নাইন-ইলেভেনের দশকপূর্তি ও গুয়ানতানামো বে বন্দিশালা by গাজীউল হাসান খান

যুক্তরাষ্ট্রে, বিশেষ করে নিউ ইয়র্ক ও পেনসিলভানিয়া রাজ্যে নাইন-ইলেভেনের ঘটনার এক দশক পূর্তি উপলক্ষে এবার অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে আয়োজন করা হয়েছিল রাষ্ট্রীয় পর্যায়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের। তাতে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান এবং কয়েকজন সাবেক প্রেসিডেন্ট টুইন টাওয়ার ধ্বংস এবং বিমান দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করতে গিয়ে দেশের জোরদার নিরাপত্তাব্যবস্থার কথা উল্লেখ করেছেন।


তাঁরা বলেছেন, আল-কায়েদার নেতৃত্বাধীন আক্রমণের মুখে ২০০১ সালে যে তিন হাজার নিরীহ মার্কিন নাগরিক নিহত হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ওসামা বিন লাদেন হত্যা ও আল-কায়েদা বা তালেবান ঘাঁটির ওপর ক্রমাগত হামলার মাধ্যমে তার প্রতিশোধ নিয়েছে এবং তাদের নিশ্চিহ্ন না করা পর্যন্ত তা অব্যাহত রাখবে। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রসহ সারা বিশ্বের গণমাধ্যম এবং প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী মহলে কথা উঠেছে, টুইন টাওয়ারে বিমান হামলার সঙ্গে ইরাকের কোনো সম্পর্ক ছিল না। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা পশ্চিমা আধিপত্যবাদের সঙ্গে ইরাকের না ছিল সরাসরি কোনো বিরোধ, না ছিল তাদের কাছে গণবিধ্বংসী কোনো অস্ত্র (উইপনস অব মাস ডেসট্রাকশন)। তবু সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ (ওয়ার অন টেরর) ঘোষণার নগ্ন পরিকল্পনায় ২০০৩ সালে ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল। তাতে ইরাকের সীমাহীন ক্ষয়ক্ষতি সাধন ছাড়াও নিহত হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ছয় হাজার সেনা। এরপর রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধকালীন অসামান্য অর্থ ব্যয়। ২০০৮ সালে জর্জ ডাবি্লউ বুশ যুক্তরাষ্ট্রের শাসনক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও যে অর্থনৈতিক ব্যয় অব্যাহত ছিল, তাতে শুধু মার্কিন মুলুকেই নয়, সারা বিশ্বে অর্থনৈতিক মন্দা ও ধস নেমে আসে। জেনারেল কলিন পাওয়েল, যিনি ২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন প্রশাসনের সেক্রেটারি অব স্টেট ছিলেন, তিনি দুঃখ করে বলেছেন, বিভ্রান্তিকর গোয়েন্দা তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই ইরাক আক্রমণ করা হয়েছিল। কৃষ্ণাঙ্গ জেনারেল পাওয়েল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার আগে যৌথ বাহিনীর সেনাপ্রধানদের চেয়ারম্যান ছিলেন। তাঁর মতে, ইরাক আক্রমণের পুরো বিষয়টি বাস্তবতার চেয়ে বেশি ছিল ভাবাবেগতাড়িত। সাদ্দাম হোসেনের প্রশাসন কিংবা ইরাকের জনসাধারণের সঙ্গে ওসামা বিন লাদেনের নেতৃত্বাধীন আল-কায়েদা কিংবা তালেবানের কোনো সম্পর্ক ছিল না।
নিউ ইয়র্কের টুইন টাওয়ারসহ যুক্তরাষ্ট্রের অন্যান্য স্থানে আক্রমণ পরিচালনাকারী আল-কায়েদা এবং তার নেতাদের আফগানিস্তানে আশ্রয় দেওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র সব সময়ই তালেবানকে দায়ী করে এসেছে। তাদের মতে, আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন, আয়মান আল জাওয়াহিরিসহ অন্যদের পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি পার্বত্য এলাকায় ১৯৯৫ থেকে আশ্রয় দেওয়ার কারণেই আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং ২০০২ সালের জানুয়ারি মাসে যুক্তরাষ্ট্রে আক্রমণ পরিচালনার সঙ্গে জড়িত থাকার দায়ে ২০ জন ধৃত ব্যক্তিকে প্রথমে গুয়ানতানামো বের সুরক্ষিত কারাগারে পাঠানো হয়েছিল; পরবর্তী পর্যায়ে পাকিস্তান ও অন্যান্য স্থান থেকে আরো অনেককে আটক করা হয়, যাঁদের অনেকেই ছিলেন নিরীহ। তাঁদের বিনা জামিনে দীর্ঘদিন আটক রাখা হয় এবং তাঁদের ওপর ইতিহাসের নজিরবিহীন অত্যাচার-নির্যাতন চালানো হয়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০০৮ সালের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন কেন্দ্র করে বিভিন্ন মানবতাবাদী বক্তব্য দিয়েছিলেন সেদিনের তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ প্রার্থী বারাক ওবামা। যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হয়ে তিনি গুয়ানতানামো বে কারাগারে অবৈধভাবে আটক ব্যক্তিদের মুক্তি ও নির্যাতন বন্ধের কথা ঘোষণা করেছিলেন ২০০৯ সালের জানুয়ারির প্রথমেই, অর্থাৎ ক্ষমতা গ্রহণ করার পর পরই। এরপর ইতিমধ্যে তিন বছর পেরিয়ে গেলেও আইনি জটিলতার কারণ দেখিয়ে তিনি এখনো সে ব্যাপারে কিছুই করেননি। সে কারণে জনৈক ব্রিটিশ মুসলিম নাগরিক আটক অবস্থায় গুয়ানতানামো বেতে অনশন ধর্মঘট শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ওই অবস্থায় তাঁর আইনজীবী ও মানবাধিকারকর্মীরা প্রেসিডেন্ট ওবামার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে এখন এক বিরূপ প্রচারাভিযান শুরু করেছেন। তা ছাড়া নাইন-ইলেভেনকে কেন্দ্র করে যুক্তরাষ্ট্রের ইমিগ্রেশন অফিসারসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী স্থানীয় মুসলমান নাগরিক ও বহিরাগত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে যে হয়রানিমূলক ও অবমাননাকর আচরণ চালিয়ে যাচ্ছে, তাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় ও বিশ্বব্যাপী মুসলিম সম্প্রদায় এখন প্রকাশ্যে ক্ষোভ জানাতে শুরু করেছে।
বিশিষ্ট মার্কিন চিন্তাবিদ ও প্রগতিশীল লেখক অধ্যাপক নোয়াম চমস্কি যুক্তরাষ্ট্রের সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধ, কূটনীতি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক বিপর্যয় নিয়ে অনেক কথা বলেছেন। চমস্কি তাঁর সাম্প্রতিক এক লেখায় যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক ও বর্তমান প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের গভীর চিন্তাভাবনাহীন অবস্থান ও অচলায়তনের সমালোচনা করেছেন। তিনি সন্ত্রাস রোধকল্পে শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে সচেতনতা সৃষ্টি ও কৌশলের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। অর্থনৈতিক বিপর্যয় রোধকল্পে রাজনৈতিক বিভেদের পরিবর্তে সমন্বিত ও সুদূরপ্রসারী ঐক্যবদ্ধ পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেছেন। তা ছাড়া তিনি মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির সুস্পষ্টতা ও দৃঢ়তার ওপরও জোর দিয়েছেন। তা না হলে এ পরিস্থিতি আরো জটিল আকার ধারণ করবে বলে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা জগতের চিন্তাশীল লেখক ও বুদ্ধিজীবীরা মত প্রকাশ করেছেন। এ অবস্থায় নাইন-ইলেভেনের এক দশক পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন চিন্তাশীল লেখক সেই ঘটনা-পরবর্তী যুক্তরাষ্ট্রের অর্জনকে কেন্দ্র করে যুক্তিসংগত কিছু প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের বক্তব্যের উল্লেখযোগ্য দিক হচ্ছে, আন্তর্জাতিকভাবে সন্ত্রাস দমন এবং প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড রোধ করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য কতটুকু? ইরাকে আল-কায়েদা জঙ্গি কিংবা বর্তমানে আফগানিস্তানে কী পরিমাণ আল-কায়েদা ও জঙ্গি তালেবান সদস্য হত্যা করা হয়েছে, তা দিয়ে এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের সাফল্য নির্ণয় করা যাবে না। হত্যা, নির্যাতন, আক্রমণ ও পাল্টা-আক্রমণ বরং আরো নৈরাজ্য ডেকে আনবে; শান্তি ও স্থিতিশীলতা অর্জনের ক্ষেত্রে সহায়ক ভূমিকা পালন করবে না। তাঁদের অনেকের মতে, ইরাক আক্রমণ ছিল অহেতুক এবং আফগানিস্তানের বর্তমান সশস্ত্র সংঘর্ষ যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো দিনই বিজয় নিশ্চিত করতে পারবে না। তাতে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনের পরিকল্পনাই চূড়ান্ত বিবেচনায় সফল হয়েছে বলে বিবেচিত হবে। তাঁদের মতে, ১৯৮৯ সালে আফগানিস্তানে সোভিয়েত রাশিয়ার পরাজয় চেয়েছিল