বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩৩৯ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। এম এ গাফফার হালদার, বীর উত্তম সাহসী এক দলনেতা মুক্তিবাহিনীর কয়েকটি দল একযোগে আক্রমণ চালাল পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা অবস্থানে। একটি দলের নেতৃত্বে এম এ গাফফার হালদার।


তাঁর নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধারা বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করছেন। পাকিস্তানি সেনারা প্রায় দিশেহারা। বিজয় প্রায় হাতের মুঠোয়। এমন সময় হলো বিপর্যয়। মুক্তিবাহিনীর একটি দলের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেল।
এম এ গাফফারের নেতৃত্বাধীন দলের মুক্তিযোদ্ধারা তখন কিছুটা চাপের মধ্যে। তিনি সাহসের সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করলেন। তাঁর সাহসিকতায় উজ্জীবিত হলেন তাঁর দলের সব সদস্য। এ ঘটনা সালদা নদীতে। ১৯৭১ সালের ৭-৯ অক্টোবর।
সালদা নদী ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার অন্তর্গত। সীমান্ত এলাকা। সালদা নদীর ওপর দিয়ে ঢাকা-চট্টগ্রাম-সিলেট রেলপথ। এখানে আছে রেলস্টেশন। ১৯৭১ সালে এই রেলস্টেশন ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওই রেলস্টেশন ও এর আশপাশ এলাকার বিভিন্ন স্থানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর শক্ত প্রতিরক্ষা অবস্থান।
সেপ্টেম্বর মাসে এই এলাকায় বেশ কয়েকবার প্রচণ্ড যুদ্ধ সংঘটিত হয়। অক্টোবর মাসের প্রথমার্ধে ২ নম্বর সেক্টরের অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ (বীর উত্তম, পরে মেজর জেনারেল) সালদা নদী রেলস্টেশন দখল করার পরিকল্পনা করেন। তাঁর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধাদের কয়েকটি দল ৭ অক্টোবর সালদা নদী ও এর আশপাশ এলাকায় বিভিন্ন পাকিস্তানি অবস্থানে আক্রমণ করেন।
মুক্তিযোদ্ধাদের আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি সেনারা নয়নপুর থেকে সালদা নদী রেলস্টেশনে আশ্রয় নেয়। এম এ গাফফার তাঁর দল নিয়ে বিপুল বিক্রমে যুদ্ধ করছিলেন। তখন মেজর সালেক চৌধুরীর (বীর উত্তম) নেতৃত্বাধীন দলের গোলাবারুদ শেষ হয়ে গেলে তাঁরা পেছনে সরে যেতে বাধ্য হন। ফলে মুক্তিযোদ্ধাদের সেদিনের আক্রমণ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। এরপর মেজর খালেদ মোশাররফ সালদা নদী দখলের দায়িত্ব অর্পণ করেন এম এ গাফফারের ওপর। ৮ অক্টোবর তিনি তাঁর দল নিয়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ওপর আবার আক্রমণ চালান। সারা দিন সেখানে প্রচণ্ড যুদ্ধ হয়।
পরদিন ৯ অক্টোবর এম এ গাফফার হালদার যুদ্ধ কৌশল পরিবর্তন করে নতুন পরিকল্পনা নেন। তাঁর এই পরিকল্পনা ফলপ্রসূ হয়। প্রথমে এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা চারটি দলে বিভক্ত হয়ে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণ করে। পাকিস্তানিরা তাঁদের পাল্টা আক্রমণ চালায়। এই সুযোগে মুক্তিযোদ্ধাদের অপর দুটি দল সালদা নদী রেলস্টেশনে আক্রমণ করে। পাকিস্তানি সেনারা ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি শিকার করে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। সালদা নদী রেলস্টেশন মুক্তিযোদ্ধারা দখল করেন। পরবর্তী সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ চালিয়েও ওই রেলস্টেশন পুনর্দখল করতে পারেনি।
এম এ গাফফার হালদার ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চতুর্থ ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টে কর্মরত ছিলেন। তখন তাঁর পদবি ছিল ক্যাপ্টেন। ২৫ মার্চ তিনি অবস্থান করছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ২৭ মার্চ তাঁরা বিদ্রোহ করে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষে ভারতে যান। মন্দভাল সাবসেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত পর্যায়ে ‘কে’ ফোর্সের অধীন চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে বিলোনিয়া, ফেনী ও চট্টগ্রামের নাজিরহাট এলাকায় যুদ্ধ করেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য এম এ গাফফার হালদারকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ১৭। তাঁর প্রকৃত নাম হালদার মো. আবদুল গাফফার।
এম এ গাফফার হালদারের পৈতৃক বাড়ি খুলনা জেলার ডুমুরিয়া উপজেলার আরাজি-সাজিয়ারা গ্রামে। বর্তমানে বাস করেন ঢাকায় (ওয়ালসো টাওয়ার, ২১ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ)। ১৯৭৬ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তখন তাঁর পদবি ছিল লেফটেন্যান্ট কর্নেল। পরে বাংলাদেশ সরকারের মন্ত্রী হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর বাবার নাম মোহাম্মদ কায়কোবাদ। মা রহিমা খাতুন। স্ত্রী হোসনে আরা বেগম। তাঁদের দুই ছেলে, দুই মেয়ে।
সূত্র: এম এ গাফফার হালদার, বীর উত্তম এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ২।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.