জনদাবি-ফুলবাড়ী যত দূর, লংমার্চ তত দূর by ফারুক ওয়াসিফ

সাঁওতালি গ্রাম বুকচিতে তখন খনখনে দুপুর। কয়েকটি সাঁওতাল শিশু টিনের বাটিতে করে চালভাজা খাচ্ছিল। ভাতের সঙ্গে তরকারি জোটে না। ওই চালভাজাটুকুই সম্বল। ওটুকু খেয়েই শিশুরা বাঁচে বড়রা দিনরাত খাটে। ঢাকা থেকে লংমার্চ আসবে, হাজার হাজার মানুষকে খাওয়াতে হবে।


তাই ফুলবাড়ীর আন্দোলনের স্থানীয় নেতা জুয়েল-বাবলু-জামান-মজিদ ভাইদের ডাকে মুঠি মুঠি চাল হাসিমুখে তারাও দিয়েছে। গেরস্ত বউরা চাল-ডাল-সবজি দিয়েছেন, লুঙ্গির গিঁট খুলে একটি কি দুটি টাকা এগিয়ে ধরেছেন কৃষক। গ্রামে গ্রামে মিটিং হয়েছে, আঙিনা-বৈঠক হয়েছে। লক্ষ্মীপুরের কবিয়াল কাম চাষি খাদেমুল আগে যাত্রাপালায় গান গাইতেন। এখন তাঁকে দেখা যায় হাটসভায় দোতারা নিয়ে নিজের লেখা ফুলবাড়ী আন্দোলনের গান গাইতে। ফুলবাড়ীর চার থানার প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে এখন আর বোঝানোর কিছু নেই। বরং তারাই এখন অন্যদের বোঝাতে সক্ষম।
ঢাকায় বসে কারও পক্ষে কল্পনা করা কঠিন, গত ৩০ অক্টোবর ফুলবাড়ী কী ইতিহাস ঘটিয়ে ফেলেছে। কোনো মানুষ সেদিন ঘরে ছিল না। পথে মানুষ, পথের দুপাশে মানুষ, যত দূর চোখ যায় কেবল মানুষ আর মানুষ। ২০০৬ সালের ২৬ আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানের দিনটিতেও এ রকম ঢল নেমেছিল। সেদিন বহুজাতিক এশিয়া এনার্জি কোম্পানিকে ফুলবাড়ী থেকে বিতাড়নের দাবিতে জাতীয় কমিটির ডাকে বিরাট গণজোয়ার সৃষ্টি হয়েছিল। জমায়েত হয়েছিল ৬০-৭০ হাজার কৃষক। যথারীতি শান্তিপূর্ণ মিছিলে গুলি চলেছিল। বিডিআরের হাতে নিহত হয়েছিল তিন তরুণ আর আহত হয়েছিল শত শত।
এক ছাত্রনেতা ব্যানার হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন। একদল তরুণ এসে তাঁর হাত থেকে ব্যানার কেড়ে নিয়ে মিছিল শুরু করে দেয়। কার ব্যানার, কিসের ব্যানার কে চিন্তা করে? বাসদ আর সিপিবির মিছিল যেন শেষই হয় না। ওয়ার্কার্স পার্টি, গণসংহতি আন্দোলন, জাতীয় গণফ্রন্ট, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টিসহ অন্যদের মিছিলও ছিল চোখে পড়ার মতো বড়। জাতীয় কমিটির ব্যানারে মূল মিছিলটি যখন সাত দিন ধরে প্রায় ৫০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে মঞ্চের দিকে এগিয়ে আসছিল, মনে হচ্ছিল যেন একটা প্লাবন আসছে পায়ে হেঁটে। কি হিন্দু আর কি মুসলমান, কি বাঙালি আর কি আদিবাসী, কি গ্রামীণ আর কি শহুরে, কি প্যান্ট পরা আর কি লুঙ্গি-শাড়ি পরা—সব সেদিন একাকার। ফুলবাড়ী সেদিন আত্মশক্তিতে আত্মহারা হয়ে গিয়েছিল।