লাদেন বাহিনী। তার পরিবর্তে তারা মুসলিম বিশ্বে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ কিংবা পশ্চিমা আধিপত্যবাদীদের শোষণ-শাসন চায়নি। তারা ফিলিস্তিনে ইহুদিবাদী দখলদারি কোনো দিনই মেনে নেয়নি। সে ক্ষেত্রে ইহুদিবাদী ইসরায়েলকে মার্কিন প্রশাসনের সার্বিক সহযোগিতা ও সমর্থনদানকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে আরব ও বৃহত্তরভাবে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে অঘোষিত যুদ্ধ বলে মনে করে। তারা সৌদি আরবসহ মুসলিম বিশ্বে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদও চেয়েছিল। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কারণে আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেন ও আয়মান আল জাওয়াহিরিরা তাদের উৎখাত করতে পারছিলেন না। তাঁরা ইরাক ও আফগানিস্তানে চেয়েছেন মার্কিন বাহিনীর চূড়ান্ত পরাজয়, দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধে মার্কিন অর্থনীতির শোচনীয় বিপর্যয় ও সেনাবাহিনীর নতজানু অবস্থা। পশ্চিমা প্রগতিশীল লেখক ও চিন্তাবিদদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র আল-কায়েদা নেতা ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করতে সমর্থ হলেও পরাজিত করতে পারেনি। বিজয় সূচিত হয়েছে বিন লাদেনেরই। কারণ আন্তর্জাতিকভাবে বিন লাদেন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে যেতে চেয়েছিলেন বলে খ্যাতিসম্পন্ন অনেক লেখক-সাংবাদিকই মত প্রকাশ করেছেন।
মাইকেল শেওয়্যার ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর ওসামা বিন লাদেনকে খুঁজে বের করা সংক্রান্ত ইউনিটের প্রধান। তিনি দীর্ঘদিন সিআইএর সঙ্গে যুক্ত থেকে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগ করেছেন। সম্প্রতি তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ১৯৯৫ সালের দিকেই ওসামা বিন লাদেনকে ধরা সম্ভব ছিল। কিন্তু তখন যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন তাতে অতটা উৎসাহ দেখায়নি। তারপর ১৯৯৬ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত ওসামা অত্যন্ত কর্মতৎপর ছিলেন। প্রথমদিকে তাঁকে বিভিন্ন কৌশলে আটকানো গেলে হয়তো নাইন-ইলেভেনের দুর্ঘটনা এড়ানো যেত। তিনি বলেন, সাবেক প্রেসিডেন্ট ক্লিনটনের কাছে বিন লাদেন সম্পর্কে সুনিশ্চিত তথ্য দেওয়া সত্ত্বেও তিনি কোনো ব্যবস্থা নেননি। প্রেসিডেন্ট ক্লিনটন বিন লাদেনের ব্যাপারে কোনো দায়িত্ব নিতে রাজি হননি। এসব ঘটনাপ্রবাহে শেষ পর্যন্ত মাইকেল শেওয়্যার সিআইএ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। পদত্যাগের পর তিনি সিআইএ ও প্রশাসনের ব্যর্থতা নিয়ে অনেক কথা বলেছেন বলে উল্লেখ করেন।
ক্ষমতায় এসে বর্তমান পরিবর্তিত বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা সম্পর্কে প্রথম প্রথম প্রেসিডেন্ট ওবামা গুরুত্বপূর্ণ অনেক বক্তব্য দিয়েছিলেন। অতীতের সব অপকর্ম ধুয়ে-মুছে বর্তমান গণতান্ত্রিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রকে নতুনভাবে 'রোল মডেল' হিসেবে দাঁড় করাতে চেয়েছিলেন ওবামা। কায়রো সফরকালে আল আজহার বিশ্ববিদ্যালয়ে আয়োজিত এক সভায় তিনি বলেছিলেন, যথাশিগগির দুই স্বাধীন রাষ্ট্রের ভিত্তিতে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন সমস্যার সমাধান করা হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র কখনোই মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যাবে না। তা ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতিতে তিনি ব্যাপক পরিবর্তন আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি ইরাক ও আফগানিস্তান থেকে পর্যায়ক্রমে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ঘোষণাও দিয়েছিলেন। কিন্তু পরে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন এবং ওয়াশিংটনে মার্কিন ইহুদি লবির শক্তিশালী চাপের মুখে ওবামা তাঁর অবস্থান থেকে ক্রমেই সরে আসেন। তা ছাড়া তিনি এমনকি