বইয়ের মেলা প্রাণের মেলা-মেলায় ভাটার টান by আশীষ-উর-রহমান

বইমেলায় শুরু হয়ে গেছে ভাটার টান। পেরিয়ে গেছে অমর একুশে। ফেব্রুয়ারির বাকি দিনগুলোতেও মেলা চলবে। তবে আগের মতো জনজোয়ার আর ফিরবে না। এমনটাই দেখা যায় বরাবর। একুশের পরের দিনগুলোতে বেশ নিরিবিলি পরিবেশ নেমে আসে মেলা চত্বরে। দেখেশুনে বই কেনার জন্য এ দিনগুলো আদর্শ।


এ জন্য ভিড় কমলেও বিক্রি বেশ ভালোই থাকে মেলার শেষ কয়েক দিনে। গতকাল বুধবারও মেলার পরিবেশ ছিল এমন ছিমছাম।
শিশু প্রহর
আজ বৃহস্পতি ও কাল শুক্রবার মেলায় বেলা ১১টা থেকে তিনটা পর্যন্ত ‘শিশু প্রহর’ ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময় শিশুরা অভিভাবকদের সঙ্গে মেলায় ঢুকে পছন্দের বই কিনতে পারবে। শিশু না থাকলে শুধু বড়দের এ সময় মেলায় প্রবেশ নিষেধ। মেলা সবার জন্য খোলা সেই তিনটার পর থেকে।
নীতিমালা ভঙ্গকারীদের তালিকা
নীতিমালার তোয়াক্কা না করে যারা স্টলে নেটবই, নকল বই, অন্য প্রকাশনীর বই বা অন্যান্য সামগ্রী তুলেছে কিংবা স্টল বিক্রি করে দিয়েছে, তাদের একটি তালিকা করা হয়েছে। কয়েকজন প্রকাশককে সতর্ক করে দিয়ে নোটিশ দেওয়া হয়েছে। বই জব্দ করা হয়েছে। আগামী বছর এসব প্রতিষ্ঠানকে স্টল বরাদ্দ না দেওয়ার জন্য সুপারিশ করা হবে। গতকাল মেলা চত্বরে এসব কথা জানালেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব বাংলা একাডেমীর পরিচালক সাহিদা খাতুন। সহকর্মীদের নিয়ে মেলার স্টলগুলো পরিদর্শন করছিলেন তিনি। বেশ কিছু বই জব্দ করা হয় এ সময়।
পরিদর্শন চলার সময় প্রথম আলোকে সাহিদা খাতুন বললেন মেলার সুষ্ঠু পরিবেশ বজায়ে তাঁদের প্রচেষ্টার কথা। তিনি বলেন, ‘আমরা সীমিত সামর্থ্য নিয়ে যথাসাধ্য চেষ্টা করছি সুষ্ঠু সুন্দর মেলা করতে। তার পরও নানা কারণেই সর্বাঙ্গীণ সুন্দর করা যায় না। বিশেষ করে বাইরের মেলায় স্টল বিক্রি করাসহ নীতিমালা লঙ্ঘন করার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে। ভেতরেও অনেকে নেট বা বিদেশি বই তুলেছেন। আমরা সেসব বই জব্দ করছি। প্রতিদিন একাধিকবার মহাপরিচালক এবং আমরা স্টলগুলো পরিদর্শন করছি। প্রাঙ্গণের পরিবেশ ভালো আছে।’
গত কয়েক বছর থেকে মেলায় দেখা যাওয়া তারুণ্যের উচ্ছ্বাসের প্রশংসা করলেন মেলা পরিচালনা কমিটির সদস্য সচিব। তিনি বললেন, ‘অনেক তরুণ প্রকাশক এসেছেন, তাঁরা প্রতিষ্ঠিত লেখকদের পাশাপাশি অনেক নবীন সম্ভাবনাময় লেখকের বই প্রকাশ করছেন। এ ব্যাপারটি আমাদের উৎসাহিত করেছে। একাডেমী সব সময়ই যাঁরা ভালো কাজ করছেন, তাঁদের সহায়তা দিয়ে যাবে।’
ভুলে ভরা বই লজ্জাকর: লালন-গবেষক, প্রাবন্ধিক অধ্যাপক আবুল আহসান চৌধুরীর সঙ্গে কথা হলো একাডেমীর প্রশাসনিক ভবনে। এবার মেলায় তাঁর নতুন ও পুরোনো বইয়ের সংস্করণ মিলিয়ে প্রায় ১২টি বই এসেছে। তবে মুদ্রণ প্রমাদ নিয়ে তিনি খুব অসন্তুষ্ট। বললেন, ‘ছাপার মান, বিষয়বস্তু যতই ভালো হোক, বইতে যখন অজস্র বানান ভুল থেকে যায়, তখন তা লেখক হিসেবে অন্যের হাতে তুলে দিতে লজ্জা পাওয়া উচিত। প্রকাশকদের আরও বেশি লজ্জা পাওয়া উচিত। কিন্তু বাস্তবে তা দেখছি না।’
আবুল আহসান চৌধুরী আরও বললেন, প্রুফ সংশোধন করার মতো পর্যাপ্ত অভিজ্ঞ লোক নেই। একাডেমী দায়িত্ব নিয়ে দক্ষ জনবল সৃষ্টির উদ্যোগ নিতে পারে। তেমনি প্রকাশকেরাও মেলার আগে তাড়াহুড়ো করে বই না ছাপিয়ে সারা বছর প্রস্তুতি নিয়ে ধীরে ধীরে ছাপার কাজ চালিয়ে গেলে নির্ভুল বই প্রকাশ করা অসম্ভব নয়। অধ্যাপক চৌধুরীর মতে, দেশে প্রকাশনা শিল্প বিকশিত হতে হতেও একটা জায়গায় এসে থমকে গেছে। অনেক অযোগ্য, অনভিজ্ঞ লোক এ ব্যবসায় নেমে গেছেন। ফলে এমন সব বই ছাপা হচ্ছে, যা ছাপা না হলেও বাংলা সাহিত্যের কিছু ‘যায় আসে না’।
এবার মেলায় আবুল আহসান চৌধুরীর বইগুলোর মধ্যে রয়েছে রবীন্দ্রনাথ-বাউল সংস্কৃতি ও অন্যান্য, কালান্তরের পথিক লালন, লোকসংস্কৃতি বিবেচনা ইত্যাদি।

