ভিন্নমত-শেয়ারবাজার : বিনিয়োগকারীরা যে 'শিক্ষিত' হতে চায় না! by আবু আহমেদ

রেগুলেটর সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে বিভিন্ন বৈঠকে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারীদের শিক্ষিত করে গড়ে তুলতে আদেশ-উপদেশ দেন। দায়িত্বটা দেওয়া হয় স্টক এঙ্চেঞ্জগুলোকে, মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকার হাউসগুলোকে। কারণ, এদের কাছেই বিনিয়োগকারীরা আসে এবং তাদের প্রতি এদের একটা দায়িত্ববোধ আছে।


রেগুলেটর নিজেও 'শিক্ষিত' করার জন্য একটা প্রোগ্রাম চালায় এবং স্ব-উদ্যোগে ব্রোকার হাউসগুলোতে বড় একটি প্রচারপত্র ঝুলিয়ে দিয়েছে যে বিনিয়োগকারীদের এই এই দেখে বা বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগ করতে হবে। আর আমরা কতিপয় লোক এদের 'শিক্ষিত' করে গড়ে তোলার জন্য রীতিমতো কয়েকটি বই লিখে ফেলেছি। আমার লেখা 'জেতার কৌশল' বইটি ইতিমধ্যে জনপ্রিয়ও হয়েছে। তবুও বলব আমি যখন কোনো ট্রেনিং সেশনে বক্তৃতা দিই, তখন উপস্থিত ৩০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র তিন-চার জন পাই যারা বইটি পড়েছে। আর যারা পড়েছে, তাদের একটা সাধারণ অভিযোগ হলো, তাতে কিছু অঙ্ক আছে যা তাদের বোধগম্য নয়। জানি তাদের মধ্যেও অঙ্কভীতি আছে। কিন্তু বিনিয়োগ-সংক্রান্ত লাভ-লোকসান বা একটা বিনিয়োগ কত হারে ভবিষ্যতে কত টাকা হতে পারে, তা বোঝানোর জন্য তো সামান্য অঙ্ক কষতেই হবে। কোনোরকম কাল্পনিক বা সত্য ব্যবসা-সংক্রান্ত স্থিতিপত্র না লিখে কী কম্পানির সম্পদ-দায়দেনা এবং লাভ-লোকসান বোঝানো যাবে? তাই সামান্য কিছু অঙ্ক ও সংখ্যার যোগ-বিয়োগ করতে তো ও বিনিয়োগকারীকে অবশ্যই অভ্যস্ত হতে হবে। তবে আমি যখন সাদা অথবা কালো বোর্ডে তার থেকে কঠিন অঙ্ক লিখি, তখন দেখি বিনিয়োগকারীরা ঠিকই বুঝছে। এর অর্থ হলো তারা অঙ্ককে অতো ভয় করে না, তারা ভয় করে বোঝাকে। যারা অর্থনীতি-বাণিজ্য নিয়ে লেখাপড়া করেছে, তারা আগ থেকেই শেয়ারবাজারের কিছু বেসিক্স (BASICS) জানে। তাদের বোঝাতে অনেক সহজ হয়। যারা বিজ্ঞান নিয়ে লেখাপড়া করেছে, তাদের বোঝাতেও সহজ হয়। কারণ তারা অঙ্কের অংশটুকু অতি তাড়াতাড়ি বোঝে। ট্রেনিং সেশনে আমি কোনো রকম মাল্টিমিডিয়া ব্যবহার করি না। কারণ আমার কাছে মনে হয় ওটা কোনো স্থির বিষয়কে বোঝাতে উপযোগী হয়, শ্রোতাদের বা যারা ভিন্নভাবে জানতে চায় তাদের সাদা অথবা কালো বোর্ডে মার্কার বা চক দিয়ে লিখে বোঝাতে সহজ হয়। ট্রেনিংয়ে আসা লোকেরা আমার ক্লাস উপভোগ করে এবং আমিও তাদের প্রশ্ন ও জানার আগ্রহকে উপভোগ করি। তবে ট্রেনিং সেশনে আসা বিনিয়োগকারীদের মধ্যে সবাই একাডেমিক ডিগ্রিধারী নয়। সেভেন-এইট পাস ট্রেনিও আছে। ফলে সবার প্রয়োজনকে মেটাতে গিয়ে আমার মতো ট্রেইনারকে অনেক নিচে নেমে আসতে হয়। অবশেষে একটা কথা তাদের বলতে হয়, আপনারা রীতিমতো