স্যামুয়েলস ও ব্রাভোর ধৈর্যে উইন্ডিজের দিন-(দ্বিতীয় দিন শেষে)-বাংলাদেশ : প্রথম ইনিংস ৯১.১ ওভারে ৩৮৭ ওয়েস্ট ইন্ডিজ : প্রথম ইনিংস ৮২ ওভারে ২৪১/২ by মাসুদ পারভেজ

নিজেদের ভুলের দণ্ড দিয়েছিলেন নাফীস-তামিমরা। দিলেন গেইল-পাওয়েলরাও। খুলনা টেস্টের প্রথম দুই দিনের শুরুর সেশন বিবেচ্য হলে দুই দল তাই কাছাকাছিই থাকবে। ২৬ ওভারে ৩ উইকেটে ৮৮ রান তুলে প্রথম দিনের মধ্যাহ্ন বিরতিতে গিয়েছিল বাংলাদেশ।
একই সময়ে কাল ওয়েস্ট ইন্ডিজের অবস্থা ২১ ওভারে ২ উইকেটে ৬২। দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংয়ে দুই দলের প্রায় এক সমতায় থাকাটা অবশ্য ওই পর্যন্তই।
দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ে এরপর প্রতিপক্ষের শীর্ষ সারির ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ব্যবধান ক্রমেই বাড়িয়ে নিয়েছেন মারলন স্যামুয়েলস ও ড্যারেন ব্রাভো। তাও আবার শেখ আবু নাসের স্টেডিয়ামের উইকেটটা এমন যে সেটা না পেস বোলারদের, না স্পিনারদের। যেখানে ব্যাটসম্যান ভুল না করলে কিংবা নিজের উইকেট বিলিয়ে দিয়ে না এলে বোলারদের প্রাপ্তির খাতায় কিছু যোগ হওয়ার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে। তো সেখানে কোনো রকম হুড়োহুড়িতে না গিয়ে স্যামুয়েলস আর ব্রাভো মিলে সেই ব্যাটিংটাই করতে থাকলেন, যেটা টেস্ট ক্রিকেটের দাবি। তাঁরা চললেন 'ধীরে চলো' নীতিতে। আর ব্যাটের ভাষায় বাংলাদেশের বোলারদের যেন এটাও বলতে চাইলেন, 'পারলে ঠেকা'।
সারা দিনেই আর তাঁদের ঠেকানো যায়নি। পরের দুই সেশনে তাই বাংলাদেশের বোলাররা একেবারেই সাফল্যহীন। ওই দুজন যেন চললেন খুলনা শহরের জনপ্রিয়তম বাহন ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের গতিতেই! যে জন্য দিন শেষে ৮২ ওভারে ক্যারিবীয়দের সংগ্রহ ২৪১! অর্থাৎ ওভারপ্রতি তিন রানেরও কম। অথচ প্রতিষ্ঠিত ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় ভরপুর প্রথম দিনের শেষ সেশনে বাংলাদেশই যেখানে তুলেছিল ৩০ ওভারে ১৭৯ রান, সেখানে কাল মধ্যাহ্ন আর চা বিরতির মাঝের ৩০ ওভারে স্যামুয়েলস-ব্রাভো তুলেছেন মাত্র ৮৪ রান! এমন ব্যাটিং যে ক্যারিবীয়দের কাছে কতটা আরাধ্য ছিল, সেটা সন্ধ্যায় অধিনায়ক ড্যারেন সামির কথায় ধরা পড়ল। যা বললেন, এর অর্থটা এ রকমই দাঁড়ায়, 'আরে ভাই, তিনটা দিন তো এখনো বাকি। এত তাড়াহুড়োর কী আছে! এটাই টেস্ট ক্রিকেট। আপনাকে এখানে ধৈর্যের পরীক্ষাও দিতে হবে।'
মারকুটে ব্যাটসম্যান হিসেবেই পরিচিত স্যামুয়েলসও তাই এখানে সে পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে নিজের পঞ্চম টেস্ট সেঞ্চুরিটা করে ফেলেন। ফিফটিতে পৌঁছাতে খেলেন ১০৭ বল। সেখান থেকে সেঞ্চুরিতে পৌঁছাতে গিয়ে আরো সাবধানী। এবার খেলেন আরো ১২০ বল। ২২৭ বলে তিন অঙ্কের ম্যাজিক ফিগারে পৌঁছানো স্যামুয়েলসের (১০৯*) সঙ্গী ব্রাভোও তো ধৈর্যের পরীক্ষায় পিছিয়ে নন, যাঁর চলন-বলন আর ব্যাটিংয়ের ধরনে ব্রায়ান লারার ছায়া খুঁজে পান ক্রিকেটানুরাগীরা। সেই তিনিও চতুর্থ টেস্ট সেঞ্চুরির অপেক্ষায়। গত বছর বাংলাদেশ সফরের ঢাকা টেস্টে মাত্র ৫ রানের জন্য ডাবল সেঞ্চুরির নাগাল না পাওয়া এ ত্রিনিদাদিয়ান তরুণ এবার ঢাকায় দ্বিতীয় ইনিংসে করে এসেছেন ৭৬। আর কাল খুলনায় ৮৫ রান নিয়ে দিন শেষ করার সময় স্যামুয়েলসের মতোই উইকেটে পার করে দিয়েছেন প্রায় পাঁচ ঘণ্টা।