চার বছরের দরিয়াও মায়ের সঙ্গে এসেছে ঢাকা থেকে। মাকে সে প্রশ্ন করে, ‘মা, লাল পতাকা কোন দেশের পতাকা?’ লংমার্চ তখন দিনাজপুরে। ঢাকার গরম, ধুলা, ধোঁয়া আর গাড়িঘোড়ার জঙ্গলের মধ্যে এই পদযাত্রা যেন মহিমাহীন। কিন্তু শহর পেরোলেই গ্রাম আছে। আছে অন্য মানুষ, যাদের দাঁড়ানোর সময় আছে, তাকানোর চোখ আছে, কথা শোনার মন আছে। সেই সব অখ্যাত গ্রাম আর নিমশহরের মধ্য দিয়ে চলতে চলতে লংমার্চ যেন নদী হয়ে যায়। যেন দেশের বুক থেকে গড়ানো একটা রক্তের ধারা উত্তর-বাংলার গেরুয়া মাটির ওপর দিয়ে বয়ে চলছে। তারা স্লোগান দিচ্ছে, ‘চলো চলো চলো রে, ফুলবাড়ী চলো রে’; ‘সালেকিনরা ডাকে রে, ফুলবাড়ী চলো রে’; ‘তোমার বাড়ি আমার বাড়ি, ফুলবাড়ী ফুলবাড়ী’; ‘আমার মাটি আমার মা, উন্মুক্ত খনি হবে না’; ‘জনগণের কয়লা সম্পদ, রপ্তানি করা যাবে না’; ‘গ্যাসসম্পদ ব্যবহার করে কলকারখানা নির্মাণ করো’; ‘খনিজ সম্পদের মালিকানা, জনগণ ছাড়বে না’। সংহতি জানাতে আসা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক দলের অন্যতম নাসিম আখতার হুসাইন মিছিলের ঢল থেকে চোখ সরিয়ে ছোট্ট দরিয়ার ওই বিরাট প্রশ্নের জবাব দেন, ‘মারে, লাল পতাকা হলো মানুষের পতাকা।’
গ্রাম-শহর-বাজার-ঘাট-লোকালয়ের মাঝখান দিয়ে টানা সাত দিন ধরে হেঁটেছে হাজারো মানুষ। পথসভা হয়েছে অজস্র জায়গায়। বড় বড় জনসভা হয়েছে ঢাকার পরে টঙ্গী, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, শেরপুর, বগুড়া, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা, রংপুর, সৈয়দপুর ও দিনাজপুরে। চলার বেগে মনের আবেগও এত তীব্র হয়েছে যে স্কুলের বেঞ্চে ঘুমানো, হলুদ একদলা খিচুড়ি নামক খাদ্য খাওয়া, নোংরা দুর্গন্ধময় টয়লেটে লাইন ধরে প্রাকৃতিক কর্ম সারা—কোনো কিছুই কেউ গায়ে মাখেনি। বরং কৌতুক তৈরি হয়ে গেছে। জাতীয় কমিটির ছিল তিন দাবি: রপ্তানি না, উন্মুক্ত না, বিদেশি না। ছেলেরা তুলেছে আরেকটি দাবি, ‘খিচুড়িও না’।
৫০০ কিলোমিটার পথ। এই দীর্ঘ পদযাত্রায় যত গল্প তৈরি হয়, সেই মহাকাব্যের মহাসিন্ধুকে এই লেখার বিন্দুর মধ্যে বর্ণনা করা অসম্ভব। সাদুল্যাপুরে স্থানীয় ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সভাপতি জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ আর সদস্যসচিব অধ্যাপক আনু মুহাম্মদের কাছে এসে জানিয়ে যান, আমাদের দল যা-ই করুক, আমরা আপনাদের পক্ষে। রংপুরে বক্তৃতা শেষে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে চা খাচ্ছিলেন আনু মুহাম্মদ। পেছন থেকে লুঙ্গি পরা এক বৃদ্ধ এসে তাঁর হাত ধরে কাঁপা গলায় আস্থা জানিয়ে যান, ‘আপনাদের সংগঠন সৎ সংগঠন।’ সিরাজগঞ্জে ভিক্ষুকেরা পর্যন্ত এক টাকা করে চাঁদা দিয়ে গেছে। জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং বিদ্যুৎসংকট সমাধানের রূপরেখা জানিয়ে প্রকাশিত জাতীয় কমিটির ১০ টাকা দামের পুস্তিকাটির ১০ হাজার কপির একটিও ফেরত আসেনি। বিতরিত হয়েছে কয়েক লাখ লিফলেট। সাত দিনের দীর্ঘ পথে মানুষ মিলেছে মানুষের সঙ্গে, মন খুলে দেশের আলোচনা হয়েছে পথে-পথে।
লংমার্চ মানেই উদ্দীপ্ত তরুণ-তরুণীদের কাফেলা। আগে আগে সাদা পিকআপে মাইক বাজিয়ে গান গাইছে চারণ, সমগীত, গণসংস্কৃতি ফ্রন্ট, সম্পদ রক্ষা সংস্কৃতি মঞ্চ, বিবর্তনের শিল্পীরা। লংমার্চ মানেই শিল্পী কামরুদ্দীন আবসার, মাহমুদুজ্জামান বাবু, কৃষ্ণকলি, অরূপ রাহী, অমল আকাশদের নতুন দিনের নতুন গানের ভ্রাম্যমাণ কনসার্ট।
জাতীয় কমিটি এর আগে ঢাকা-বিবিয়ানা লংমার্চ করেছে গ্যাস রপ্তানি নিষিদ্ধের দাবিতে। ঢাকা থেকে চট্টগ্রামে গিয়েছে বন্দর ইজারার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে, ঢাকা-মংলা ছুটেছে সুন্দরবন ধ্বংস করে গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনার বিরুদ্ধে। এর বাইরে রোডমার্চ হয়েছে ঢাকা-ফুলবাড়ী, ঢাকা-টেংরাটিলায়। সর্বশেষ ঢাকা-কক্সবাজার সমুদ্রের গ্যাস ব্লক বিদেশি কোম্পানিকে ইজারা দেওয়ার বিরুদ্ধে। সফলতা কম নয়। গ্যাস রপ্তানির তোড়জোড় বন্ধ হয়েছে, বন্দর এখনো ইজারা হয়নি, সুন্দরবনে গ্যাসকূপ বিদেশিদের দেওয়া এখনো ঠেকে আছে। চূড়ান্তভাবে ২০০৬-এর আগস্ট অভ্যুত্থানের পরে তৎকালীন বিএনপি সরকারের পক্ষে রাজশাহীর মেয়র মিজানুর রহমান মিনু ও এক মন্ত্রী এসে জাতীয় কমিটির ছয় দফা মেনে আনুষ্ঠানিক চুক্তি করতে বাধ্য হন। সেই চুক্তিরও মূল কথা ছিল সারা দেশে কোথাও উন্মুক্ত খনি হবে না, কয়লা-গ্যাস রপ্তানি হবে না এবং বিদেশি কোম্পানির হাতে জাতীয় সম্পদের মালিকানা তুলে দেওয়া যাবে না। সে সময় শেখ হাসিনা ফুলবাড়ী গিয়ে এই চুক্তি সমর্থন করেছিলেন। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী কিংবা বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেদের করা চুক্তি ও প্রতিশ্রুতি নিশ্চয়ই ভুলে যাননি। ফুলবাড়ীর এক সাঁওতাল যুবকের কথা তাঁদের জানাই। যুবকটির স্পষ্ট কথা: হাসিনা-খালেদা তো অস্থায়ী সরকার। সব সময় থাকবে না। স্থায়ী সরকার হলো জনগণ।
