অঙ্গ প্রতিস্থাপন-আইনটির সংস্কার প্রয়োজন by এ কে আজাদ খান ও ফরিদ কবির

অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের এক উল্লেখযোগ্য অবদান। এর মাধ্যমে মৃত্যুপথযাত্রী একজন রোগীকে নতুন জীবন দেওয়া সম্ভব! ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে কিডনি প্রতিস্থাপন শুরু হয়। কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য এখন বাংলাদেশের কোনো রোগীর আর দেশের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বারডেম হাসপাতালেই আমরা ইতিমধ্যে প্রায় ৯০টিরও বেশি কিডনি প্রতিস্থাপন করেছি। এ ছাড়া আমরা বারডেমে দুটি সফল লিভার প্রতিস্থাপন করেছি।


লিভারদাতা ও গ্রহীতারা সুস্থ আছেন এবং কর্মক্ষেত্রে ফিরে গেছেন। আমরা অচিরেই হার্ট ও বোনম্যারো প্রতিস্থাপনেরও পরিকল্পনা করছি।
সারা পৃথিবীতেই অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানের ক্ষেত্রে যে নীতিটি মেনে চলা হয়, তা হচ্ছে, যিনি অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করবেন, তিনি সম্পূর্ণ সুস্থ এবং অঙ্গ দান তাঁর জন্য আদৌ ক্ষতিকর নয়। প্রতিস্থাপনের জন্য সাধারণত দুটি উপায়ে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করা হয়। এক, মৃত ব্যক্তি (‘ব্রেন-ডেথ’); দুই, নিকটাত্মীয়দের কেউ তাঁর কোনো অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করলে।
উন্নত দেশগুলোতে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের কাছ থেকে কিডনি বা লিভার সংগ্রহ করা সম্ভব হলেও আমাদের দেশে মৃত ব্যক্তিদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ করা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। এর একটি বড় কারণ, মৃত্যুর আগে কেউ তাঁর অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দানের অঙ্গীকার করলেও মারা যাওয়ার পর তাঁর আত্মীয়স্বজন তা বাস্তবায়ন করতে আগ্রহী হন না।
‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯’ নামে বাংলাদেশে যে আইনটি আছে, তাতে বলা হয়েছে, অসুস্থ ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বা কন্যা, বাবা-মা, প্রাপ্তবয়স্ক ভাইবোন অথবা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে রক্তসম্পর্কীয় আপন চাচা, ফুফু, মামা ও খালা তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন। বাংলাদেশে নিহত ব্যক্তিদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংগ্রহ সহজ নয় বলে অধিকাংশ কিডনি প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রে জীবিত ব্যক্তিদের দান করা কিডনিই ব্যবহূত হয়েছে।
কিন্তু সম্প্রতি কিডনি বা লিভার প্রতিস্থাপনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় কিডনি ও লিভার বেচাকেনা নিয়ে যেসব খবর প্রকাশিত হয়েছে, তাতে এই চিকিৎসা-পদ্ধতিটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
আমরা এমন একটা সময়ে বাস করছি, যখন মানুষের মূল্যবোধের যথেষ্ট অবনতি হয়েছে। আইনে সামান্য ফাঁকফোকর থাকলেই অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে ওঠে। এ ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই ঘটেছে। আমাদের আইনে রোগীর কোন কোন নিকটাত্মীয় তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন, তা বলা হলেও এই আত্মীয়তা বা সম্পর্ক কীভাবে নিরূপণ করা হবে, কী ধরনের প্রমাণপত্র চিকিৎসকের কাছে দাখিল করতে হবে, এর কোনো দিকনির্দেশনা নেই। তা ছাড়া কিডনিদাতা ও গ্রহীতার মধ্যকার সম্পর্ক নিরূপণে কী কী কাগজপত্র রোগীকে দাখিল করতে হবে, এর কোনো দিকনির্দেশনাও আইনে নেই। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচাকেনা সারা পৃথিবীতেই দণ্ডনীয় অপরাধ। এ দেশেও যদি কিডনি বা লিভার বেচাকেনা হয়, তবে এর সঙ্গে জড়িত যে-ই হোক, তার শাস্তির বিধান বাঞ্ছনীয়।
আইনে রক্তসম্পর্কের ওপর বেশি জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু মানুষের সম্পর্ক এমনই যে রক্তীয় না হয়েও কেউ কেউ অনেক বেশি আত্মীয় হতে পারেন। তা ছাড়া রোগীর নিকটাত্মীয়দের মধ্যে কেউ কিডনি দান করতে আগ্রহী না হলে রোগী কী করবেন? তাঁর কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু যদি মৃত্যুপথযাত্রী কোনো রোগীকে একটি কিডনি দিতে চান, তবে কেন তিনি তা নিতে পারবেন না? অথচ উন্নত দেশগুলোতে রক্তসম্পর্কীয় না থাকলেও মানুষ তাঁর প্রিয়জনকে কিডনি বা লিভার দিতে পারেন। আমাদের দেশের আইনে এ রকম কোনো ব্যবস্থা রাখা হয়নি।
বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, কিডনি ও লিভার বেচাকেনায় চিকিৎসকেরা জড়িত। আমরা মনে করি, অলাভজনক হাসপাতাল বা স্বাস্থ্যসেবার প্রতিষ্ঠানগুলোতে চিকিৎসক বা খোদ প্রতিষ্ঠানের জড়িত হওয়ার আশঙ্কা নেই বললেই চলে। অন্তত বারডেম হাসপাতালে চিকিৎসকদের এমন কাজে জড়িত হওয়ার সুযোগ নেই। সাম্প্রতিক ঘটনা থেকে আমাদের এটাই মনে হয়, সম্পর্ক নিরূপণের জন্য কোনো সঠিক দিকনির্দেশনা বা গাইডলাইন না থাকায় চিকিৎসকেরা এফিডেভিট বা সংশ্লিষ্ট এলাকার ওয়ার্ড কমিশনারের দেওয়া সনদকেই প্রামাণ্য দলিল হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ওই সব কাগজপত্র জাল কি না, তা চিকিৎসকেরা কীভাবে বুঝবেন?
সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলোতে এমনও বলা হয়েছে, কিডনিদাতারা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন, যা মোটেও সত্য নয়। কিডনিদাতার পরিপূর্ণ সুস্থতা নিরূপণের জন্য তাঁকে বেশ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষার ভেতর দিয়ে যেতে হয়। কিডনি সংগ্রহের পরও তাঁকে নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং পরিপূর্ণ সুস্থ হলেই তাঁকে হাসপাতাল থেকে রিলিজ করা হয়। সে অর্থে একজন কিডনিদাতা ‘সনদপ্রাপ্ত’ সুস্থ লোক! কাজেই কিডনি দেওয়ার পর কেউ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন—এমন সংবাদের কোনো ভিত্তি নেই।
তবে অতি সম্প্রতি বিভিন্ন কাগজে আকস্মিকভাবে এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন একযোগে প্রকাশিত হতে দেখে আমাদের মনে এমন আশঙ্কাও জাগে, এর পেছনে বিদেশি হাসপাতালগুলোর হাত আছে কি না! এই সেদিনও ওপেন হার্ট সার্জারি, স্টেন্টিং, বাইপাস সার্জারি, কিডনি প্রতিস্থাপন প্রভৃতির জন্য রোগীরা চলে যেতেন উন্নত দেশগুলোতে। এখন তা এ দেশেই সম্ভব হচ্ছে এবং তা অত্যন্ত কম খরচে। এতে পাশের দেশগুলোর হাসপাতালগুলোতে বাংলাদেশি রোগীদের সংখ্যা কমে যাওয়াই স্বাভাবিক। এ অবস্থায় বাংলাদেশে কিডনি বা লিভার প্রতিস্থাপনকে কোনোভাবে বাধাগ্রস্ত করতে পারলে ওই সব হাসপাতালেরই লাভ। কাজেই আকস্মিকভাবে সম্প্রতি বিভিন্ন কাগজে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশের পেছনে কোনো ষড়যন্ত্র আছে কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা দরকার।
শেষে বাংলাদেশে কিডনি ও লিভার বেচাকেনা নিয়ে অতি সম্প্রতি যেসব সংবাদ ছাপা হয়েছে, এর জন্য সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানাই। কারণ, তাঁরা অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচাকেনার বিষয়টি জনসম্মুখে এনেছেন। যদিও কিছু কিছু সংবাদে তথ্যের অভাব ছিল, ছিল ভিত্তিহীন তথ্যও। যেমন, তাঁরা বলেছেন, বারডেমে অপারেশনের পর লিভারদাতা মারা গেছেন, যা একেবারেই সত্য নয়। তাঁদের সংবাদের কারণে জনমনে যে বিরূপ প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি হয়েছে, কিডনি বা লিভার দানের ব্যাপারে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে, এর ফলে মানুষকে এ কাজে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বও সাংবাদিকদেরই নেওয়া উচিত। আমরা আশা করি, সংবাদমাধ্যমগুলো এ ব্যাপারে তাদের দায়িত্ব পালন করবে।
বাংলাদেশে ‘মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন, ১৯৯৯’ নামে যে আইনটি করা হয়েছে, তা পূর্ণাঙ্গ নয় বলেই আমাদের মনে হয়। এতে বলা হয়েছে, অসুস্থ ব্যক্তির স্বামী বা স্ত্রী, প্রাপ্তবয়স্ক পুত্র বা কন্যা, বাবা-মা, প্রাপ্তবয়স্ক ভাইবোন অথবা নিকটাত্মীয়দের মধ্যে রক্তসম্পর্কীয় আপন চাচা, ফুফু, মামা ও খালা তাঁদের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ দান করতে পারবেন। কিন্তু কথা হচ্ছে, রোগীর কোনো বন্ধু তাঁর লিভার স্বেচ্ছায় দিতে চাইলে তিনি তা কেন দিতে পারবেন না? আমরা প্রস্তাব করছি, এ ব্যাপারে আইন কিছুটা সংশোধন করা হোক। রক্তীয় নয়, অথচ রোগীর ঘনিষ্ঠ বন্ধুরা যাতে চাইলে তাঁর কিডনি বা লিভার দান করতে পারেন, সেই সুযোগ রাখা হোক। তবে এ ক্ষেত্রে কোনো আর্থিক লেনদেন হচ্ছে কি না, তা দেখার জন্য একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করে দেওয়া যেতে পারে। অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বেচাকেনার মতো ঘৃণ্য অপরাধ যেন কোনোভাবেই না ঘটতে পারে, এর জন্য আইনে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা রাখা হোক, আইনকে প্রয়োজনে আরও কঠোর করা হোক।
 অধ্যাপক এ কে আজাদ খান: চিকিৎসাবিজ্ঞানী ও সমাজকর্মী। সভাপতি, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি।
 ফরিদ কবির: কবি ও প্রাবন্ধিক। যুগ্ম পরিচালক, বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতি।

No comments

Powered by Blogger.