অরণ্যে রোদন-একজন মিজানুর একজন চাঁপা রানীআনিসুল হক

আমরা জানি, আমাদের মেয়েরা কোথাও নিরাপদ নয়। না ঘরে, না বাইরে, না ছাদের নিচে, না রাস্তায়। না কর্মক্ষেত্রে, না হাটে-বাজারে। কিন্তু তাই বলে আমাদের মেয়েরা কাজে যাবে না, বাইরে যাবে না, স্কুল-কলেজে যাবে না, মাঠে-ঘাটে যাবে না, বাস-ট্রেনে উঠবে না, তা কক্ষনো আমরা চাই না।


বাংলাদেশ যেসব ক্ষেত্রে অগ্রগতি অর্জন করেছে, তার মধ্যে একটা হলো মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার। আরেকটা জিনিস চোখে পড়ার মতো—গার্মেন্টসের মেয়েরা দলবেঁধে কাজে যায়, আমাদের অনেক শহরের ফুটপাতগুলোর প্রধান পথিক কিন্তু তারাই।
মেয়েরা বাইরে যাচ্ছে, স্কুলে যাচ্ছে, কলেজে যাচ্ছে, কাজে যাচ্ছে, এটা যখন বাড়ছে, তখন আরেকটা জিনিস বেড়ে গেছে, যাকে আমরা বলছি ইভ টিজিং, নারী-উত্ত্যক্তকরণ। আর এই টিজিংয়ের শিকার মেয়েরা আত্মহত্যা করেছে, এ ধরনের একাধিক ঘটনাও ঘটেছে।
কিছুদিন আগেও এই কলামে লিখেছি, ইভ টিজিংয়ের ঘটনা যদি কোথাও ঘটে, যে ছেলেটি এই কাজ করছে, এটা তার লজ্জা, তার অপমান। যে মেয়েটি এর শিকার, সে নিশ্চয়ই এর প্রতিবাদ করবে, প্রতিবাদ তার পরিবার করবে, সমাজের সবাই তার পাশে থাকার জন্য এগিয়ে আসবে, কিন্তু যা-ই ঘটুক না কেন, মেয়েটি আত্মহত্যা করবে না। একটাই আকুতি আমাদের মেয়েদের প্রতি—কন্যা আমার, বোন আমার, এসো, আমরা প্রতিবাদ করি, আমরা রুখে দাঁড়াই, কিন্তু ভুলেও যেন আমরা নিজের জীবন-অবসানের কথা না ভাবি।
আর আমরা চেয়েছি, সবাই চাইছে, একটা গণসচেতনতা তৈরি হোক ইভ টিজিংয়ের বিরুদ্ধে, সমাজের ভেতর থেকেই তৈরি হোক প্রতিবাদ, পরিবারের ভেতর থেকেই উঠে আসুক সচেতনতা, আমার পরিবারের কোনো ছেলে যেন মেয়েদের অপমান/উত্ত্যক্ত/হয়রানি/নিপীড়ন করার ঘটনার সঙ্গে যুক্ত না হয়ে পড়ে।
আমরা চাই প্রতিবাদ হোক। আমরা চাই কেউ একজন বলুক, আমি এটা হতে দেব না।
হ্যাঁ, আমরা সেই মানুষগুলোকে দেখলাম, যাঁরা প্রতিবাদ করতে এগিয়ে এসেছেন।
দুজন মানুষ নারী-নিপীড়নের প্রতিবাদ করতে গিয়ে গত তিন সপ্তাহে সংবাদের শিরোনাম হয়েছেন। একজন নাটোরের বাগাতিপাড়া উপজেলার লোকমানপুর কলেজের রসায়নের প্রভাষক মিজানুর রহমান। আরেকজন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার চাঁপা রানী ভৌমিক। দুজনই নিহত। দুজনের মৃত্যুর ঘটনার আশ্চর্য মিল। দুজনকেই খুন করা হয়েছে মোটরসাইকেল দিয়ে আঘাত করে। মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে দুজন একই রকমের হামলার শিকার হলেন। দুজন আক্রান্ত হলেন বাংলাদেশের দুই অঞ্চলে। কেবল তাঁরা একই ধরনের হামলার শিকার হয়েছেন তা-ই নয়, তাঁদের মৃত্যুর কারণও অভিন্ন। তাঁরা দুজনই ইভ টিজিংয়ের প্রতিবাদ করেছিলেন।
মিজানুর রহমান প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁর ছাত্রীকে হয়রানি করার বিরুদ্ধে। লোকমানপুর কলেজের একাদশ শ্রেণীর ছাত্রীদের আসিফ আলী ও রাজন নামের দুই বখাটে উত্ত্যক্ত করত। ছাত্ররা বিষয়টি মিজানুর রহমানকে জানালে তিনি কলেজ কর্তৃপক্ষকে ঘটনা অবহিত করেন। বখাটেরা ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁর গায়ের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দেয়। তিনি মারাত্মক আহত হন। শেষ পর্যন্ত তিনি মারাই যান।