আজ তাঁদের দুজনের কাছ থেকে ক্যারিবীয় দলের আরো বড় কিছুর প্রত্যাশাই থাকবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রথম ইনিংস অপ্রত্যাশিত আকার নেওয়ার পর। শীর্ষ ব্যাটসম্যানদের ব্যর্থতায় ১৯৩ রানে ৮ উইকেট হারিয়ে ফেলা দলের ১০ নম্বর ব্যাটসম্যান আবুল হাসানের বীরত্বসূচক সেঞ্চুরি আর মাহমুদ উল্লাহর অভিজ্ঞতায় আগের দিনই নিজেদের টেস্ট ইতিহাসে একদিনে সবচেয়ে বেশি রান দেখে ফেলেছিল বাংলাদেশ। কাল সেখান থেকে আর খুব বেশি দূর এগোনো যায়নি। ৩১ বলে ২২ রান যোগ করেই শেষ দুটো উইকেট খোয়ান তাঁরা। মাহমুদ উল্লাহর (৭৬) সেঞ্চুরির স্বপ্ন অপূর্ণ রেখে তাঁকে ফিরতি ক্যাচে ফেরান সামি। আর প্রথম দিনে শর্ট বলে বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের যথেষ্ট ভুগিয়ে আসা ফিডেল এডওয়ার্ডস একই অস্ত্রে থামান আবুল হাসানকেও (১১৩)। তাঁর শর্ট বলে হাসানের গ্লাভস ছুঁয়ে বল স্লিপে খুঁজে নেয় সামির হাত। সেই সঙ্গে ৩৮৭ রানে শেষ হয় বাংলাদেশও। টেস্ট ক্রিকেটে ১০ নম্বর ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংসের রেকর্ডটা তাই আর হলো না অল্পের জন্য। তবে অভিষেকে ১০ নম্বর ব্যাটসম্যানের সর্বোচ্চ ইনিংসের (এর আগে সর্বোচ্চ ১০৪ রান করেছিলেন অস্ট্রেলিয়ার রেজি ডাফ) রেকর্ডটা ততক্ষণে ঠিকই হয়ে গেছে।
আগের দিনের পাঁচটি যোগ হয়ে ৯০ রানে শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেট নেওয়া এডওয়ার্ডস অবশ্য বাংলাদেশের ইনিংস শেষ হওয়ার পরও ছিলেন! একটু খুলে বলা ভালো। আসলে বাংলাদেশের রুবেল হোসেন তাঁর ফর্মুলাই বেছে নিয়েছিলেন। সেটি বাউন্সারে প্রতিপক্ষের ব্যাটসম্যানদের ভড়কে দেওয়ার। ক্রিস গেইলকে তাতে অপ্রস্তুত করতে না পারলেও পেরেছেন ঢাকা টেস্টে জোড়া সেঞ্চুরি করে আসা কাইরন পাওয়েলকে (১৩)। বাউন্সারে ডাক করতে গিয়ে হেলমেটের পেছনে লেগে চোট পাওয়া পাওয়েল পড়েই গিয়েছিলেন। শুশ্রূষার পর উঠে দাঁড়িয়েই আরো দুটো শর্ট বলে ব্যতিব্যস্ত এ ব্যাটসম্যান খেই হারান আর এক বল পরই। এবার হাঁকিয়ে বসার ভুলে ডিপ স্কয়ার লেগে সাকিব আল হাসানের দারুণ এক ক্যাচ হন। তখন রুবেলের আগুনে বোলিংয়ে টেস্ট ক্রিকেটের সৌন্দর্যও বিকিরিত হচ্ছিল যেন। তবে বাংলাদেশের গেইল দুশ্চিন্তা তখনো যায়নি। লেগস্টাম্পের বাইরে দিয়ে বেরিয়ে যেতে থাকা বলে তিনি একবার স্যুইপ খেলতে যাওয়াতেই বোধ হয় আবার এ রকম ডেলিভারি দেওয়ার চিন্তা মাথায় এলো সোহাগ গাজীর। ঢাকার পর এখানে বোলিং ওপেন করা এ অফস্পিনার আবারও একই রকম ডেলিভারিতে লোভে ফেলতে পারলেন গেইলকে (২৫)। স্যুইপ করতে গেলেন; কিন্তু ব্যাটের ভেতরের কানায় লেগে উইকেটের পেছনে ক্যাচ।
ওই পর্যন্তই। এরপর স্যামুয়েলস আর ব্রাভোয় বাংলাদেশের ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং শিক্ষার দীর্ঘ অধ্যায়!

No comments

Powered by Blogger.