সপ্তাহের হালচাল-আওয়ামী লীগের সম্ভাবনার তিন শর্ত by আব্দুল কাইয়ুম

এমনকি আওয়ামী লীগের অনেক নেতা-কর্মী মিটিমিটি হাসেন। তাঁদের ধারণা, দলের উৎসাহ-উদ্দীপনা ধরে রাখার জন্যই মূলত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আগামী নির্বাচনে পৌনে দুই শ আসনে জয়লাভের সম্ভাবনার কথা বলেছেন। এটা হতেই পারে।


কিন্তু যেভাবে তিনি ৩০ আর ৩০ আসনের হিসাব যোগ-বিয়োগ করে ফলাফল বিশ্বাসযোগ্য করার চেষ্টা করেছেন, তার সবটা বৃথা যায়নি। দলের মধ্যে এবং জনসাধারণের একাংশের মধ্যেও একটা মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে হিসাব মেলাতে খাতা-কলম নিয়ে বসে গেছেন। নির্বাচনের আগে, সামনের দেড় বছরে সরকারের জনপ্রিয়তা আরও কমবে, না বাড়বে? নাকি এখন যেমন আছে, তেমনই থাকবে? এখনই যদি ৬০ আসন বাদ যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে নির্বাচনের পূর্বক্ষণে আরও তিন গুণ আসন পরাজয়ের তালিকায় চলে যেতে পারে কি না?
এসব গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর নির্ভর করে অন্তত তিনটি শর্তের ওপর। প্রথম ও প্রধান শর্তটি হলো পদ্মা সেতু। সরকার এটা শুরু করতে পারবে কি না? শেষ করা তো দূরের কথা, আগে শুরু হোক তো। কেউ হয়তো ভাবছেন, পদ্মা সেতুর সঙ্গে সরকারের জনপ্রিয়তার এমন কী ঘনিষ্ঠ যোগ আছে যে আগামী নির্বাচনে এর ছায়া পড়বে? আসলে পদ্মা সেতুর সঙ্গে বিশ্বব্যাংকের মন গলানোর একটা বিষয় জড়িয়ে আছে। যদি বিশ্বব্যাংকের অনুকূল সাড়া পাওয়া যায়, তাহলে দেশের বিদেশি মুদ্রার ভান্ডারে প্রাণ সঞ্চার হবে। অর্থনীতি কয়েক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ পাবে। পদ্মার এপার-ওপারে যাতায়াত ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি এবং তার ফলে মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিরাট সম্ভাবনা তো আছেই।
সরকার যতই মালয়েশিয়া, চীন, কাতারের কথা বলুক না কেন, যদি শেষ পর্যন্ত বিকল্প পথে যেতেই হয়, তার মানে দাঁড়াবে বিশ্বব্যাংকের সঙ্গে দূরত্ব সৃষ্টি। এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাংকের বিরাগভাজন হলে দাতাদের অনেকেই হাত গুটিয়ে নেবে, কারণ বিশ্বব্যাংক তাদের জন্য দিকনির্দেশক রাডার হিসেবে কাজ করে। বিভিন্ন দাতা দেশ বা সংস্থা যদি দেখে, পদ্মা সেতুতে দুর্নীতির অভিযোগের ব্যাপারে বাংলাদেশ কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ রেখেছে, তাহলে ওরাও পিছিয়ে যাবে। ইতিমধ্যে এর কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। এডিবি, জাইকা ও অন্যান্য কিছু সংস্থা বিশ্বব্যাংকের দিকে চেয়ে আছে। যদি সেখান থেকে সবুজ সংকেত আসে, তবেই তারা এগিয়ে যাবে।
সম্প্রতি পদ্মা সেতুতে অর্থায়নে বিশ্বব্যাংক পাঁচটি শর্ত দিয়েছে। মনে হয়, বরফ গলতে শুরু করেছে। বাংলাদেশ দু-একটি শর্তের ব্যাপারে আপত্তি জানিয়েছে। আলোচনা চলছে। একটা প্রবাদে বলা হয়, শুভষ্য শীঘ্রম! ভালো কাজ যত তাড়াতাড়ি হয়, ততই মঙ্গল! বিশ্বব্যাংকের কাজই হলো টাকা দেওয়া। ওরা দিতে চায়। আমরা নেব না কেন? আর যেসব শর্ত ওরা দিচ্ছে, তার বেশির ভাগই হলো দুর্নীতি রোধসম্পর্কিত। এ তো আমাদেরই কর্মসূচি। বিশ্বব্যাংকের কথা ছাড়াই তো আমাদের সেটা করা উচিত।
