সরকারের টনক আর কবে নড়বে?-ছাত্রলীগের শিক্ষক প্রহার

ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের হাতে প্রহূত এক শিক্ষকের উক্তিটি শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসের ভয়াবহতার একটা সূচক হতে পারে। তিনি বলেছেন, ‘দুঃখের কথা কী বলব! ছাত্রদের হাতে আজকের আমার এই গণপিটুনির কথা কোনো দিন ভুলব না।’


কিন্তু আমরা ভুলে গেছি, গত কয়েক বছরে ছাত্রলীগের কর্মীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সিলেটের বিশ্বনাথ কলেজ, বরিশালের বিএম কলেজ, কক্সবাজার পলিটেকনিক কলেজসহ আরও কিছু ক্ষেত্রে শিক্ষকের ওপর হামলা করেছিলেন। তা সত্ত্বেও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেভাবে ধাওয়া করে গণহারে শিক্ষক পেটানো হয়েছে, তা ছাত্রলীগের জন্য বাহাদুরি হলেও দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জার।
শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী শক্তির দাপট কেমন ভয়াবহ স্তরে পৌঁছেছে, এ ঘটনায় তারই প্রমাণ মিলল। হামলায় আহত হয়েছেন ২০ জন শিক্ষক, যাঁদের একজনের অবস্থা গুরুতর। ছাত্রলীগের নেতারা এখনো অনুতাপহীন; সংগঠনটির কেন্দ্রীয় পর্যায় থেকে বিষয়টা তদন্তের খবর পাওয়া গেছে। প্রশ্ন এখন একটাই, এত বড় কলঙ্কিত ঘটনায়ও কি সরকারের টনক নড়বে না? শিক্ষাঙ্গনে সন্ত্রাসী আধিপত্য কত ভয়াবহ জায়গায় চলে গেলে এমন ঘটনা ঘটতে পারে, সরকারের নীতিনির্ধারকদের উচিত তার পরিমাপ করতে বসা।
ছিনতাইকারী ছাত্রলীগ কর্মীদের ধরিয়ে দেওয়াকে কেন্দ্র করে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরের সংঘাত সৃষ্টি হয়। প্রথম হামলার শিকার হয় তাঁর বাসভবন। এর প্রতিবাদে শিক্ষকদের মৌন মিছিলে কটূক্তি ও গালাগালের অভিযোগে ছাত্রলীগের আরও কিছু সদস্য আটক হন। তাঁদের ছাড়িয়ে নিতে না পেরে প্রতিহিংসাবশত আক্রমণ করা হয় শিক্ষকদের ওপর। শিক্ষকদের দপ্তর ভাঙচুর করা হয়, আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয় তাঁদের কারও কারও যানবাহনে।
ছাত্রের হাতে শিক্ষকের প্রহার অসভ্যতার এক চরম নিদর্শন। এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। কিছুদিন পর পর কোনো না কোনো শিক্ষাঙ্গনে এটা ঘটছে। ক্রমাগত ছাড় পেয়ে ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের দানবে পরিণত হওয়া এই সন্ত্রাসীরা জানে, ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক দখলদারি, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন দুর্নীতি ঘটাতে তাদের দরকার হবেই। অনেক সময় শিক্ষক ও প্রশাসনের ক্ষমতাবান ব্যক্তিরাও ছাত্রসংগঠনগুলোকে ব্যবহার করে থাকেন। এসবই এখন বুমেরাং হয়ে আঘাত করছে খোদ শিক্ষকদের। এসবেরই ফল হলো ক্যাম্পাসগুলোতে সরকার প্রভাবিত ছাত্রসংগঠনের একচ্ছত্র রাজত্বে সাধারণ শিক্ষার্থীদের চুপসে থাকা, নিপীড়িত হওয়া। এরই মধ্যে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রলীগের নেতাকে না চেনার অপরাধে কয়েকজন ছাত্রকে পিটিয়ে আহত করার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব শাস্তির পাশাপাশি আইনি শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। নিরপেক্ষতা, আইনের কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে এই দুরবস্থা থেকে বেরিয়ে আসা অসম্ভব হবে না। কিন্তু সব দেখেশুনে সরকারের কাছে একটাই প্রশ্ন—আর কত ঘটবে, সরকারের টনক আর কবে নড়বে?

No comments

Powered by Blogger.