কৃষি-আরও স্থিতিশীল পাটের বাজার by রাজীব কামাল শ্রাবণ

পাটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এ ছাড়াও দেশের পাটকলগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পাটকলগুলো যাতে উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে তার জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে।


সর্বোপরি পাটের বাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে প্রস্তাবিত খসড়া পাটনীতির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রয়োজন আমাদের দেশের 'সোনালি আঁশ' পাট এত দিন বিস্মৃতির আড়ালে হারিয়ে যাচ্ছিল। দেশের এক সময়ের প্রধান অর্থকরী এই ফসলের চাষ করে কৃষক বাজারে বিক্রি করতে না পেরে হাহাকার করেছে, রাগে-দুঃখে পাটে আগুন জ্বালিয়ে পুড়িয়ে শূন্য হাতে বাড়ি ফিরেছে। আবার কেউ কেউ মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতে না পারায় পাটের ফাঁসকে গলার ফাঁস বানিয়ে পৃথিবীর যন্ত্রণা থেকে মুক্তির চেষ্টা করেছে। প্রায় গত দশকজুড়েই আমাদের দেশের পাটচাষিদের এটা ছিল নিয়মিত চিত্র। ফলে তারা দিন দিন পাট চাষে উৎসাহ হারিয়ে ফেলেন।
বিশ্বমন্দার প্রভাব কাটিয়ে উঠে বাংলাদেশ গত তিন বছর যাবৎই রফতানি খাতে আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে সবচেয়ে আশার খবর এই যে, দেশের এই প্রবৃদ্ধির ধারা সমুন্নত রাখতে হারিয়ে যাওয়া পাটের অবদান চোখে পড়ার মতো। হতাশার সব ইতিহাস পেছনে ফেলে বর্তমানে পাট আবার দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। দেশের অর্থনীতির জন্য এটা সত্যিই খুব আশাব্যঞ্জক ঘটনা। গত অর্থবছরের (২০১০-১১) প্রথম দশ মাসে (জুলাই-এপ্রিল) এ খাত থেকে রফতানি আয় হয়েছে ৯২ কোটি ৪৭ লাখ মার্কিন ডলার, যা পূর্ববর্তী অর্থবছরের (২০০৯-১০) একই সময়ের চেয়ে ৪২ দশমিক ২০ শতাংশ বেশি। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এর পরিমাণ ছিল ৬৫ কোটি ৩ লাখ ডলার। আর আন্তর্জাতিক বাজারে পাটের রফতানি বৃদ্ধির কারণে স্বভাবতই দেশের বাজারেও পাটের দাম বাড়ছে ব্যাপক হারে। গত এক বছরে স্থানীয় বাজারে ২৭৪ কোটি টাকার পাট পণ্য বিক্রি হয়েছে। পরিসংখ্যানে দেখা যায়, এই বিক্রির হার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ১৭৬ শতাংশ বেশি। তবে খুশির খবর, সরকারি মালিকানাধীন বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) ২৯ বছর পর লাভের মুখ দেখতে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটি সর্বশেষ লাভ করতে পেরেছিল ১৯৮২ সালে। এ ছাড়াও দেশে সরকারি-বেসরকারি সব মিলিয়ে ছোট-বড় ২০৩টি পাটকল রয়েছে। ক্ষতি কাটিয়ে উঠে প্রায় সব পাট কলগুলোই বর্তমানে মুনাফা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।
দেশের পাট বাজারের এই পুনর্জন্মের পেছনে কিছু কারণ রয়েছে। সবচেয়ে বড় যে বিষয় তা হচ্ছে সচেতনতা বৃদ্ধি। বিশ্বব্যাপী সিনথেটিক, প্লাস্টিক বা পলিথিন জাতীয় অপচনশীল দ্রব্যের দূষণের বিরুদ্ধে ব্যাপক জনমত গড়ে উঠেছে। জলবায়ুর পরিবর্তনের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে নিজেদের মুক্ত রাখতে মানুষ এখন সিনথেটিক তন্তু ব্যবহারের পরিবর্তে পাটের মতো প্রাকৃতিক পরিবেশবান্ধব তন্তু ব্যবহারের ব্যাপারে বেশি আগ্রহী। এতে করে মাটি, পানি ও বায়ুদূষণ এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো অনেকখানি সম্ভব। ফলে দিন দিন বিশ্ববাজারে কাঁচাপাট এবং পাটের তৈরি সুতা, ব্যাগ, চট ইত্যাদিসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ও শৌখিন বস্তুর চাহিদা বৃদ্ধি পাচ্ছে। