দি ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন-শুধুই তামাশা নয়, এটা অন্য এক কৌশলের শুরু!

বাংলাদেশের রাজনীতিতে হঠাৎ করে উদ্ভট একটা ব্যাপার ঘটে গেছে। এর ভিত্তিতে পর্যবেক্ষকেরা এখন এ কথা ভাবতে প্রলুব্ধ হচ্ছেন যে বাংলাদেশের রাজনীতির একটি মৌলিক নীতি আর খুব বেশি দিন কাজে আসবে না। সেই নীতিটি হলো, আওয়ামী লীগ সব সময় নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে সিদ্ধহস্ত। এ ধারণা অনেক দিন অক্ষতই ছিল।


এখনো কি সেই নীতি নেই? বিশ্বব্যাংকের প্রধান পদে নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ ও ক্ষুদ্রঋণের প্রবক্তা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নাম প্রস্তাব করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এমন ঔদার্যপূর্ণ প্রস্তাব সেই রাজনীতিকের কাছ থেকেই এল, যিনি কিনা ইউনূসকে তাঁর নিজের প্রতিষ্ঠিত গ্রামীণ ব্যাংকের প্রধানের পদ থেকে সরিয়ে দিয়েছেন এবং সর্বশেষ অভিযোগ তুলেছেন, ইউনূসের কারণেই বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতু প্রকল্পের টাকা আটকে দিয়েছে। বাংলাদেশে এযাবৎকালের মধ্যে অবকাঠামো খাতের সবচেয়ে বড় প্রকল্প এ পদ্মা সেতু। এ সেতু হলে রাজধানী ঢাকার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত হতে পারবে দেশের অনুন্নত দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল।
শেখ হাসিনার এ পরিবর্তনে বাংলাদেশের মানুষ বিস্মিত। ডেইলি স্টার পত্রিকার এক পাঠক মন্তব্য করেছেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আপনি আন্তরিক হতে পারেন না!!’ আরেক পাঠক ব্যঙ্গ করে বলেছেন, সব রাজনীতিবিদ প্রধানমন্ত্রীর মতো বিজ্ঞ হলে বাংলাদেশ শিগগির সুইজারল্যান্ড হয়ে যাবে।
বাংলাদেশিদের মধ্যে এমন লোক নেহাত হাতেগোনা, যাঁরা বিশ্বাস করেন, বিশ্বব্যাংকের প্রধান হওয়ার জন্য ড. ইউনূস সত্যিই চেষ্টা করবেন। তবে বেশির ভাগ মানুষই এ কথা ভেবে বিস্মিত যে ড. ইউনূসের সুনামহানির এত জোর চেষ্টা এবং তাঁকে উৎখাতের পর এখন প্রধানমন্ত্রী নিজেই কেন আবার তাঁর জন্য সুপারিশ করছেন।
শেখ হাসিনা এমন একজন নারী, যিনি কখনো পিছু হটেন না। হাসিনার অনমনীয়তা তাঁর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী খালেদা জিয়ার মতোই প্রসিদ্ধ। এ জন্য অনেক মূল্যও দেওয়া লাগে। যেমন রাজধানীর কাছে একটি নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত তিনি ত্যাগ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার আগে অনেক বড় বিক্ষোভ-রক্তক্ষয় হয়ে গেছে।
ড. ইউনূসের সঙ্গে সরকারের আচরণ নিয়ে পশ্চিমা সরকারগুলো, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র অনেক দিন ধরেই অসন্তুষ্ট। ক্ষুদ্রঋণের এ প্রবক্তার অনেক সুহূদ সেখানে আছেন, যার মধ্যে আছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনও। মার্কিন কর্মকর্তারা বারবার এ কথা বলে সতর্ক করে দিয়েছেন যে ড. ইউনূসের সঙ্গে দুর্ব্যবহার দুই দেশের সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে। তারা কোনো ব্যক্তিকে সাহায্য করার চেষ্টা করছে অথচ সরকার গোঁয়ার্তুমি করে সেই ব্যক্তিকেই অবজ্ঞা করার চেষ্টা করলে সে ক্ষেত্রে কী করতে হয়, তা তারা বেশ ভালোভাবেই জানে।
বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও জাপানসহ দাতাদের আরও বিরক্ত করতে বাংলাদেশ সরকার তাদের সাবেক যোগাযোগমন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেনকে সরাতে তিন মাস সময় নিয়েছে। পদ্মা সেতুর তিন বিলিয়ন মার্কিন ডলার তাঁর হাতে দিলে সেই অর্থ নিরাপদ থাকবে না বলে জানিয়েছিল বিশ্বব্যাংক। যদিও বাংলাদেশের সুনম্য দুর্নীতি দমন কমিশন আবুল হোসেনকে সব দুর্নীতির অভিযোগ থেকে মুক্তি দিয়েছে। কিন্তু এর পরও ঋণের এক বিলিয়ন ডলার ছাড় করেনি আইএমএফ। অর্থছাড় না করার সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ না জানালেও সংস্কার কার্যক্রমে ধীরগতির অজুহাত দেখানো হয়েছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অবস্থা নড়বড়ে, তাদের মুদ্রা টাকার অবস্থা এশিয়ার মধ্যে সবচেয়ে বেহালে এবং বৈদেশিক মুদ্রার যে রিজার্ভ রয়েছে তা তিন মাসের রপ্তানি-ব্যয় মেটাতে গেলেই উধাও হয়ে যাবে। অপরিকল্পিত জ্বালানিনীতির কারণে বাজেট ঘাটতি পূরণে অর্থের প্রয়োজন, আমদানি করা জ্বালানি তেলেই চলছে বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশ সরকার দাবি করছে, পদ্মা সেতুতে অর্থ বিনিয়োগ করতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিনিয়োগকারীরা। অবকাঠামোগত উন্নয়নের জন্য এটা হবে মিয়ানমারের পদ্ধতি বা বলা যেতে পারে কম্বোডিয়ার মতো।
শেখ হাসিনা সম্ভবত অন্যান্য দাতা দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ার চেষ্টা করছেন। কাজেই বিশ্বব্যাংকের প্রধান পদে ড. ইউনূসের নাম প্রস্তাব শুধুই তামাশা নয়, এটা অন্য এক কৌশলের কেবল শুরু।

No comments

Powered by Blogger.