সাক্ষরতা : যেতে হবে অনেক দূর by মাহফুজুর রহমান মানিক

বিশ্বব্যাপী সাক্ষরতা দিবস পালনের গোড়ায় রয়েছে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান এবং সংস্কৃতি বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কো। ইউনেস্কোর ওয়েবসাইট খুললেই নজরে পড়বে_ Building peace in the minds of men and women নারী এবং পুরুষ নির্বিশেষে সবার মাঝে শান্তি প্রতিষ্ঠা।
আর এ শান্তিকে প্রাধান্য দিয়েই এবারে সাক্ষরতা দিবসের স্লোগান হলো_ খরঃবৎধপু ভড়ৎ ঢ়বধপব, শান্তির জন্য সাক্ষরতা। ইউনেস্কোর তথ্যমতে, বিশ্বব্যাপী ৭৯৩ মিলিয়ন অর্থাৎ প্রায় ৮০ কোটি বয়স্ক মানুষ নিরক্ষর, সে হিসাবে প্রতি ছয়জনে একজন নিরক্ষর। ইউনেস্কো দেখাচ্ছে, এখনও ৭ কোটি শিশু স্কুলেই যায় না আর ড্রপ আউট কিংবা শ্রেণীকক্ষে অনিয়মিত তো আছেই।
আমাদের চিত্রটা দেখার আগে সাক্ষরতার বিষয়ে আসি। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিসরে সাক্ষরতা শব্দের প্রথম উল্লেখ দেখা যায় ১৯০১ সালে লোকগণনার অফিসিয়াল ডকুমেন্টে। শুরুতে স্ব অক্ষরের সঙ্গে অর্থাৎ নিজের নাম লিখতে যে কয়টি বর্ণমালা প্রয়োজন তা জানলেই তাকে সাক্ষর বলা হতো। ১৯৪০-এর দিকে পড়ালেখার দক্ষতাকে সাক্ষরতা বলে অভিহিত করা হতো।
ষাটের দশকে পড়া ও লেখার দক্ষতার সঙ্গে সঙ্গে সহজ হিসাব-নিকাশের যোগ্যতাসম্পন্ন মানুষ সাক্ষর মানুষ হিসেবে পরিগণিত হতো। আশির দশকে লেখাপড়া ও হিসাব-নিকাশের পাশাপাশি সচেতনতা ও দৃশ্যমান বস্তুসামগ্রী পঠনের ক্ষমতা সাক্ষরতার দক্ষতা হিসেবে স্বীকৃত হয়।
বর্তমানে এ সাক্ষরতার সঙ্গে যোগাযোগের দক্ষতা, ক্ষমতায়নের দক্ষতা, জীবন নির্বাহী দক্ষতা, প্রতিরক্ষায় দক্ষতা এবং সাংগঠনিক দক্ষতাও সংযোজিত হয়েছে।
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার নির্ণয়ে সর্বশেষ জরিপ হয়েছে ২০০৮-এর ডিসেম্বরে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং ইউনেস্কোর যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত 'লিটারেসি অ্যাসেসমেন্ট সার্ভে' জরিপে সাক্ষরতার হার দেখানো হয়েছে ৪৮.৮ ভাগ। উইকিপিডিয়ায় এখনও দেওয়া আছে ৪৭.৫০ ভাগ। অবশ্য আমাদের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় বলছে, সাক্ষরতার হার ৫৩ ভাগ।
এ বছর সাক্ষরতা দিবস বাংলাদেশের জন্য নানা কারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। এটা বাংলাদেশে সাক্ষরতা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারি প্রতিষ্ঠান 'ব্যুরো অব ননফরমাল এডুকেশন বা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো' যেমন বলছে, বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের ইশতেহার, জাতীয় শিক্ষানীতিসহ এবারে সাক্ষরতা দিবসের প্রাক্কালে এ সংক্রান্ত পোস্টারিংয়েও সবাই দেখেছে।