এর আগে আমার লেখায় পদ্মা সেতুতে কালোটাকা ঢালার সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কথা বলেছিলাম। সেটা যদি হয়, তা-ও মন্দের ভালো। কারণ বিশ্বব্যাংক দেখবে, দুর্নীতি হলেও বাংলাদেশ সেই টাকা ঘাড়ে ধরে এনে উৎপাদনশীল কাজে লাগাতে পারে! এটা কম কথা নয়। তখন হয়তো বিশ্বব্যাংকসহ অন্যরা এগিয়ে আসবে। তাদের কাছ থেকে পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রয়োজনীয় বিদেশি মুদ্রার ব্যবস্থার অনুকূল সম্ভাবনা দেখা দিতে পারে। অর্থাৎ, মনে রাখতে হবে, আমরা যা-ই কিছু করি না কেন, বিদেশি মুদ্রার সংস্থান ছাড়া কিছু হবে না। বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকা ও অন্যান্য উন্নয়ন সহযোগী দেশের চেয়ে সুবিধাজনক শর্তে আর কোথাও এ ধরনের প্রকল্প সহযোগিতা পাওয়া কঠিন।
বিশ্বব্যাংক বা তাদের সহযোগী দাতা সংস্থাগুলোর সাহায্য নেওয়ার ব্যাপারে অনেক সমালোচনা করা হয়। তার অনেকটাই সত্য, সন্দেহ নেই। বিশেষত, তাদের সহায়তার টাকা কীভাবে ব্যয় হবে, সে ব্যাপারে অনেক রকম ব্যবস্থাপত্র মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকে। কোনো স্বাধীনচেতা নাগরিকের এমন খবরদারি মেনে চলতে আপত্তি থাকা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু অন্তত দুর্নীতি বন্ধের শর্তটি মেনে নিতে কারও আপত্তি থাকে না। আমরা দুর্নীতির সুযোগ বন্ধে কতটা আন্তরিক, সেটাই বড় কথা। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআই) দুর্নীতির ধারণা সূচকে এখনো বাংলাদেশ গ্রহণযোগ্য মাত্রা ১০-এর মধ্যে ৫ পয়েন্টও পায় না! গত বছর প্রকাশিত তালিকায় বাংলাদেশ পেয়েছিল ২ দশমিক ৭ পয়েন্ট। দেশে দুর্নীতি তো বেশুমার। তাহলে কিসের জোরে আমরা বিশ্বব্যাংকের শর্তের সমালোচনা করব? দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে পারলে, ছিটেফোঁটা দুর্নীতি থাকলেও দু-চারটা পদ্মা সেতু আপনাআপনি হয়ে যাবে।
তা ছাড়া পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংককে আনতে পারলে এক ঢিলে দুই পাখি মারা যাবে। সেতু তো হাতের মুঠোয় পাবই, সে সঙ্গে বিদ্যুতের অসহনীয় সংকট দূর করাও সহজ হবে। এই বিদ্যুৎ হলো দুই নম্বর শর্ত। পদ্মা সেতু শুধু সেতু নয়। এক অর্থে এই সেতু = বিদ্যুৎ। পদ্মা সেতুর কাজ শুরু হলে বিদ্যুতের রাহুর গ্রাসও কাটতে শুরু করবে। বিদেশি মুদ্রায় অর্থায়নের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হচ্ছে না বলে যে দুটি বড় বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্পের কাজ শুরু করা যাচ্ছে না, সেই অচলাবস্থার অবসানের মূল শর্ত সৃষ্টি হতে পারে পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়ন ঘটলে। সাদা চোখে দেখা না গেলেও এ দুই ঘটনার মধ্যে একটি যোগসূত্র রয়েছে। দাতাগোষ্ঠীর প্রতিশ্রুতি অনেকাংশে বিশ্বব্যাংকের ইতিবাচক মনোভাবের ওপর নির্ভরশীল। আলোচ্য দুটি বড় বিদ্যুৎ প্রকল্পে বিশ্বব্যাংক ২০ কোটি ডলারের জামানত (পারশিয়াল রিস্ক গ্যারান্টি) দিতে চেয়েছিল। কিন্তু পদ্মা সেতুতে গন্ডগোল লাগায় তারা পিছিয়ে গেছে। দুর্নীতির অভিযোগে পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন যদি বিশ্বব্যাংকই বন্ধ রাখে, গ্যারান্টি না দেয়, তাহলে অন্য দাতারা কোন ভরসায় বিদ্যুৎ বা গুরুত্বপূর্ণ কোনো প্রকল্পে অর্থায়ন করবে? তাই পদ্মা সেতুতে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নের তাৎপর্য পদ্মার দুই তীর ছাপিয়ে বহুদূর বিস্তৃত। বিশ্বব্যাংক পদ্মা সেতুতে গেলে বিদ্যুতের মতো বড় বড় প্রকল্পের জন্য অর্থায়নে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দাতাগোষ্ঠীর রাডারে সবুজ সংকেত আসবে। এর ফলে বিদেশি ঋণপ্রবাহে জোয়ার সৃষ্টি হতে পারে।
তৃতীয় শর্তটি হলো সুশাসন। ক্রসফায়ার, গুম, অপহরণ, নিখোঁজ, সাংবাদিক সাগর-রুনির নৃশংস হত্যা, তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকনেতা আমিনুলকে গুম করে খুন, ইলিয়াস আলীর নিখোঁজ হয়ে যাওয়া—এ রকম অনেক ঘটনা আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা অন্ধকারে ঢেকে দিচ্ছে। এসব দুঃসংবাদের প্রতিটি ঘটনা ধরে বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত ও প্রকৃত আসামিদের চিহ্নিত করা হোক। তাদের বিচার ও শাস্তির ব্যবস্থা করা হোক। মানুষ যেন বুঝতে পারে, যা হয়েছে হয়েছে, আর হবে না বা হলেও দায়ী ব্যক্তিরা পার পাবে না।
বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তৈরি পোশাকশিল্পের নিরীহ শ্রমিকনেতা আমিনুল ইসলামের নৃশংস খুনের রহস্য উদ্ঘাটন করা জরুরি। কারণ, আমিনুলের বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট সদস্যদের কানে উঠেছে। তাঁরা এর সন্তোষজনক উত্তর চান। যুক্তরাষ্ট্রে আমাদের তৈরি পোশাকের বড় বড় ক্রেতা উদ্বিগ্ন। আশুলিয়া থেকে কাঁচপুর—কী হচ্ছে সেখানে? তৈরি পোশাকশিল্পের শ্রমিকদের পুলিশ বেধড়ক পেটায় কেন, কেন কারখানা বন্ধ? এই প্রশ্নগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় ক্রেতা-প্রতিষ্ঠানকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। আমিনুল হত্যাকারী কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী, যে-ই হোক না কেন, তাকে খুঁজে বের করা কি এতই দুঃসাধ্য? এটা কি কেউ বিশ্বাস করবে? তাকে ধরুন। বিচার করে শাস্তি দিন। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করুন। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও রাস্তাঘাটের ব্যবস্থা করুন। পদে পদে দুর্নীতি ও হয়রানি বন্ধের ব্যবস্থা করুন। দেখবেন, বিদেশি ক্রেতা ও বিনিয়োগকারীরা ঝাঁকে ঝাঁকে আসছেন।
আসল কথা হলো, ক্ষমতাসীনদের ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ-দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি ও আইনের শাসনে ঘাটতি—এই চার দুষ্টগ্রহের অশুভ সম্মিলনে সৃষ্ট জট সরকার কত দ্রুত ভাঙতে পারে, তার ওপর নির্ভর করছে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ।
ইংরেজিতে বলা হয়, ‘মেক অর ব্রেক’। সরকার যদি সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর ও সবার চোখে দিবালোকের মতো স্পষ্ট পদক্ষেপ না নিতে পারে, সব হিসাব উল্টে যাবে। কেউ ঠেকাতে পারবে না।
আব্দুল কাইয়ুম: সাংবাদিক।
quayum@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.