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচাপাট এবং পাটজাতদ্রব্যের দাম আগের তুলনায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। শুধু বৈদেশিক বাজারেই নয়, অভ্যন্তরীণ বাজারেও পাটের বহুমুখী ব্যবহার দিন দিন বেড়েই চলছে। ফলে বাড়ছে পাটের চাহিদা ও দাম। তাই কৃষক এখন পাট চাষ করে ন্যায্যমূল্য পাওয়ার স্বপ্ন দেখছে। বাজারে ভালো দাম পেয়ে তারা অধিক জমিতে পাট চাষ করছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী অনুকূল পরিবেশ ও বাজারের কারণে গত বছরের তুলনায় এ বছর ৬০ হাজার হেক্টর অতিরিক্ত জমিতে পাট চাষ করা হচ্ছে।
পাটের এই ঊর্ধ্বমুখী বাজার ধরে রাখতে হলে সরকারকে বর্তমান সময়ের চেয়ে অনেক বেশি তৎপর হতে হবে। যদিও বর্তমান সরকার এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিকতার পরিচয় দিচ্ছে। উৎপাদন বাড়াতে হলে পাট বপনের মৌসুমে কৃষকরা যাতে বীজ সংকটে না ভোগেন সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। উন্নত ভালো মানের পাটবীজ সরবরাহ করতে হবে। পাট কাটার পর কৃষকরা যাতে ন্যায্যমূল্যে তা বাজারে বিক্রি করতে পারেন, সেটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নতুবা পাটচাষিরা হতাশ হয়ে পড়বেন। পাটকলগুলো সময়মতো পাট কিনতে না পারলে বাজারে তা অবিক্রীত রয়ে যায়। ফলে পাটের দাম পড়ে যায়। মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায়। তাই পটকলগুলো যাতে সময়মতো কাঁচামাল কিনতে পারে এর জন্য সরকারের সব ধরনের সহযোগিতা বাড়াতে হবে। ২০১০ সালে সরকার কাঁচাপাট রফতানির ওপর যে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তা সীমিত সময়ের জন্য শিথিল করেছে। পাট রফতানি আরও বাড়াতে হলে এই নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি তুলে নেওয়া উচিত। এতে হয়তো দেশি পাটকলগুলো সাময়িকভাবে কাঁচামাল সংকটে ভুগতে পারে। তবে সঠিক সময়ে পাট কিনলে তদুপরি পাটের উৎপাদন বৃদ্ধি করলে এই সমস্যা দ্রুত কাটিয়ে ওঠা সম্ভব। বাজারের ঊর্ধ্বমুখিতা ধরে রাখার ভালো উপায় হচ্ছে পাটের বহুমুখী ব্যবহার বাড়ানো।
নিত্যপ্রয়োজনীয় ও শৌখিন বিভিন্ন দ্রব্য পাটের দ্বারা তৈরি সম্ভব। এর জন্য প্রয়োজন গবেষণা বাড়ানো এবং দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা। এ ব্যাপারে সরকারের একটি সাহসী উদ্যোগ হচ্ছে 'বাধ্যতামূলক পাট প্যাকেজিং আইন-২০১০'। এখানে বলা হয়েছে, সব ধরনের প্যাকেজিং বিশেষ করে খাবার এবং কৃষিপণ্য অবশ্যই পাটের তৈরি মোড়কজাত হতে হবে। এই আইনের সঠিক বাস্তবায়ন করতে পারলে পলিথিন, প্লাস্টিক অথবা সিনথেটিক জাতীয় তন্তুর বদলে পাটের ব্যবহার বহুলাংশে বেড়ে যাবে। মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও পরিবেশদূষণ কমে যাবে। পাটের চাহিদা ব্যাপকভাবে বাড়বে। এ ছাড়াও দেশের পাটকলগুলোতে সীমাহীন দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পাটকলগুলো যাতে উৎপাদন ক্ষমতা অনুযায়ী উৎপাদন করতে পারে তার জন্য পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে হবে। সর্বোপরি পাটের বাজারকে আরও স্থিতিশীল করতে প্রস্তাবিত খসড়া পাটনীতির চূড়ান্ত বাস্তবায়ন প্রয়োজন। তাহলে 'সোনালি অঁাঁশ' পাট আবার সোনার দ্যুতি ছড়াবে।

রাজীব কামাল শ্রাবণ :শিক্ষার্থী,এগ্রিবিজনেস ম্যানেজমেন্ট অনুষদ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় srabon 2483@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.