আবার রক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে দুই ছাত্র নিহত হয়েছেন। নিহত দুজনই ছাত্রশিবিরের নেতা। সংঘর্ষে প্রক্টরসহ অন্তত ৪০ জন আহত হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ধরনের ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করেছে। জামায়াতে ইসলামীর ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির আজ চট্টগ্রাম মহানগর এলাকায় সকাল ছয়টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত হরতাল ডেকেছে।


শিবিরের মহানগর (উত্তর) শাখার সভাপতি মোহাম্মদ ইসমাইল কর্মসূচি ঘোষণা করার বিষয়টি প্রথম আলোকে নিশ্চিত করেন।
নিহত দুজন হলেন ইংরেজি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র মাসউদ বিন হাবিব এবং প্রাণিবিদ্যা বিভাগের পুরাতন প্রথম বর্ষের মোজাহিদুল ইসলাম।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি বদিউল আলম জানান, মাসউদ বিন হাবিব শিবিরের সোহরাওয়ার্দী হল শাখার সভাপতি এবং মোজাহিদুল ইসলাম ছিলেন শিবিরের সাথি (সার্বক্ষণিক কর্মী)। তিনি শহীদ আবদুর রব হলের আবাসিক ছাত্র ছিলেন।
সংঘর্ষের পর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গতকাল সন্ধ্যা সাতটার মধ্যে ছাত্রদের এবং আজ বেলা দুইটার মধ্যে ছাত্রীদের হল ছাড়ার নির্দেশ দিয়েছে। ১৬ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সব ক্লাস ও পরীক্ষা স্থগিত করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন সিন্ডিকেট সদস্য কামরুল হুদা। আজ বিকেল চারটায় সিন্ডিকেটের জরুরি সভা ডাকা হয়েছে।
প্রত্যক্ষদর্শী শিক্ষার্থী ও পুলিশ জানায়, ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে সংঘর্ষের একপর্যায়ে উভয় পক্ষের কিছু নেতা-কর্মী পাশের পাহাড়ে উঠে যান। সেখানেও তাঁরা সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা শিবিরের দুই নেতাকে ঘিরে ফেলে পেটাতে থাকেন। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে সংঘর্ষ একটু থেমে এলে পাহাড়ের ওপর থেকে আহত দুজনকে উদ্ধার করে পুলিশ। হাসপাতালে নেওয়ার পথে আহত মোজাহিদ মারা যান। আর মাসউদকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সূত্রপাত: প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শ্রেণীকক্ষে গতকাল দুপুর ১২টার দিকে দুই সহপাঠীর মধ্যে কথা-কাটাকাটির জের ধরে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয়। এর আগে মঙ্গলবার রাতে এই দুই সহপাঠীর মধ্যে বিতণ্ডা হয়। তাঁদের একজন আল আমিন শিবিরের সমর্থক। অন্যজন শাহীন আওয়ামী লীগের ছাত্রসংগঠন ছাত্রলীগের সমর্থক।
এর আগে ৪ ফেব্রুয়ারি বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় খেলার মাঠে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে ক্রিকেট খেলাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটে। এ নিয়ে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী শাহীন ও আল আমিনের মধ্যে মঙ্গলবার রাতে সোহরাওয়ার্দী হলে কথা-কাটাকাটি হয় বলে জানান একজন সহকারী প্রক্টর।
মঙ্গলবার রাতের ঘটনার জের ধরে গতকাল কলাভবনের ৪১৯ নম্বর শ্রেণীকক্ষে আবারও দুই সহপাঠীর মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হাতাহাতি হলে তাঁরা উভয়ে মুঠোফোনে ঘটনাটি নিজ সংগঠনের নেতা-কর্মীদের জানান। খবর পেয়ে উভয় পক্ষ ঘটনাস্থলে কলাভবনে উপস্থিত হলে উত্তেজনা বাড়তে থাকে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, কলাভবনেই উভয় পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। পরে তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো ক্যাম্পাসে। এর প্রায় ৪৫ মিনিট পর ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবির শাহজালাল হলের দুই পাশে অবস্থান নেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক, প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যরা, বিভিন্ন হলের প্রাধ্যক্ষ ও পুলিশ প্রশাসন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দুই পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে। কিন্তু উভয় পক্ষ মারমুখী অবস্থানে থাকায় এ আলোচনা ব্যর্থ হয়।
