চার দিক-মানুষের সেবার জন্য ব্যবসাটা করি by সৈয়দা আখতার জাহান

ঠক ঠক ঠক ঠক—কাঠের ওপর লোহা পেটানোর শব্দ। অনবরত শব্দটা শোনা যাচ্ছে। ১৫ ফুট বাই ২০ ফুট ঘরে হাতুড়ি-বাটালি দিয়ে মনোযোগসহকারে কাজ করছেন তিন ব্যক্তি। যিনি মূল কারিগর, তাঁর নাম মাহবুব ইসলাম। বেশ ক্লান্তিহীনভাবেই কাজ চলছে।


সব ঠিকঠাকমতো হচ্ছে—কাঠ কাটা, মেপে নিয়ে বাক্সের কাঠামো তৈরি, ঢাকনা লাগানো, চারটা হাতল লাগানো ইত্যাদি। ঘরের মধ্যে থরেথরে সাজানো কফিন। হ্যাঁ, দোকানির নাম মাহবুব ইসলাম। দোকানের নাম নিউ আল বিদায় স্টোর। রোকেয়া সরণির এই দোকানটা প্রতিদিন দুবার চোখে পড়ে। তাকিয়ে দেখি দোকানের পাশে সাজিয়ে রাখা কফিনগুলো। মাহবুব ভাই রেইনটি, তুলা আর চাম্বুলগাছ কিনে স মিল থেকে চিরে আনেন। তারপর নিজের ভাড়া করা ছোট্ট ঘরটায় বসে তিনি নিজেই কফিন তৈরি করেন। মাহবুবের বাড়ি রাজশাহীর নাটোর জেলার নলডাঙ্গা গ্রামে। পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে মাহবুব সবার বড়। বৃদ্ধ বাবা ছোটখাটো একটা দোকান চালান। ক্লাস নাইনে পড়ার সময় কাজের খোঁজে ঢাকায় আসেন মাহবুব। পরিচিত এক লোক তাঁকে নিয়ে কাজ দেন কফিনের দোকানে। সেই থেকে শুরু।
কত দিন ধরে কফিন তৈরির কাজ করছেন?
‘প্রায় ১০ বছর হইব। আগে অন্যের দোকানে কাজ করতাম, কর্মচারী ছিলাম। পরে নিজেই দোকান দিছি। প্রথমে যখন চাকরিতে ঢুকি, আমার বেতন ছিল না। খালি থাকা-খাওয়া দিত। তিন মাস পর থেকে ১৫০০ টাকা বেতন দেওয়া শুরু করে।’
কফিন তৈরিতে আপনাকে আর কে সাহায্য করে?
‘আপা, এই দোকানের কফিনগুলো আমি নিজেই বানাই। দোকান কিননের পর ভাইকে লিইয়াইছি। এখন দুই ভাই মিলে দোকান চালাই।’
বিক্রি কেমন হয়?
‘ব্যাচাবিক্রি আপা ভালোই হয়। পাইকেরি প্রতিদিন ২০টি বিক্রি হয়। আর দোকান থেকে খুচরা বিক্রি হয় দিনে দুই থেকে তিনটা। আবার কোনো কোনো দিন বিক্রিই হয় না।’
কফিন ছাড়া আর কী কী আছে আপনার দোকানে?
‘আপা, আমার দোকানে ছয় ফুট ও সাড়ে ছয় ফুট—এই দুই সাইজের কফিন সব সময় পাওয়া যায়। এ ছাড়া অন্য সাইজের কফিন নিতে অর্ডার দিতে হয়। অর্ডার দিলে দুই-তিন ঘণ্টার মধ্যে তৈয়ার কইরা দেই। কফিন ছাড়াও কাফনের কাপড়, চা-পাতি, গোসলের নয়টা আইটেম, কর্পূর ও পলিথিন রাখি। কেউ লাশ বহনের গাড়ি চাইলে তারও ব্যবস্থা করন যায়। গাড়ি ভাড়া আইনা দেই।’
কফিনের দরদাম কেমন রাখেন?
‘আপা, পাইকেরি রেট ৬৫০ থেকে ৭০০ টাকা, আর খুচরা বেচলে ৮০০-১০০০ টাকায় বেচি। প্রতিটা কফিন তৈয়ার করতে আমার খরচ যায় ৬০০-৬৫০ টাকা।’
সংসারজীবনে কেমন আছেন?
‘আপা, আয়রোজগার যা করি, তাতে ভালোই আছি। আমার একটা ছেলে আছে, চার বছর বয়স। বউ-বাচ্চা বাড়িতে থাকে। আমি একটা মেসে থাকি। পুরো সংসার আমারই চালাইতে হয়। ভাইগুলো তো ছোট ছোট। তাই আছি বেঁচে। আল্লাহ ভালোই রাখছেন। আপা, যখন এই কফিনের দোকানে কাজে আসি, তখন কিছুই বুঝতাম না। না জাইনাই চইলা আইছি। এহন ঠিক করছি, এইটাই করব। মানুষের খেদমতের জন্যই এই ব্যবসা করি।’
তারপর মাহবুব ভাই...
‘গরিব মানুষ বইল্যা লেখাপড়া শিখতে পারি নাই। সংসারে অভাব ছিল, ভাইয়েরা ছোট ছিল, বাপের একার আয়ে সংসার চলত না—সব মিলায়া কাজে চইলা আসি। মনে করেন যে ১০ বছর ধইরা এই কাম করি তো, মায়া হইয়া গেছে।
তয়, ছেলেটারে লেখাপড়া শিখাইতে চাই। আল্লাহ ভালো রাখছেন। দোয়া কইরেন যেন ভালো থাকবার পারি।’
বেদনার সঙ্গে যুক্ত তাঁর কাজ। কিন্তু মানুষ বাঁচার জন্য এ রকম কাজ থেকেও সুখ পায়।

No comments

Powered by Blogger.