বৈষম্য-উপজাতি, আদিবাসী, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী: এরপর কী? by শাহানা হুদা

সরকার গত ১২ এপ্রিল ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইন’ জাতীয় সংসদে পাস করেছে। অভিযোগ আছে, এই আইন তৈরি ও প্রণয়ন করার সময় পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ ও আদিবাসী নেতাদের কাছ থেকে কোনো মতামত নেওয়া হয়নি। সরকারের পক্ষ থেকে তিন-চারজন নৃবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলা হলেও সরকার


এককভাবেই সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে ‘আদিবাসী’দের পরিচয় হবে ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’। তাদের মতামত থেকেছে উপেক্ষিত।
এ আইনটি প্রণয়নের আগে পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার না করে ‘উপজাতি’ শব্দটি ব্যবহারের জন্য ২০১০ সালের জানুয়ারি মাসে একটি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। বাংলাদেশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকেও পার্বত্য চট্টগ্রামবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের কাছে পাঠানো ১৯ এপ্রিল, ২০০৬ সালের এক চিঠিতেও ‘আদিবাসী’ শব্দটির পরিবর্তে ‘উপজাতি’ লেখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। অথচ সব সময়ই ব্রিটিশ আমলে ব্যবহূত এই ‘উপজাতি’ শব্দটির বিরোধিতা করেছে এ দেশে বসবাসরত বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ।
লক্ষ করা গেছে, বাংলাদেশ রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকেই ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহূত হয়ে আসছে। যদিও আমাদের সংবিধানে আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীগুলোর স্বীকৃতি নেই বা আদিবাসীদের সম্পর্কে সরাসরি কোনো কিছুই উল্লেখ নেই। তবে সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, ‘সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।’ একইভাবে ২৮(১১) অনুচ্ছেদে আছে, ‘কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, নারী-পুরুষভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।’ সংবিধানের ২৯(২) অনুচ্ছেদের (ক) উপদফায় আরও বলা হয়েছে, নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশ যাতে প্রজাতন্ত্রের কর্মে উপযুক্ত প্রতিনিধিত্ব লাভ করতে পারে, সে উদ্দেশ্যে তাঁদের অনুকূলে বিশেষ বিধান প্রণয়ন করা থেকে রাষ্ট্রকে নিবৃত্ত করবে না। নাগরিকদের যেকোনো অনগ্রসর অংশের মধ্যে ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র আদিবাসী বা সরকারি ভাষায় উপজাতি গোষ্ঠীগুলোকেও সরকারিভাবে নির্দেশ করা হয়।
ব্রিটিশ, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ও সরকারি দলিলে এসব জাতিগোষ্ঠীগুলোকে বোঝাতে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম শাসনবিধি ১৯০০, পূর্ববঙ্গ জমিদারি দখল ও প্রজাস্বত্ব আইন ১৯৫০, আয়কর আইনসহ অনেক সরকারি পরিপত্র, দলিল ও হাইকোর্টের রায়ে ‘আদিবাসী’ শব্দটি উল্লেখ করা হয়েছে।
বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০০০ সালে এবং ২০০৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে তাঁদের দেওয়া বাণীতে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। আওয়ামী লীগ তাদের নির্বাচনী ইশতেহার ২০০৮-এ ১৮(২) ধারায় ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছে।
এ দেশের প্রকৃত আদিবাসী কারা, এটা নিয়েও একটি বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে। অনেকে বলেন, বাঙালিরাও তো এ দেশের আদিবাসী। তারাও তো শত শত বছর ধরে এ দেশেই বসবাস করছে। এঁরাই মনে করেন, আদিবাসীদের ‘আদিবাসী’ হিসেবে স্বীকার করার অর্থই হচ্ছে আদিবাসীরাই এ অঞ্চলের আদি বাসিন্দা, বাঙালিরা নয়। অথচ নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে আদিবাসী পরিচয় নির্ধারণে আদি বাসিন্দা কিংবা আদি বাসিন্দা নয়, এটা মুখ্য বিষয় নয়, মুখ্য বিষয় অন্য কিছু। খুব সহজভাবে বলা হয়ে থাকে, প্রাক-ঔপনিবেশিক সময় থেকে যাঁরা যে এলাকায় বসবাস করে আসছেন, তাঁরা সেই এলাকার আদিবাসী হিসেবে বিবেচিত হবেন এবং যাঁদের সঙ্গে প্রাকৃতিক সম্পদের সম্পর্ক আছে, যাঁদের নিজেদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থা আছে, যাঁদের নিজস্ব ভাষা, সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস আছে, তাঁরাই আদিবাসী। কাজেই বিতর্ক করার আগে বিষয়টি ভালোভাবে বুঝে নিতে হবে। তবে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন।