সমঝোতার চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর থেমে থেমে উভয় পক্ষের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা চলতে থাকে। এ সময় উভয় পক্ষের নেতা-কর্মীরা সশস্ত্র অবস্থান নেন। দুই পক্ষই ফাঁকা গুলি বর্ষণ করে। বেলা দুইটার দিকে পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়।
পরে আড়াইটার দিকে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে আবার পাল্টাপাল্টি ধাওয়া হয়। একপর্যায়ে শিবিরের ধাওয়া খেয়ে ছাত্রলীগের কর্মীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফটকের বাইরে চলে যান। পরে ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা সংগঠিত হয়ে শিবিরের নেতা-কর্মীদের পাল্টা ধাওয়া দেন। তখন পুলিশ উভয় পক্ষকে ছত্রভঙ্গ করার চেষ্টা করে। একপর্যায়ে ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের কিছু নেতা-কর্মী পাশের পাহাড়ে উঠে যান। সেখানে তাঁরা আবার সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় ছাত্রলীগের কর্মীরা শিবিরের দুই নেতাকে পেয়ে পেটাতে থাকেন। এ সময় গুলির শব্দ শোনা যায়। পরে সংঘর্ষ একটু থেমে এলে পাহাড়ের ওপর থেকে আহত দুজনকে উদ্ধার করে পুলিশ। আহত মোজাহিদ হাসপাতালে নেওয়ার পথে মারা যান। আর মাসউদকে হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকেরা মৃত ঘোষণা করেন।
উপাচার্য আনোয়ারুল আজিম আরিফ সাংবাদিকদের বলেন, দুই পক্ষের মধ্যে দুপুরের সংঘর্ষের ঘটনাটি জানার পর উভয় পক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মহলের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়েছে। ক্যাম্পাসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের স্বল্পতা ছিল। শহর থেকে পুলিশ আসতে আসতে এ ঘটনা ঘটেছে।
উপাচার্য আরও বলেন, ‘দুই ছাত্র নিহত হওয়ার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হবে। কমিটির প্রতিবেদন পাওয়ার পরই আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
পুলিশের স্বল্পতা প্রসঙ্গে চট্টগ্রাম জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, আসলে ক্যাম্পাসে পর্যাপ্তসংখ্যক পুলিশ ছিল। ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল বলে শুরুতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যায়নি।
নজরুল ইসলাম আরও বলেন, সংঘর্ষ চলাকালে পুলিশ উভয় সংগঠনের মাঝখানে অবস্থান নেয়। উভয় সংগঠন পুলিশকে উপেক্ষা করে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ে।
ধরপাকড়: সংঘর্ষের পর পুলিশ শিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক, সাংগঠনিক সম্পাদকসহ ১১ জনকে আটক করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা শিবিরের সভাপতি বদিউল আলম সংঘর্ষের জন্য ছাত্রলীগকে দায়ী করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘ছাত্রলীগের উদ্দেশ্য ছিল ক্যাম্পাস থেকে আমাদের বিতাড়িত করা। পুলিশ উল্টো আমাদের নেতা-কর্মীদের আটক করেছে।’
ছাত্রলীগের জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি আবুল মনসুর সিকদার দুজনের খুনের ঘটনায় ছাত্রলীগের কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেন। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ‘আমাদের শীর্ষ নেতারা ঢাকায় অবস্থান করছেন। এই সুযোগে শিবির কয়েক দিন ধরে ক্যাম্পাসে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে আসছিল, যার পরিণতি দুই ছাত্রের খুনের ঘটনা।’