গুয়ানতানামো বেতে বেআইনিভাবে আটক রাখা বন্দিদের মুক্তি এবং তাঁদের ওপর অন্যায়ভাবে চালানো নির্যাতন বন্ধ করার ঘোষিত সিদ্ধান্ত থেকেও সরে যান। আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের পরিবর্তে তিনি আরো ৩০ হাজার নতুন সেনা পাঠান। ইরাকে পূর্বঘোষিত সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে লক্ষাধিক সেনা আপাতত অনির্দিষ্টকালের জন্য রেখে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তা ছাড়া ইসরায়েলের দখল করা পূর্ব জেরুজালেমসহ ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইহুদিবাদী প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর একের পর এক অবৈধ বসতি স্থাপনের সিদ্ধান্ত মেনে নিয়েছিলেন, অথচ এই ওবামাই ফিলিস্তিনের ১৯৬৭ সালের যুদ্ধ-পূর্ববর্তী সীমানাকে বৈধ বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। দ্বিতীয়বারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার জন্য ওবামা বর্তমানে যে অবস্থান নিয়েছেন, তাতে তিনি কতটা সফল হবেন তা এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। তার কারণ, সব ক্ষেত্রে বারাক ওবামার ব্যর্থতা। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার আগে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্ববাসীকে তিনি যে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, তা এখন সম্পূর্ণভাবেই উবে গেছে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। বেকারত্বের হার নিকট-অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। একদিকে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যেমন তাঁর পক্ষে অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছে, অন্যদিকে শিল্পায়ন ও বাণিজ্যের অগ্রগতিও আরো স্তিমিত হয়ে পড়ছে। এমন অনেক কিছুর জন্যই ওবামাসহ অনেকে যদিও সাবেক যুদ্ধবাজ প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ ও তাঁর পরামর্শদাতা ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনিকে দায়ী করেন, তাতেও বর্তমান প্রেসিডেন্ট হিসেবে ওবামার দায়িত্ব ফুরিয়ে যায় না। এভাবে যুক্তরাষ্ট্র রাজনৈতিক, কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক_কোনো ক্ষেত্রেই তার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে পারবে না বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের ধারণা। এ অবস্থায় বারবার তার সাম্রাজ্যবাদী ও হঠকারী ভূমিকাই আরো পরিষ্কার হয়ে উঠবে পরিবর্তনশীল ও শান্তিকামী বিশ্ববাসীর কাছে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বব্যাপী এখন স্পষ্টতই পরিবর্তনের জোয়ার বইতে শুরু করেছে। উন্নত প্রযুক্তি ও মুক্ত চিন্তাচেতনার যুগে শক্তি কিংবা আধিপত্যের জোরে আর কাউকে দাবিয়ে রাখা যাবে না_এ কথাই এখন বারবার প্রমাণিত হচ্ছে। সুতরাং যে যে কারণে নাইন-ইলেভেনের মতো দুর্ঘটনা ঘটেছে এবং মৃত্যু ঘটেছে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষের, তার প্রকৃত কারণগুলো নির্ণয় না করে ঘটা করে তার এক দশক পূর্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠান পালন করার মধ্যে কোনো সার্থকতা নেই। নেই ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার মধ্যেও। কারণ অন্যায় শোষণ-শাসন, আধিপত্যবাদ ও দখলদারির বিরুদ্ধে কিংবা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে অনেক বিন লাদেনেরই অভ্যুদয় ঘটবে বিভিন্ন সময়ে। তারা ধ্বংসাত্মক কর্মকাণ্ড ঘটাবে, যাতে প্রাণ হারাবে শান্তিকামী নিরপরাধ অনেক মানুষ। সে ঘটনার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে আরো অনেক প্রাণ বলিদানের মধ্যে তেমন কোনো সার্থকতা নেই। যুক্তরাষ্ট্র কিংবা পশ্চিমা শক্তির ক্ষেত্রে বর্তমানে তা-ই ঘটছে। আফগানিস্তানের বর্তমান ঘটনাবলি তারই সাক্ষ্য বহন করে।
লেখক : বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক
gayiulkhan@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.