দায় শুধু চালকের নয় by জাহিরুল ইসলাম

গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে কথা বলতে গিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। তাই গত কয়েকদিন যাবৎ চালকদের মোবাইল ফোন ব্যবহারের ব্যাপারে বেশ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। খবরে জানা গেছে, সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ন্ত্রণের জন্য মোবাইল ফোন জব্দসহ আইন সংশোধনের মাধ্যমে চালকদের জন্য কঠোর শাস্তির বিধান করা


হচ্ছে। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বেপরোয়া চালকদের বিরুদ্ধে এ রকম শাস্তিমূলক পদক্ষেপ নিঃসন্দেহে সাধুবাদযোগ্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেবল এই শাস্তিমূলক পদক্ষেপের মাধ্যমেই কি সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব? বিশেষজ্ঞরা বলেন, সড়ক দুর্ঘটনা রোধে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত চালক, গাড়ির সঠিক ফিটনেস এবং মানসম্পন্ন রাস্তা প্রয়োজন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এই তিনটি প্রয়োজন একই সঙ্গে। এগুলোর কোনো একটিতে ঘাটতি থাকলে সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা সম্ভব নয়। প্রশ্ন হলো, এই শর্তগুলো আমরা সঠিকভাবে পূরণ করতে পারছি কি?
বিআরটিএর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, সারাদেশে ১৪ লাখ রেজিস্টার্ড গাড়ির বিপরীতে লাইসেন্সধারী চালকের সংখ্যা ৯ লাখ ৬০ হাজার। তাহলে এটা সন্দেহাতীতভাবে ধরে নেওয়া যায় যে, বাকি গাড়ির চালকদের লাইসেন্স নেই। পরিবহন সূত্রগুলোর মতে, সারাদেশে লাইসেন্সবিহীন চালকের সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। কারণ, প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নিয়ে মাসের পর মাস বিআরটিএ অফিসে ঘুরে বৈধ লাইসেন্স সংগ্রহ করে চালকের আসনে বসার তাগিদ কেউ অনুভব করে না। অন্যদিকে বাস্তবতা হলো সেই উপায়ও নেই। কেননা, বিআরটিসি ছাড়া ড্রাইভিং শেখার জন্য দেশে মানসম্পন্ন তেমন কোনো প্রতিষ্ঠান নেই। বিআরটিএর তথ্যমতে, ঢাকা শহরে অনুমোদিত ড্রাইভিং সেন্টারের সংখ্যা ২৭টি। আর সারাদেশে রয়েছে ৪৫টি। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে দেখা যায়, বিআরটিএর অনুমোদনপ্রাপ্ত ড্রাইভিং সেন্টারগুলোতেও রয়েছে নানা রকম অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা। ড্রাইভিং সেন্টার পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো নীতিমালাও নেই। শুধু কি তাই? খোদ বিআরটিএর কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে টাকার বিনিময়ে অদক্ষ চালককে লাইসেন্স প্রদান এবং টাকা না পেয়ে দক্ষ চালককেও লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে গড়িমসির অভিযোগ রয়েছে।
গাড়ির ফিটনেসের বিষয়টিও এখানে প্রাসঙ্গিক। অ্যাকসিডেন্ট রিসার্চ ইনস্টিটিউটের গবেষণায় দেখা গেছে, গত তের বছরে গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে চারগুণ। গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও ফিটনেসের কোনো উন্নতি হয়নি। বিআরটিএর তথ্যমতে, রাস্তায় চলাচলকারী শতকরা ৮০ ভাগ গাড়িরই ফিটনেস ঠিক নেই। রাস্তার মান নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এছাড়া প্রতিদিন নতুন নতুন গাড়ি রাস্তায় নামছে। ফলে রাস্তার ব্যবহার বাড়ছে। বাড়ছে রাস্তার ওপর অতিরিক্ত চাপ। কিন্তু সে তুলনায় রাস্তার পরিচর্যা করা হচ্ছে না। সড়ক দুর্ঘটনা রোধে পথচারীরও সচেতনতার বিকল্প নেই। কতজন মানুষ ট্রাফিক আইন জানে এবং তা সচেতনভাবে মান্য করে?
সড়ক দুর্ঘটনা সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনেও দুর্বলতা রয়েছে। বিদ্যমান আইনে দুর্ঘটনাকারী চালকের জন্য সর্বোচ্চ শাস্তি তিন বছরের কারাদণ্ড। জামিনও হয়ে যায় ২৪ ঘণ্টায়। অথচ এ দেশেই একটি বাঘ হত্যার সর্বোচ্চ শাস্তি ১২ বছরের কারাদণ্ড। তাহলে সুন্দরবনের বাঘের চেয়ে কি মানুষের জীবনের মূল্য কম? গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতিবছর সড়ক দুর্ঘটনায় অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় সাড়ে ৭ হাজার কোটি টাকা। পদ্মা সেতু নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয় ধরা হয়েছে ২০ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করা গেলে তিন বছরের ক্ষতির টাকা দিয়েই একটা পদ্মা সেতু নির্মাণ করা সম্ভব। পদ্মা সেতু নির্মাণের অর্থ সংগ্রহের জন্য এখন আমরা দাতাদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছি। অথচ এ ধরনের ক্ষতি এড়ানো গেলে এটা আমরা করতে পারতাম নিজেদেরই টাকায়। কিন্তু এখন আমরা তা পারছি না। এই দায় কি শুধু চালকের? সংশ্লিষ্ট আর কারও কি দায় নেই?
ুধযরৎঁষ.ফঁ@মসধরষ.পড়স
 

No comments

Powered by Blogger.