নিহতদের দেহে গুলির চিহ্ন: পাল্টাপাল্টি ধাওয়া থামাতে গেলে এক পক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় প্রক্টর ও পদার্থবিদ্যা বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ নাসিম হাসানের মুখে পাথর ছুড়ে মারে। এতে তিনি মুখে আঘাত পান। তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয় চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া হয়। তিনিসহ মোট ৪০ জন আহত হন।
ছাত্রলীগ ও শিবিরের সংঘর্ষের পর বেলা তিনটা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে আহত ১৭ জনকে আনা হয়। তাঁদের মধ্যে আহত মোজাহিদকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকেরা। তাঁর মাথায় গুলির চিহ্ন রয়েছে। মোজাহিদ মিরসরাইয়ের ইসমত জাফরাবাদ সুফিয়া বাজার এলাকার হুমায়ুন কবিরের ছেলে।
এরপর বিকেল সোয়া চারটার দিকে হাসপাতালে আনা হয় তিন ছাত্রকে। তাঁদের মধ্যে মাসউদ বিন হাবিবকে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। মাসউদের বাড়ি হবিগঞ্জে।
সুরতহাল প্রতিবেদন করার দায়িত্বে নিয়োজিত পাঁচলাইশ থানার উপপরিদর্শক (এসআই) গোলাম কিবরিয়া জানান, মাসউদের মাথায় সাত ইঞ্চি লম্বা একটি কোপের জখম, থুতনিতে গুলির চিহ্ন ছাড়াও ডান হাত ও সংলগ্ন পিঠে পাঁচটি ছোরার ক্ষত রয়েছে। তিনি জানান, মোজাহিদের মাথায় গুলির চিহ্ন ছাড়াও পিঠ ও হাতে চারটি কোপের চিহ্ন রয়েছে।
হাসপাতালের বাইরে উত্তেজনা: দুই ছাত্রের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে হাসপাতালের বাইরে ক্ষোভ-উত্তেজনা বাড়তে থাকে। বিকেল পাঁচটার দিকে ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ড থেকে মাসউদ ও মোজাহিদের লাশ বের করে মর্গে নিয়ে যাওয়ার সময় শিবিরকর্মীরা স্লোগান দিতে দিতে লাশের পেছন পেছন যেতে শুরু করেন। এ সময় লাশের সঙ্গে থাকা তিন পুলিশ দ্রুত লাশ দুটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের একাডেমিক ভবনের সীমানায় নিয়ে যায়। পরে অতিরিক্ত পুলিশ এনে সেখান থেকে লাশ দুটি মর্গে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে মর্গের সামনে শিবিরের শত শত নেতা-কর্মী জড়ো হন।
লাশ শনাক্ত: সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে হাসপাতাল মর্গে এসে মোজাহিদের লাশ শনাক্ত করেন তাঁর ফুফাতো ভাই রেজাউল করিম। তাঁরা তিন ভাই দুই বোন। রেজাউল মিরসরাইয়ে মোজাহিদের গ্রামের বাড়িতে মুঠোফোনে তাঁর মৃত্যুসংবাদ জানান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আরও যত হত্যাকাণ্ড: মাত্র এক মাস আগে ৯ জানুয়ারি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হামলায় মারা যান ইংরেজি বিভাগের ছাত্র জুবায়ের আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০১০ সালে নির্মমভাবে খুন হন আবু বকর। ২০০৯ সালের ৩১ মার্চ ঢাকা মেডিকেল কলেজে ছাত্রলীগের দুই পক্ষের সংঘর্ষে মারা যান ওই কলেজের ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক আবুল কালাম আজাদ।
২০০৯ সালের ১৩ মার্চ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগ-শিবির সংঘর্ষে নিহত হন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিবিরের সাধারণ সম্পাদক শরীফুজ্জামান নোমানী। ২০১০ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি শিবিরের হামলায় নির্মমভাবে মারা যান ছাত্রলীগ কর্মী ফারুক হোসেন। একই বছর ১৫ আগস্ট শোক দিবসের টোকেন ভাগাভাগিকে কেন্দ্র করে শাহ মখদুম হলের দোতলার ছাদ থেকে ছাত্রলীগ কর্মী নাসিমকে ফেলে দেয় প্রতিপক্ষের ছাত্রলীগের কর্মীরা। নয় দিন মুমূর্ষ অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকার পর ২৩ আগস্ট তাঁর মৃত্যু হয়। ২০১০ সালের ৭ জানুয়ারি ছাত্রলীগের হামলায় রাজশাহী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটে ছাত্রমৈত্রীর সহসভাপতি রেজওয়ানুল ইসলাম চৌধুরী মারা যান।

No comments

Powered by Blogger.