সাক্ষরতা দিবসের গুরুত্বের আরেকটা কারণ হলো, ইউনেস্কোর ই-৯ ইনিশিয়েটিভ নামে একটি ফোরামের সদস্য বাংলাদেশ, যেখানে চীন, ইন্ডিয়া, ইন্দোনেশিয়া, মিসরসহ আরও নয়টি দেশ রয়েছে, যারা পৃথিবীর ষাট ভাগ জনসংখ্যার অধিকারী দেশ। ঊফঁপধঃরড়হ ভড়ৎ অষষ বা সবার জন্য শিক্ষা নিশ্চিত করতে এ দেশগুলোর বিরাট ভূমিকা রয়েছে।
সেদিক থেকে বালাদেশ অনেক পিছিয়ে। আর বাংলাদেশের দায়িত্বও অনেক। ২০১৪ সালের মধ্যে শতভাগ সাক্ষরতা, আমাদের হাতে যদি তিন বছরও ধরি। এখনও ৪৭ ভাগ মানুষ নিরক্ষর। এ নিরক্ষর হারকে তিন বছরে সাক্ষর করা কতটা সম্ভব। পেছনে ফেরা যাক। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় সাক্ষরতার হার ছিল ১৬.৮ ভাগ। স্বাধীনতার পরই সাক্ষরতার হার বাড়ানোর জন্য সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। ১৯৯১ সালে অবস্থার পরিবর্তন হয়ে দাঁড়ায় ৩৫.৩ ভাগ। বিশ বছরে সাক্ষরতার হার বাড়ে ১৮.৫ ভাগ। বর্তমান ৫৩ ভাগ সাক্ষরতা ধরলে ৪০ বছরে বেড়েছে ৩৬.২ ভাগ। ৪০ বছরে যেখানে ৩৬ ভাগ বেড়েছে, সেখানে তিন বছরে ৪৭ ভাগ অর্জন কতটা সহজ হবে।
নিরক্ষরতা দূরীকরণে দুটি বড় প্রকল্প শুরু হওয়ার কথা। মৌলিক সাক্ষরতা ও অব্যাহত শিক্ষা নামে দুটি প্রকল্পের ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প এক হলো ৬১টি জেলার মানুষকে সাক্ষরকরণ, যার ব্যয় দুই হাজার কোটি টাকা। আর অন্যটি শুধু পার্বত্য তিনটি জেলার জন্য, ব্যয় ৫০ কোটিরও কিছু বেশি। সে প্রকল্পের কোনো কাজ শুরু হয়েছে বলে আমরা দেখিনি।
সাক্ষরতা অর্জনের সহায়ক হলো উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে আনুষ্ঠানিক শিক্ষার প্রাথমিক স্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অর্থাৎ মৌলিক শিক্ষা নিশ্চিত হলেও সাক্ষরতার হার স্বাভাবিকভাবেই বাড়ে। প্রশাসনিকভাবে দেখানো হয়, আমাদের ৯৮ ভাগের ওপর শিশু স্কুলে ভর্তি হয়। এটা অবশ্য সন্তোষজনক। কিন্তু আমাদের ঝরে পড়ার হার এখনও কমেনি।
পঞ্চম শ্রেণী থেকেই প্রায় অর্ধেক শিশু ঝরে পড়ে। এ হারটা খুবই বেদনার। এটা না কমাতে পারলে যেমন একদিকে সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত হবে না, তেমনি শতভাগ সাক্ষরতাও সম্ভব নয়।
সম্প্রতি প্রাথমিক শিক্ষায় সর্বকালের রেকর্ড ২৩ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প শুরু হতে যাচ্ছে। এ প্রকল্প ভালোভাবে বাস্তবায়ন হলে একদিকে যেমন প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়ন ঘটবে, অন্যদিকে এটা সাক্ষরতা অর্জনেও বড় ভূমিকা পালন করবে।
mahfuz.manik@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.