রেতাশূন্য

বিরোধী দল হরতাল ডাকেনি, তবু একটি হরতাল হয়ে গেল রাজধানীতে। আজকাল হরতালে ঢাকায় বাস চলে, রিকশা-অটোরিকশা তো 'স্বাভাবিক' যান। কিন্তু গতকাল সোমবার ঢাকার রাস্তায় বাস চলেনি; মানুষজন ছিল না। ক্রেতাহীন মার্কেটে দোকানপাট খুলে রাখার কোনো কারণই দেখেননি ব্যবসায়ীরা।


বড় বড় মার্কেট, আড়ত, শিল্পের যন্ত্রাংশের বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ সব কিছুই ছিল ক্রেতাশূন্য। বিক্রিবাট্টা না হওয়ায় ব্যাংকেও টাকা যায়নি।
গতকাল বিরোধী দলের মহাসমাবেশ আর সরকারের অতি তৎপরতায় স্থবির হয়ে পড়েছিল রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে ব্যবসায়ীদের দাবি, বাণিজ্যে মন্থরতার শুরু ৯ মার্চ। তাঁরা গতকালের পরিস্থিতিকে অঘোষিত হরতাল আখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মতে, হরতালের দিনের চেয়েও গতকাল ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষতি বেশি হয়েছে।
ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন এফবিসিসিআইয়ের সভাপতি এ কে আজাদ কালের কণ্ঠকে বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর পাল্টাপাল্টি কর্মসূচির কারণে গত দুই দিনে আমদানি-রপ্তানি কার্যক্রম ব্যাহত হয়েছে। পণ্য বিনা বাধায় বন্দর পর্যন্ত পেঁৗছাতে পারবেন কি না এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন রপ্তানিকারকরা। একই শঙ্কায় বন্দর থেকে মালামাল আনতে পারেননি আমদানিকারকরা। উত্তরবঙ্গ থেকে সবজি ও চালসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের যানবাহন অন্য দিনের মতো ঢাকায় আসেনি।
এ কে আজাদ বলেন, রাজনৈতিক অস্থিরতায় বর্তমান বিনিয়োগ নিয়েই উদ্যোক্তারা চিন্তিত। আগামী দিনে নতুন করে বিনিয়োগ করবেন কি না তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত তাঁরা। আর দেশের বিনিয়োগকারীরা এগিয়ে না এলে বিদেশি বিনিয়োগও আসবে না। এর চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে দেশের কর্মসংস্থান, প্রবৃদ্ধি ও রাজস্ব খাতে।
এ কে আজাদ বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে ব্যবসায়ীদের দাবি- দেশের অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য ক্ষতিকর কোনো উদ্যোগ না নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করা হোক।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বলা হয়নি। মালিক সমিতিগুলো জানিয়েছে, তাদের পক্ষ থেকেও কোনো নিষেধাজ্ঞা ছিল না। অঘোষিতভাবেই রাজধানীর দোকানপাট বন্ধ ছিল গতকাল। কিছু দোকান খোলা থাকলেও ক্রেতা ছিল গুটিকয়েক। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান প্রধান মার্কেটের পাশাপাশি রাস্তার পাশের বেশির ভাগ দোকানপাটও বন্ধ ছিল। কাঁচাবাজারে ক্রেতাদের উপস্থিতি ছিল একেবারেই কম। আগের দিন রাতে ঢাকার সবজি ও মাছের আড়তে পণ্যের সরবরাহ একেবারেই কম ছিল। কারণ আড়তে দূরদূরান্তের ব্যবসায়ীরা আসতে পারেননি।
এক দিন রাজধানীর ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকলে ক্ষয়ক্ষতি কত হয় তা নিয়ে কোনো সমীক্ষা নেই। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীরা একেকজন একেক রকমের মত দেন। তবে ক্ষতিটা যে বড় অঙ্কের তা নিয়ে সন্দেহ নেই কারো। কারণ বেশির ভাগ পণ্যের সবচেয়ে বড় আড়ত/কেন্দ্র ঢাকায়। একক শহর হিসেবে ঢাকা শহরেই সবচেয়ে বেশি মানুষের বাস। তাদের চাহিদা এক দিনের জন্যও কমে গেলে অর্থনীতির বড় ক্ষতি হয় বলে মনে করেন বিশ্লেষকরা। ঢাকার মানুষের চাহিদা এক দিনের জন্য কমে গেলে এর প্রভাব পড়ে সারা দেশের অর্থনীতিতে।