তাঁর মেয়ের বয়স চার বছর। ছোট্ট মেয়েটা বুঝবেও না মৃত্যু কী, বাবা কেন ফিরে আসছেন না। মিজানুরের স্ত্রী সদ্য স্বামীহারা রাজিয়া সুলতানার মর্মবেদনার কথা যতবার ভাবি, চোখে জল চলে আসে। যতবার ভাবি মিজানুরের বৃদ্ধা মায়ের কথা, তখন কোনো সান্ত্বনাবাক্যই খুঁজে পাই না।
অন্যদিকে ফরিদপুরের চাঁপা রানী প্রতিবাদ করেছিলেন তাঁর স্কুলপড়ুয়া দুই মেয়েকে উত্ত্যক্ত করায়। যে বখাটে এই দুই মেয়েকে জ্বালাত, তাদের বিরুদ্ধে তিনি উপজেলা চেয়ারম্যান, ভাইস চেয়ারম্যান, স্কুল কমিটির সদস্যদের কাছে নালিশ করেন। আরও ক্ষিপ্ত হয়ে সেই ছেলেটি এই মায়ের শরীরের ওপরে তুলে দেয় মোটরসাইকেল। তিনি মারা যান।
এই দু-দুটি মৃত্যুও কি আমাদের মূঢ় চৈতন্যকে নাড়া দেবে না? আমাদের ঘুমন্ত বিবেককে জাগ্রত করবে না? মিজানুরের ছোট্ট মেয়েটির কী হবে? কে পাশে দাঁড়াবে এই পরিবারটির? এমনি কত প্রশ্ন আমাদের মনে জাগে। এমনি কত আকুলতা আমাদের দুচোখ ভাসিয়ে নিতে চায়।
কিন্তু এই শোকের মধ্যেও একটা সান্ত্বনা আমরা পাই। আমাদের মধ্যে সাহসী মানুষ আছেন, যাঁরা প্রতিবাদ করছেন। আমাদের এই দেশে মিজানুর রহমানের মতো শিক্ষক আছেন, যিনি ছাত্রীদের নিরাপত্তা বিধান করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমাদের মধ্যে এমন নারী আছেন, যিনি তাঁর মেয়েদের নিরাপত্তার কথা ভেবে কেবল চোখের জল ফেলেননি, প্রতিকারের জন্য সচেষ্ট হয়েছেন।
আর তাঁদের এই অনাকাঙ্ক্ষিত করুণ মৃত্যুতে সমগ্র বাংলাদেশ যেন নড়ে উঠেছে। মিজানুরের ওপর হামলার প্রতিবাদে সারা বাংলাদেশে প্রতিবাদ-সমাবেশ-বিক্ষোভ হয়েছে অনেক। সেই বিক্ষোভ চলার সময়ই আক্রান্ত ও নিহত হলেন চাঁপা রানী। চাঁপা রানীর মৃত্যুতে প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠেছে মধুখালী উপজেলার সমস্ত মানুষ। সেই প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ছে সারা দেশে।
ইভ টিজিং কেড়ে নিল অনেকগুলো প্রাণ। আমরা জানি না, সারা বাংলাদেশে আরও কত পরিবার এই সমস্যাটি নিয়ে বিব্রত, ব্যতিব্যস্ত। কত মেয়ে স্কুল-কলেজে যেতে ভয় পাচ্ছে, কতজন এই সব টিজিং মাথায় করে ঘরের বাইরে যাচ্ছে, বা ঘরের দরজা-জানালা বন্ধ করে রাখতে বাধ্য হচ্ছে। কতজনকে স্কুল বদলাতে হচ্ছে, কতজনকে বদল করতে হচ্ছে আবাস।
সরকার নড়েচড়ে বসছে, বখাটেদের অনেক ক্ষেত্রেই গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, এই মৃত্যুর জন্য দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আইন সংশোধন করে কঠোর করার প্রক্রিয়াও চলছে।
আমরা খুব একটা অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি। আমাদের অর্থনীতি অস্থির, সর্বত্র দ্রুত বড়লোক হওয়ার প্রতিযোগিতা, সর্বত্র দুর্নীতি-লোভ-লুণ্ঠন, আইনের শাসন বলতে যা বোঝায়, তা অনুপস্থিত। মূল্যবোধ বলতে কিছুই অবশিষ্ট নেই, সামাজিক বন্ধন-শৃঙ্খলা-নিয়ন্ত্রণ ভেঙে পড়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো অকার্যকর। সামাজিক অসাম্য তীব্র। একই সঙ্গে সামন্ততান্ত্রিক মূল্যবোধ ও শ্রেণীবিভাজনের অন্ধকার, অন্যদিকে সর্বশেষ তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে দরজা-জানালা দিয়ে হুড়মুড় করে ঢুকে পড়া সারা বিশ্বের সবকিছু। এর মধ্যে একটার পর একটা রোমহর্ষক নৃশংসতার নজির, খুনখারাবি, পিটিয়ে মানুষ খুন, প্রেমের প্রস্তাবকারী তরুণের হাতে তরুণী বা তার বাবা-মা খুন, ছাদ থেকে ফেলে দিয়ে সহপাঠী খুন। কিন্তু দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির নজির কই?