ফিরে আসা যাক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান আইনের প্রসঙ্গে। আইনটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ‘আদিবাসী’ অথবা ‘উপজাতি’ জনগোষ্ঠীর নতুন নামকরণ করা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। ‘নৃ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ মানুষ বা নর। শব্দটি বাংলা ভাষায় উপসর্গ হিসেবে ব্যবহূত হয়। এভাবে নৃগোষ্ঠী শব্দটির অর্থ দাঁড়াচ্ছে মানবগোষ্ঠী। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অর্থ ছোট মানবগোষ্ঠী। তাহলে বৃহৎ বা বড় নৃগোষ্ঠী কি বাঙালিরা? নৃবিজ্ঞানে আদিবাসী শব্দটির সংজ্ঞা দেওয়া আছে এভাবে, ‘কোনো এলাকার প্রাচীন জনবসতি ও তাদের সংস্কৃতি বোঝাতে এই পদটি ব্যবহূত হয়। সাধারণভাবে পার্বত্য অথবা অরণ্য অঞ্চলে বসবাসকারী শতাব্দীর লালিত সংস্কৃতির ধারক-বাহকদের আদিবাসী বলা হয়।’
সেই হিসেবে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী যেমন—সাঁওতাল, মুন্ডা, ওঁরাও, কোচ, রাজবংশী ও অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী সবাই আদিবাসী। কারণ বরেন্দ্র এলাকায় এদের বাস বাঙালি জনগোষ্ঠীর আসার আগেই। বৃহত্তর ময়মনসিংহের মান্দি (গারো), হাজং, কোচ ও হাদি; সিলেটের মণিপুরি, খাসী, ত্রিপুরা, লুসাই; বরিশালের রাখাইন; খুলনা অঞ্চলের মালো, মাহাতো এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের খিয়াং, খুমী, চাক, চাকমা, তঞ্চঙ্গ্যাসহ মোট ১১টি পার্বত্য জাতিগোষ্ঠী প্রায় ৫০০ বছর ধরে বাস করে আসছে। তবে হ্যাঁ, এই বিভিন্ন এলাকার আদিবাসীদের ইতিহাস কোনোভাবেই এক নয়। তাই যখন পরিচিতি নির্ধারিত হবে, তখন সবার পরিচয়ও এক হবে না। সংস্কৃতিবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী প্রমোদ মানকিন ‘ভূমিতে আদিবাসীদের অধিকার এবং এ দেশে তাদের আবাস’ শীর্ষক এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, বহু বছর আগে আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা এ দেশের জনহীন, জঙ্গলময়, দুর্গম পাহাড়ি, শ্বাপদসংকুল এলাকায় এসে বসতি গড়েছিল এবং ধীরে ধীরে নিজের থাকার মতো জায়গা তৈরি করেছে। কাজেই জমির দলিল, খতিয়ান, দাগ—এগুলো তাদের কাছে চাওয়াটা অর্থহীন।
আন্তর্জাতিক ও জাতীয় পর্যায়ের নৃবিজ্ঞানী ও আদিবাসীবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, কোনো এলাকায় দীর্ঘকাল ধরে বসবাস করা এবং কোনো এলাকার জমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ লালন-পালন করা ছাড়াও আরও অনেক বৈশিষ্ট্য আছে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর। যেমন, তারা রাষ্ট্রীয় আইনের চেয়ে প্রথাগত আইনের মাধ্যমে তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তি করে, প্রথাগত আইন কার্যকর করার জন্য সনাতনী অথবা ঐতিহ্যগত প্রতিষ্ঠানের সহায়তা গ্রহণ করে, একটি বিশেষ আবাসভূমির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক থাকে এবং আধুনিক রাষ্ট্রগঠন-প্রক্রিয়ার সঙ্গে অসম্পৃক্ত থাকে। সবদিক থেকে বিবেচনা করেই বলা যায়, বাংলাদেশে বসবাসরত এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর পরিচয় কোনোভাবেই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বলা চলে না। আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাদের পরিচয় আদিবাসী। সরকার আইনে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কথা উল্লেখ করেছে, কিন্তু বাংলাদেশে ৪৫টি আদিবাসীর বাস।
আওয়ামীলীগ যেখানে নির্বাচনী ইশতেহারে ‘আদিবাসী’ শব্দটি ব্যবহার করেছে, তারা কেন সেখান থেকে সরে এল? কেন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নামকরণের ক্ষেত্রে তাদের মতামতকে মূল্য দেওয়া হলো না। আমরা আশা করব, ‘আদিবাসী’ ইস্যুটির প্রতি অসংবেদনশীল ও অবিবেচক কোনো গোষ্ঠীকে যেন আদিবাসীদের ভাগ্যোন্নয়ন-প্রক্রিয়ার দায়িত্ব দেওয়া না হয়।
শাহানা হুদা: উন্নয়নকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.