আর্থিক বিবরণী ও রিপোর্টগুলো পড়বেন। এখানে যে ট্রেনিং নিলেন, একে কাজ লাগাতে হলে সর্বদা আপনাদের কিছু গবেষণা করতে হবে। তথ্য-উপাত্তের চারদিক থেকেই নেবেন। ঢাকা স্টক এঙ্চেঞ্জ ও চট্টগ্রাম স্টক এঙ্চেঞ্জও কিছু প্রতিবেদন প্রকাশ করে, ওইগুলো কাজে লাগাতে চেষ্টা করবেন। কম্পানির আপডেটেড ওয়েবসাইটকে দেখবেন। মূল কথা হলো আপনি যে কম্পানির শেয়ার কিনছেন ওই কম্পানির ব্যবসা সম্বন্ধে আপনার ভালো ধারণা থাকতে হবে। ব্রোকার হাউসের লোকজনকে জিজ্ঞেস করে কোনো শেয়ার কিনবেন না। আর শিখতে অক্ষম হলে ভালো অপশন হলো অর্থটা কোনো অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট কম্পানির হাতে দিয়ে নিজে অন্য কাজ করা। কিন্তু সমস্যা হলো বেশির ভাগ 'বিনিয়োগকারী' এই পথে যেতে চায় না। তারা দৌড়ে শর্টকাট কোনো রাস্তা বের করতে। ফলে তারা গুজবের পেছনে দৌড়ায়। কোনো কোনো মহল তাদের কম শিক্ষার সুযোগ নিয়ে গুজবশিল্প তৈরি করে বাজারে বেচতে থাকে। ২০১০-এ এই গুজবশিল্প বেশি বিক্রি হয়েছিল। গুজব আর জুয়া একসঙ্গে বাঁধা। ফলে তাদের অনেকে হয়ে পড়েন কথিত 'জুয়াড়ি' এবং 'ফাটকাবাজ'। জুয়াড়ি ও ফাটকাবাজ সব শেয়ারবাজারেই আছে। তবে পার্থক্য হলো তাদের ফাটকাবাজরাও শিক্ষিত। আমাদের বাজার 'ফাটকাবাজ-পীড়িত'। কিভাবে বোঝা যায়? একটা পরিমাপ হলো এই বাজারে খুব কম লোকই ডিভিডেন্ডের জন্য শেয়ার কিনে। কম্পানি ভালো মুনাফা বণ্টনের ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু শেয়ারের মূল্য পড়ে গেল। এ অবস্থাকে আপনি কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন। আমাদের বাজারে ১৯৮০ এবং ১৯৯০ দশকের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন বিনিয়োগকারী খুব কমই আছে। ৩৩ লাখের বেশির ভাগের প্রবেশ ঘটেছে ২০০৮-২০১০-এর মধ্যে যখন ওচঙ বা প্রাথমিক শেয়ার স্থিরকৃত মূল্যে ইস্যু হতো এবং সেকেন্ডারি বাজারে এসে অনেক বেশি মূল্যে বিক্রি হতো। তবে বিনিয়োগকারীদের শিক্ষার থেকেও অন্য আরেটি বিষয় অতি জরুরি। সেটা হলো আমাদের কম্পানিগুলো শেয়ারবাজার থেকে অর্থ নিয়ে সে অর্থ দিয়ে কী করছে। ব্যাংক থেকে অর্থ নিতে জামানত লাগে। আর শেয়ারবাজার থেকে অর্থ নিলে শুধু কিছু ওয়াদা লাগে। ওয়াদা ভঙ্গ করলে কোনো ইস্যুয়ার বা কম্পানি আজতক কোনো জবাবদিহিতারই সম্মুখীন হয়নি। বিনিয়োগকারীরা না হয় তাদের অজ্ঞতার কারণে খারাপ শেয়ারের পেছনে দৌড়াচ্ছে। কিন্তু যারা ওইসব খারাপ শেয়ার বিক্রি করল তাদের কে জিজ্ঞেস করছে। অথচ যখন ওরা শেয়ার ছেড়ে শত কোটি টাকা নিল, তখন তো বড় বড় লাভের অনেক সুন্দর সুন্দর অঙ্ক বাজারের লোকদের কাছে তুলে ধরে দিল। রেগুলেটরের উচিত হবে ওই দিকটা বেশি করে দেখা। বাজারকে খারাপ করার জন্য তো ওরাই মূল দায়ী।

লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতিবিদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.