নতুন বই
গতকাল নজরুল মঞ্চে এক ডজন নতুন বইয়ের মোড়ক উন্মোচন হয়েছে। তথ্যকেন্দ্রের নতুন বইয়ের তালিকায় নাম আছে ৮৯টি। প্রথমার স্টলে গতকাল নতুন বই আসেনি। আগের দিনে এসেছে অকালপ্রয়াত চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদের চলচ্চিত্রবিষয়ক বই চলচ্চিত্র যাত্রা। এ ছাড়া শামীম আমিনুর রহমানের ঢাকাবিষয়ক শিল্পীর চোখে ঢাকা: ১৭৮৯-১৯৪৭ বইটিও ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এ বইতে রয়েছে অনেক অপ্রকাশিত দুর্লভ ছবি। সেসব ছবিতে এই ৪০০ বছরের রাজধানী শহরকে দেখা যাবে তার বিভিন্ন বয়সের চেহারায়।
অন্য নতুন বইয়ের মধ্যে আছে: ঐতিহ্য থেকে আনিসুজ্জামান ও মালেকা বেগম সম্পাদিত প্রবন্ধ নারীর কথা, অ্যাডর্ন থেকে ফয়েজ আহমদের ছড়া পাখি সব করে রব, হাক্কানী পাবলিশার্স থেকে আব্দুল কাইয়ুমের প্রবন্ধ বঙ্গবন্ধু থেকে বাংলাদেশ, অন্যপ্রকাশ থেকে হুমায়ূন আহমেদের বাছাই গল্প, এম এ করীমের স্বাস্থ্যবিষয়ক পরমাণু বিদ্যুৎ স্বাস্থ্য ও অন্যান্য প্রসঙ্গ, অংকুর থেকে রতন তনু ঘোষের বিজ্ঞানবিষয়ক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীদের প্রবন্ধ, কথা প্রকাশ থেকে আরিফ খানের সহজ ভাষায় বাংলাদেশের সংবিধান, বিদ্যাপ্রকাশ থেকে দন্ত্যস রওশনের শিশুতোষ উপন্যাস নোটু নম্বর টু, সাহিত্যবিলাস থেকে ফজল-এ-খোদার কাব্য নির্জন পঙিক্তমালা, মিনার মনসুরের কাব্য মা এখন থেমে যাওয়া নদী, উৎস থেকে হাসনাইন সাজ্জাদীর কাব্য একশ কোটি তেজস্ক্রিয়তা, রোদেলা থেকে নূর কামরুন নাহারের গল্পগ্রন্থ শিস দেয়া রাত, শব্দশিল্প থেকে জাওয়াদ তাজওয়ার মাহবুবের ছড়া শত ডাল হাজার পাতা।

মেলা মঞ্চে
মেলা মঞ্চের নিয়মিত অনুষ্ঠান চলছে। গতকাল ছিল ‘বাংলার মনীষা: আহমদ শরীফ’ শীর্ষক আলোচনা। প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আবুল আহসান চৌধুরী। আলোচনা করেন অধ্যাপক আহমদ কবির, অধ্যাপক ভীষ্মদেব চৌধুরী ও অধ্যাপক মুহম্মদ আবদুল জলিল। সভাপতিত্ব করেন অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক। সন্ধ্যায় ছিল নাসির উদ্দীন ইউসুফ পরিচালিত মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক চলচ্চিত্র গেরিলার প্রদর্শনী।

No comments

Powered by Blogger.