চরাচর-সামুদ্রিক কাছিম বিলুপ্তির পথে by আলম শাইন

জীবজগতের রহস্যময় প্রাণী হিসেবে খ্যাত সামুদ্রিক কাছিম। গবেষকরা আজও কাছিম সম্পর্কে তেমন গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বের করতে পারেননি। বিশেষ করে কাছিমের দীর্ঘায়ু রহস্য আজও মানুষের অজানা রয়ে গেছে। পৃথিবীর লাখো প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে একমাত্র কাছিমই নাকি ৫০০ বছর পর্যন্ত বাঁচতে পারে। অবশ্য যদি মানুষ ওদের বাঁচতে দেয়। একমাত্র মানুষ দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত না হলে কাছিমরা দীর্ঘায়ু পেয়ে থাকে।


কারণ কাছিম নামের প্রাণীটি প্রকৃতিতে খানিকটা নিরাপদ রয়েছে অন্য প্রাণীদের তুলনায়। কাছিমের যেমন রোগ-বালাই কম, তেমনি সমুদ্রের হিংস্র প্রাণী দ্বারা ওরা আক্রান্তও হয় কম। সুরক্ষাকৃত শারীরিক আকৃতির কারণেও ওরা অনেকটা নিরাপদ। বিশেষ করে কাছিম বা কচ্ছপের শরীরের শক্ত আবরণের কারণে অন্য সব শিকারি প্রাণী ওদের খুব একটা ঘাটায় না। ফলে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকার সুযোগ পেয়ে যায়। বাংলাদেশের সমুদ্র উপকূলে বিপন্ন প্রজাতির পাঁচ জাতের কাছিম দেখা যায়। এদের নাম যথাক্রমে অলিভ রিডলে টার্টল, গ্রিন টার্টল, হকস টার্টল, লগার হেড টার্টল ও লেদারব্যাক টার্টল। এর মধ্যে লেদারব্যাক টার্টল আকারে সর্ববৃহৎ। এটি ছয় থেকে আট ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়, আর ওজন প্রায় ৬০০-৭০০ কেজি পর্যন্ত গিয়ে ঠেকে। তবে সৌন্দর্যের দিক দিয়ে এগিয়ে রয়েছে সামুদ্রিক সবুজ কাছিম। এরা দেখতে বেশ সুন্দর। এদের চোখের সামনে এক জোড়া সমান্তরাল দাগ থাকে। অন্যান্য কাছিমের থাকে দুই জোড়া দাগ, তাই সহজেই সবুজ কাছিম শনাক্ত করা যায়। তবে এরা আকারে লেদারব্যাক কাছিমের চেয়ে অনেক ছোট। গড়ে তিন-চার ফুট লম্বা, আর ওজন ১৫০ থেকে ২০০ কেজি পর্যন্ত হয়। এসব কাছিম সাধারণত বঙ্গোপসাগরের সৈকতে ডিম ছাড়তে আসে। ডিম ছাড়ার পর ওরা আবার সমুদ্রে ফিরে যায়। নিরাপদ মনে করে অনিরাপদ একটি জায়গা কেন ওরা বেছে নিয়েছে, তা কিন্তু বোধগম্য নয়। সহজাত প্রবৃত্তিতে এ কাছিমগুলো সেন্টমার্টিনস দ্বীপ, শাহপরীর দ্বীপ, হিমছড়ি সৈকত, ইনানী সৈকত ও কঙ্বাজার সমুদ্রসৈকতের বালুকারাশির ভেতরে ডিম ছাড়তে আসে। ওদের ডিম পাড়ার সময় সাধারণত আগস্ট থেকে মার্চ মাস পর্যন্ত। এ সময় প্রতিটি কাছিম গড়ে ১২০টি করে ডিম পাড়তে সক্ষম হয়। আর এ ডিম ফুটে বাচ্চা বের হতে সময় লাগে প্রায় দুই মাস। এই দীর্ঘ সময় ধরে সৈকতে বিচরণ করে একদল অর্থলোভী মানুষ নামের পিশাচের দল। তাদের লক্ষ্যই থাকে শুধু কাছিমের ডিমের প্রতি। বালুকারাশির তলা থেকে খুঁজে রেব করে আনে ডিম। অতঃপর গোপনে তা বিক্রি করে। একশ্রেণীর ক্রেতা আছে, যারা গোপনে কাছিমের ডিম কিনে নেয়। তাদের বিশ্বাস, কাছিমের ডিমে রয়েছে দীর্ঘায়ুর রহস্য এবং গোপনীয় রোগের (যৌনরোগ) মহৌষধ। এ ভ্রান্ত ধারণার কারণে কাছিমের ডিমগুলো দ্রুত সাবাড় হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয়, নির্বিচারে মানুষের হাতে প্রাণও হারাচ্ছে কাছিমগুলো। বিষয়টি দ্রুত প্রতিহত করা না গেলে অদূর ভবিষ্যতে আমাদের সমুদ্রসৈকতে হয়তো আর এমন সৌন্দর্যময় প্রাণীটির দেখা পাওয়া যাবে না। আশা করছি, বিষয়টি নিয়ে আমরা ভাবতে সক্ষম হব।
আলম শাইন

No comments

Powered by Blogger.