কল্পকথার গল্প-উন্নতির চরম শিখরে উঠলে যা হয়... by আলী হাবিব

মানুষ সংজ্ঞাহীন হতে পারে। এটা কোনো অস্বাভাবিক ব্যাপার নয়। কিন্তু কিছু কিছু বিষয় আছে, যার সংজ্ঞা আছে। যেমন ধরা যাক উন্নতি। উন্নতি জিনিসটি কী ও কত প্রকার, তা উদাহরণসহ বুঝিয়ে দেওয়া সবার জন্য সহজ নয়। উন্নতিই বলি আর ভালোই বলি, ব্যাপারটা সবিস্তারে বুঝিয়ে বলতে গেলে, সে এক এলাহী কাণ্ড হয়ে যেতে পারে। সাধারণ অর্থে উন্নতি শব্দের অর্থ হচ্ছে শ্রীবৃদ্ধি, উচ্চ বা সমৃদ্ধ অবস্থা।


কেউ কেউ বলতে পারেন, কেমন সমৃদ্ধ অবস্থা? আবার সব সময় শ্রীবৃদ্ধি বা সমৃদ্ধ অবস্থা কি উন্নতি? একটু ধন্দে পড়তে হয়। উন্নতি নিয়ে নিজেদের মনে যতই দ্বিধা কিংবা দ্বন্দ্ব থাক, এর বিপরীত শব্দটি যে অবনতি, সেটা আমাদের বিলক্ষণ জানা এবং তা নিয়ে আমাদের কারো কোনো দ্বিমত নেই। আমাদের যত দ্বিধা ও দ্বন্দ্ব, সব ওই উন্নতি শব্দটি নিয়ে। না, একটি শব্দ কেন আমাদের দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণ হবে? আমাদের যত সন্দেহ, যত দ্বিধা-দ্বন্দ্ব সব ওই উন্নতি বিষয়টিকে কেন্দ্র করে। উন্নতি কাকে বলে, বা হোয়াট ইজ উন্নতি_সেটাই আজ আলোচনা করা যাক। কিন্তু ঝামেলার ব্যাপার হচ্ছে, এই উন্নতি বিষয়টিকে আমরা সবিস্তারে বুঝিয়ে দেব কেমন করে?
বুঝিয়ে বলার জন্য আমাদের প্রিয় এই ঢাকা মহানগরীকেই উদাহরণ হিসেবে ধরে নেওয়া যাক। ঢাকায় যারা থাকে বা কর্মসূত্রে কিংবা নানা কারণে ঢাকায় বসবাস করতে বাধ্য হয়, তাদের প্রায় সবাই এ মহানগরীটির ওপর ভীষণভাবে বিরক্ত। এই বিরক্তির কারণও আছে। ঢাকা দিন দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, এটা আমরা সব সময় বলে থাকি। আচ্ছা, বলব না-ইবা কেন? এমন ঝামেলার নগরী কি বিশ্বে কোথাও আর আছে? সকালে ঘুম থেকে উঠে বাড়ির গিনি্ন দেখলেন রান্নাঘরে গ্যাস নেই। গ্যাস নেই তো কেমন করে রান্না হবে? ওদিকে বাড়ির কর্তা অফিসে যাবেন। ছেলেমেয়েরা স্কুলে যাবে। বাথরুমে তখন আবার পানি নেই। পানি নেই তো পানির মেশিনটা ছেড়ে দিলেই হয়। না, মেশিন চালানো সম্ভব নয়। কেন? বিদ্যুৎ নেই। বাড়ি থেকে বের হলে রিকশা নেই। হেঁটে বাস স্টপেজে এসে দেখা গেল, বাস নেই। এর মাঝে আরো অনেক নেই আছে। এসব 'নেই'-এর মধ্যেও কিন্তু একটা জিনিস আছে। কি আছে? যানজট। ঢাকা শহরে যানজট আছে। যানজটের সুবিধাও আছে। অফিসে যেতে দেরি হয়ে গেছে, বড় কর্তাকে ফোন করে বলে দিন,যানজটে আটকে আছেন। এমনটি আজকাল আকসার হচ্ছে। কথায় কথায় জ্যামের দোহাই দেওয়া হচ্ছে। জ্যামের কারণে রাস্তায় নষ্ট হচ্ছে অনেক কর্মঘণ্টা। আমাদের জীবন থেকে ঝরে যাচ্ছে অনেক মূল্যবান সময়। প্রতিদিন ঢাকা শহরে যানজট বা ট্র্যাফিক জ্যাম বাড়ছে। ঈদের আগে এ শহরে চলাচল করা অনেকটাই অস্বাভাবিক হয়ে পড়বে। এই যে ঢাকায় প্রতিদিন যানজট বাড়ছে বা বৃদ্ধি পাচ্ছে, এটাকে কি আমরা উন্নতি বলতে পারি? ঢাকায় যানজটের উন্নতি হয়েছে বা হচ্ছে_আমরা কি এভাবে বলতে পারি?