গতকাল সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে পরিবহন ব্যবসায়ীদের। গত দুই দিন ধরে বাস চলাচল প্রায় বন্ধ থাকায় তাঁরা আয়বঞ্চিত হয়েছেন। শ্রমিকরাও বঞ্চিত হয়েছেন আয় থেকে। ব্যবসায়ীদের ক্ষোভের কারণ, এক দিন ব্যবসা বন্ধ থাকলেও তাঁদের ব্যাংকের ঋণের সুদ, প্রতিষ্ঠানের ভাড়া, কর্মচারীদের বেতন, কর- কোনো কিছুই বন্ধ থাকে না। বন্ধ থাকে শুধু আয়-উপার্জন।
মহানগর দোকান মালিক সমিতির সভাপতি ও এফবিসিসিআইয়ের পরিচালক হেলাল উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, সমিতির পক্ষ থেকে দোকানপাট বন্ধ রাখতে বলা হয়নি। কিন্তু ক্রেতাশূন্যতা ও আতঙ্কে মালিকরা দোকান বন্ধ করে দেন।
হেলাল উদ্দিন বলেন, 'এক দিনে যে ক্ষতি হলো তা নিয়ে আমরা চিন্তিত কম। আমরা বেশি চিন্তিত আগামী দিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে। বিবদমান দুই দলের কারণে দেশের অর্থনীতির ক্ষতি হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা এর বিপক্ষে কথা বললেও আমাদের কথা কেউ শোনে না। আমরা নিজেরাও বুঝতে পারছি না এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কী?'
হেলাল উদ্দিন আরো জানান, ঢাকার দোকানপাটে প্রতিদিন কী পরিমাণ লেনদেন হয় এর সঠিক হিসাব নেই। তবে কম করে হলেও তা ২০০ কোটি টাকা। তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ এ ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতির নিন্দা করে। তবে তাদের কাছে বিকল্প নেই।
বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর কর্মসূচি এক দিনের হলেও হোটেল মালিকদের দুর্ভোগ শুরু হয়েছে ৯ মার্চ থেকে। ওই দিন থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হোটেলগুলোতে বোর্ডার না রাখার নির্দেশ দিয়ে আসছে। পাশপাশি রাজধানীর খাবার হোটেলগুলোও রবিবার থেকে বন্ধ রাখতে বলা হয়েছে।
আবাসিক হোটেল ব্যবসায়ী ও বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি খন্দকার রুহুল আমিন বলেন, 'কর্মসূচি এক দিনের। কিন্তু আমরা ভুগছি ৯ মার্চ থেকে। গুলিস্তান, ফকিরাপুল, পল্টন এলাকার হোটেলগুলো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। সকালে আমরা খাবার তৈরি করেছি। বন্ধ করে দেওয়ায় সেগুলো নষ্ট হয়েছে। এ জন্য সরকারের উচিত হোটেল মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া।'
রুহুল আমিন বলেন, ঢাকা শহরে প্রায় চার হাজার খাবার হোটেল আছে। প্রতিটিতে দিনে গড়ে ২০ হাজার টাকার কেনাবেচা হলে মোট আয় হয় আট কোটি টাকা। এক দিন বন্ধ থাকলে আয় হয় না, কিন্তু ব্যাংক ঋণের সুদ, কর্মচারীদের বেতন, ভাড়া প্রভৃতি খরচ তো আর বন্ধ থাকে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, বিরোধী দলের কর্মসূচি উপলক্ষে ঢাকাসহ সারা দেশে স্বাভাবিক যান চলাচল বন্ধ থাকায় ব্যবসা-বাণিজ্য ও পণ্য পরিবহনে বিঘ্ন ঘটেছে। এটা দেশের অর্থনীতির জন্য বিরাট ক্ষতি। আগামী দিনগুলোতে এ ধরনের কর্মকাণ্ড যাতে না ঘটে সেদিকে নজর রাখার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।

No comments

Powered by Blogger.