একটা অপরাধের বিচার ব্যাহত হলে আরেকটা অপরাধ উৎসাহিত হয়। রাজনৈতিক কারণে কোনো একজন খুনিকে আড়াল করার চেষ্টা করা হলে বা খুনির পক্ষে সাফাই গাওয়া হলে আরও অনেক অপরাধী মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে। অপরাধ করলে শাস্তি পেতেই হবে, পার পাওয়া যাবে না, এটা যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, তত দিন এ ধরনের অপরাধীরা উৎসাহিত বোধ করবে।
পাশাপাশি আমার নিজেকেই এখন নিজের বিবেকের সামনে আরও একবার দাঁড়াতে হবে। আমি আমার কাজে-কথায়-আচরণে কী নজির রাখছি সমাজের সামনে।
আমার মনে হয়, গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য। নাটক-সিনেমা-গান-কবিতা-গল্প-কলাম, আমাদের হাতে যতগুলো অস্ত্র আছে, যা দিয়ে আমরা পৌঁছাতে পারি মানুষের মনের গভীরে, জাগিয়ে তুলতে পারি মানুষের ভেতরের মানুষটাকে, শুশ্রূষা করতে পারি মানুষের গভীর শুভবোধকে, তা নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে।
এ ক্ষেত্রে আমরা চাই, এগিয়ে আসুক আমাদের তরুণেরা। তারা আওয়াজ তুলুক, আমরা ইভ টিজিং করি না, আমরা ইভ টিজিং করতে দেব না।
মিজানুর রহমানের মৃত্যুকে আমরা মেনে নিইনি। চাঁপা রানীর মৃত্যুর দুঃখ আমরা সইতে পারছি না। কিন্তু আমরা কেবল শোক করব না। মিজানুর রহমান একজন বীর শিক্ষক। একজন আদর্শবাদী মানুষের নাম। আদর্শবাদীর মৃত্যু নেই। চাঁপা রানী একজন মহীয়সী নারীর নাম, যিনি নিজে চাকরি করতেন আর তাঁর মেয়েদের উচ্চশিক্ষিত করার সংগ্রামে রত ছিলেন। যিনি অন্যায় সহ্য করেননি, প্রতিবাদ করেছেন, প্রতিকারের প্রয়াস পেয়েছেন। আমরা তাঁর কাছ থেকে প্রতিবাদের আগুনটা নিতে চাই।
আমাদের রাষ্ট্র, আমাদের সমাজটা কতখানি বিপজ্জনক হয়ে উঠেছে, এ দুটি মৃত্যু আমাদের সে কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে বটে, কিন্তু পাশাপাশি এ-ও মনে করিয়ে দিচ্ছে, প্রতিবাদ শেষ হয়ে যায়নি, প্রতিবাদী মানুষ সমাজ থেকে উঠে যায়নি, সাহসী মানুষ এই দেশে, এই সমাজে এখনো আছেন। এঁরা এই ঘন অন্ধকারেও সূর্য লুট করে আগুন এনে দিতে চান আমাদের, আমাদের বরফশীতল রক্তহীন দেহ আর মনটাকে তাতিয়ে দিতে চান। সমাজের অন্ধকার তাঁরা তাড়াতে চান আলো জ্বালিয়ে।
আমাদের মেয়েদের অগ্রযাত্রা থামবে না। তারা স্কুলে যাবে, কলেজে যাবে, কাজে যাবে, হাটে যাবে, মাঠে যাবে এবং বাংলাদেশটাকে একটা মানবিক বাসযোগ্য নিরাপদ আবাসভূমিতে পরিণত করার সংগ্রামে শামিল হবে। মিজানুর রহমান আর চাঁপা রানীর আত্মত্যাগ আমাদের সেই সংগ্রামকে শক্তিশালী করুক। সরকার, প্রশাসন, নেতৃবর্গ, পুলিশ, জনপ্রতিনিধি, সমাজপতি, সামাজিক শক্তি, গণমাধ্যম আরও সক্রিয় আর সোচ্চার হোক। প্রতিটা পরিবারের মধ্যে প্রতিটা হূদয়কে আরও মানবিক, আরও নারীবান্ধব, আইনের প্রতি আরও শ্রদ্ধাশীল করে গড়ে তুলি আমরা।
আর কোনো বালিকা/কিশোরী/তরুণী/নারীকে যেন টিজিংয়ের শিকার হতে না হয়, হতে না হয় অকালমৃত্যুর শিকার। ঘাতকের হাত চিরতরে স্তব্ধ হোক, যেন আর কোনো মিজানুর কিংবা চাঁপা রানীকে আক্রান্ত হতে না হয়। শুধু শুভকামনা দিয়ে এই স্বপ্ন চরিতার্থ হবে না। আমাদের আরও আরও সাহসী মিজানুর ও চাঁপা রানীকে দরকার হবে। শুভবাদী আদর্শবাদী প্রতিবাদী মিজানুর আর চাঁপা রানীর সাহসিকতা আমাদের পথ দেখাবে।
আনিসুল হক: সাহিত্যিক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.