যাকগে, ঢাকার যানজট এমনিতেই বিরক্তিকর। সেটা নিয়ে আলোচনা করা আরো বিরক্তিকর। আমরা বরং উন্নতি নিয়ে কথা বলি। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নিয়ে কথা বলি আমরা। সব সরকারের আমলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা বলে থাকেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। বিগত সরকারের আমলে সন্ত্রাসীদের গুলিতে বাবার কোলে এক শিশুর মৃত্যুর পর এক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তো বলেই দিয়েছিলেন, 'আল্লাহর মাল আল্লাহ নিয়ে গেছে'! কী নিষ্ঠুর রসিকতা! এর পরও আমাদের সেই 'আল্লাহর মাল' স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কোনোদিন বলেননি যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটেছে। এমনকি 'লুকিং ফর শত্রুজ' প্রতিমন্ত্রীও কোনোদিন বলেননি দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে বা হচ্ছে। আমাদের বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীও সেই ট্র্যাডিশন বজায় রেখে চলেছেন। তিনিও বলে আসছেন, দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। সেই উন্নতির লক্ষণরেখা কী? কোন সূচক আমাদের বলে দেবে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে? পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত কিছু খবরে একটু চোখ বুলিয়ে আসা যাক।
সহযোগী একটি দৈনিকের গত ৩০ মার্চ সংখ্যায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, 'নতুন বছরের প্রথম তিন মাসে রাজধানীতেই দুটি জোড়া খুন এবং শিশু ও রাজনৈতিক নেতাসহ ১৪০ জনকে নির্মমভাবে জীবন দিতে হয়েছে সন্ত্রাসীদের হাতে। চাঁদা না দেওয়ায় ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন ব্যক্তির ওপর ঢাকাতেই অর্ধশত হামলার ঘটনা ঘটেছে। পল্লবী ও পুরান ঢাকায় সরকারি দলের দুই মহিলা এমপির বাসাসহ রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দেড় শতাধিক ডাকাতি ও চুরি হয়েছে। বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেই চলছে।' ওই পত্রিকার খবরে আরো বলা হয়, 'গত দুই বছরে সারা দেশে প্রায় পাঁচ হাজার খুনের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে রাজনৈতিক খুনের ঘটনা ঘটেছে ৪০০। দুই বছরে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনায় আহত হয়েছেন সাড়ে ২৭ হাজার রাজনৈতিক নেতা-কর্মী।' পত্রিকাটির মতে, 'রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় লালিত সন্ত্রাসীরা বেপরোয়া হয়ে ওঠায় খুনোখুনির এসব ঘটনা ঘটছে। রাজনৈতিক নেতাদের আশকারা পেয়ে পেশাদার সন্ত্রাসীরাও দিন দিন মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে।' ওই দৈনিকের খবরে আরো বলা হয়েছে, 'মানবাধিকার সংগঠন অধিকার-এর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সালে সারা দেশে ১৬ হাজার ৪১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ২৫১ জন খুন হন। এ সময় আহত হন ১৫ হাজার ৫৫৯ জন। ২০১০ সালে সারা দেশে রাজনৈতিক সহিংসতায় খুনের শিকার হন ২৮৯ রাজনৈতিক নেতা-কর্মী। ১৫ হাজার ৪১৮টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় আহত হন ১২ হাজার ৮৯ জন নেতা-কর্মী। এ সময় আইন রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের হেফাজতে মারা যান ২৯২ জন। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ২২ জন নিহত ও এক হাজার ১৯১ জন আহত হয়েছেন। পৌরসভা নির্বাচনের সময় দুজন নিহত ও ৫১৫ জন আহত হয়েছেন। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের ৩৭টি এবং বিএনপির ছয়টি ঘটনা ঘটেছে। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৪৩৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৬৮ জন আহত হয়েছেন। ৫৬ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ২৬ জন নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ও মার্চ মাসের ২০ তারিখ পর্যন্ত রাজনৈতিক সহিংসতায় মারা গেছেন ৩৭ জন। আহত হয়েছেন প্রায় এক হাজার ২০০। তা ছাড়া আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৪৮৪ জন আহত হয়েছেন। অন্যদিকে বিএনপির অভ্যন্তরীণ সংঘাতে ৫৮ জন আহত হয়েছেন। তা ছাড়া ৭৬ জন নারী যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন।'