২০১০-এ জমি-জিরাত-সংসার থেকে উচ্ছেদ হওয়ার ভয়ে লাখো মানুষ পথে নেমেছিল। আর এখন নেমেছে আত্মবিশ্বাসে ভর করে। সংগ্রামকে তারা করে তুলেছে উৎসব, আর উৎসব বাড়িয়ে দিয়েছে ঐক্য আর সংহতি। এভাবে ঢাকা যদি ক্ষমতা আর বিত্তের রাজধানী হয়, ফুলবাড়ী হয়ে উঠেছে জনতার সংগ্রামের রাজধানী। সেই রাজধানী ধানেরও রাজধানী, ফসলেরও খনি, কৃষি-প্রকৃতি আর প্রাণবান মানুষের ঠিকানা। উন্মুক্ত খনি নামক আত্মঘাতী ‘বোমা’ সেখানকার মাটিতে বসানো দেশের জন্যও হবে আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত। ফুলবাড়ীর গণরায় উপেক্ষা করার কোনো সুযোগ তাই কারও নেই।
লংমার্চের স্রোতের সঙ্গে মিলতে শত স্রোতে মানুষ এসে জনসমুদ্র তৈরি করেছিল। পাঁচ-ছয় ঘণ্টা থরথর কম্পিত হয়ে সেই সমুদ্র হাজারো স্রোত হয়ে আবার ফিরে গেছে। ফিরে গেছে সেই লালপুর, চকশাহবাজপুর, সেই লক্ষ্মীপুর, সেই হামিদপুর, সেই বুকচি আর সেই বারকোনাসহ ফসলে আর গাছে সবুজ গ্রামগুলোতে। কিন্তু যে মানুষ বাড়ি থেকে বেরিয়েছিল, আর যে মানুষ ফিরে গেছে, দুই মানুষ আর এক নয়। এসেছিল বাঙালি চাষি, মজুর, কারিগর, স্কুলশিক্ষক, কর্মচারী, খুদে ব্যবসায়ী, ছাত্র ও ইমামরা; এসেছিল সাঁওতাল কিষান-কিষানি আর খেতমজুরেরা। ফেরার সময় তারা লংমার্চকেই বুকে ভরে নিয়ে গেছে, বদলে গেছে আত্মবিশ্বাসে। রাজপথের মহামিছিল এখন ফুলবাড়ীর পথ-ঘাট-মাঠ-নদী-সাঁকো দিয়ে, জঙ্গলের পাশ দিয়ে, মাঠভরা ধানের সমুদ্র থেকে উঠে আসা বাতাসের ঘ্রাণে নিঃশ্বাস নিয়ে, কার্তিকের জোছনায় মেঠোপথ দিয়ে গল্প করতে করতে ঘরে ফিরবে। তারপর অন্য দিনের থেকে কিছুটা দেরিতে ছেলে-পুলে-পরিবারের সঙ্গে মাটির মেঝেতে বসে গরম ভাত খাবে। আবারও কিছুদিনের জন্য তারা নির্ভয় হবে। কারণ, তারা ভরসা পেয়েছে, এই ভাত, এই ধান আর জোছনার অধিকার তারা হারিয়ে যেতে দেবে না। একটি উথাল-পাথাল দিনের স্মৃতি আর সাতটি দিনের ক্লান্তি নিয়ে লংমার্চ তখন গভীর নিঃশ্বাস ফেলে ঘুমিয়ে পড়বে।
তাদের এই ঘুম যাতে নিরাপদ থাকে, তার জন্য সরকার কি জেগে আছে? পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান গত সোমবার বলেছেন, উন্মুক্ত খনি হবেই (আমাদের সময়)। সরকার যদি একেই জাতীয় স্বার্থ মনে করে, মনে করে স্থল ও জলের বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্র অসম শর্তে বিদেশি কোম্পানিকে দিলে জাতীয় স্বার্থের ক্ষতি হবে না আর বিদ্যুৎ সংকটও ঘুচে যাবে। তাহলে প্রথম প্রশ্ন, কেন বেশির ভাগ গ্যাসক্ষেত্র তাদের হাতে থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ হচ্ছে না, কল চলছে না? কেন এত সম্পদ নিয়েও বাংলাদেশ গরিব?
ফুলবাড়ী জেগেছে, ডেকেছে। আমরা কি জেগে আছি? নাকি, তথাকথিত উন্নয়নের চেতনানাশকে আচ্ছন্ন আমরাও?
ফারুক ওয়াসিফ: সাংবাদিক।
farukwasif@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.