সহযোগী আরেকটি দৈনিকের গত ২৪ জুলাই সংখ্যায় প্রকাশিত খবরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে বলা হয়েছে, 'পুলিশের উপস্থিতিতে ছয় ছাত্রকে পিটিয়ে হত্যা করে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার ঘটনা বিচারব্যবস্থার প্রতি সাধারণ জনগণের অনাস্থা ও সরকারের ব্যর্থতার ফল। গণপিটুনির শিকার হয়ে গত ছয় মাসে দেশে ৮৩ জনের প্রাণহানি সংঘটিত হয়েছে। একই সময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে ৬১টি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ ছাড়া গ্রাম্য সালিস ও ফতোয়ার কারণে ২১ জন বেআইনিভাবে নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। আইনের প্রতি মানুষের আস্থাহীনতার কারণেই প্রতিনিয়ত এসব করুণ ঘটনার সৃষ্টি হচ্ছে।'
এই হচ্ছে আমাদের দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতির চিত্র। এই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দেখভালের দায়িত্ব যাদের, তাদের আমরা পুলিশ বলে জানি। এই পুলিশ নিয়ে নানা রসিকতা চালু আছে। কয়েকটা পরিবেশন করা যাক।
রাস্তা দিয়ে খুব দ্রুতগতিতে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছিলেন এক মহিলা। সঙ্গে তাঁর শিশুপুত্র। রাস্তায় যে গতিতে গাড়ি চালানোর নিয়ম, ভদ্রমহিলা গাড়িটি চালাচ্ছিলেন তার চেয়ে দ্রুতগতিতে। এক পর্যায়ে পুলিশ এসে গাড়িটি থামাল। ভদ্রমহিলা ড্রাইভিং সিটে বসে আছেন। পুলিশ কর্মকর্তা এসে ভদ্রমহিলাকে জিজ্ঞেস করলেন, 'বলুন তো আপনাকে কেন থামানো হয়েছে?' ভদ্রমহিলা জবাব দেওয়ার আগেই জবাব দিল শিশুপুত্র। সে বলল, 'আপনারা তো আর কাউকে থামাতে পারেননি। তাই আমাদের গাড়িটা থামিয়েছেন।'
এবার অন্য একটি জোক। এক হাসপাতালে মানুষের ব্রেন পরিবর্তন করা হয়। এক ভদ্রলোক সেখানে গেছেন। তাঁর ব্রেন পরিবর্তন করার শখ। তিনি ব্রেনের দাম জানতে চাইলেন। হাসপাতালের দায়িত্বে থাকা চিকিৎসক ব্রেনের দাম বলতে শুরু করলেন। পিএইচডি ব্রেন ১০ হাজার ডলার, নাসার বিজ্ঞানীর ব্রেন ১৫ হাজার ডলার, পুলিশের ব্রেন ৫০ হাজার ডলার।
'পুলিশের ব্রেন পঞ্চাশ হাজার ডলার!' ক্রেতা ভদ্রলোক তো বিস্মিত।
'স্বাভাবিক। ওটা তো কোনোদিন ব্যবহার করা হয়নি'_হাসপাতালের চিকিৎসকের নির্লিপ্ত উত্তর।
আসলে পুলিশের ব্রেন ব্যবহার হয় কি না, সেটা আমাদের বিবেচনার বিষয় নয়। আমরা কথা বলছিলাম আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যখন উন্নতির চরম শিখরে থাকে, তখন কী হতে পারে? আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যে উন্নতির চরম শিখরে সেটা পরিমাপ করা যাবে কেমন করে? একটু চোখ-কান খোলা রাখলেই সেটা বুঝতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়। তখন আইনশৃঙ্খলার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর কোনো কাজ থাকে না। কিন্তু একেবারে কাজ না দেখালে তো চলে না। সে কারণে আমিনবাজারের মতো স্থানীয় জনগণ আইন হাতে তুলে নিলে তারা নিষ্ক্রিয় থাকে। মিলনের মতো ছেলেদের গণপিটুনির জন্য তুলে দেয় জনগণের হাতে। কাদেরের মতো মেধাবী ছাত্রদের রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে গিয়ে পিটিয়ে প্রায় পঙ্গু করে দিয়ে প্রমাণ করে দেয় পুলিশে ছুঁলে কত ঘা হতে পারে। আইনশৃঙ্খলার উন্নতি হলে এভাবেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়।
লেখক : সাংবাদিক
habib.alihabib@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.