ধর নির্ভয় গান-জ্যৈষ্ঠের কিছু কথা, কিছু চিত্র! by আলী যাকের

আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার ষাট শতাংশ শ্রমের অংশীদার এ নারীরা। তারা কাজ বন্ধ করে দিলে তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে আমাদের। আমরা কি চিন্তা করে দেখি কখনও যে, আমাদের সমাজের ৫০ শতাংশ জনশক্তির উৎস নারী এবং তাদের শ্রম ষাট শতাংশের উপরে? এ নারীরা অনেক সহমর্মিতার দাবিদার এ সমাজ থেকে।


কোনোদিন কি আসবে এমন, যখন আমরা আমাদের নারীদের প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে পারব তাদের অক্লান্ত এবং স্বার্থহীন পরিশ্রমের জন্য?


জ্যৈষ্ঠ মাসের কাঠফাটা গরম। চারদিক যেন তেতে আছে। মাঝে মধ্যে বৃষ্টি হচ্ছে, হালকা এবং ঘন। তা সত্ত্বেও রোদ ওঠার পর বাইরে বেরিয়ে এলেই চামড়ায় ছ্যাঁকা লেগে যায়। জ্যৈষ্ঠ মাসের দিকে সূর্যের উত্তাপের সঙ্গে এসে যোগ দেয় জলীয় বাষ্প। এতে হয়েছে আরও বিপদ। খোলা আকাশের নিচে সামান্য একটু হাঁটাহাঁটি করলেও একেবারে ঘেমে নেয়ে উঠতে হয়। আমার জানা অনেকেই এ গরমকে অল্পবিস্তর ভয় করে। তারা ঘরের ভেতরে থাকে। পর্দা টেনে দিয়ে ঘর অন্ধকার করে রাখে। গলা শুকিয়ে এলে পরে সুশীতল মিষ্টি পানীয় পান করে। কেউ কেউ দেশ ছেড়ে বাইরে চলে যায়। হয়তো হিমালয়ের পাদদেশে কিংবা উত্তর ইউরোপের কোনো দেশে অথবা মার্কিন মুল্লুকে। এ গ্রীষ্মকে আমিও বাল্যকাল থেকে বড় ভয় করতাম। মনে পড়ে, একবার এ জ্যৈষ্ঠ মাসে রোজা পড়েছিল। আমার তখন বয়স নয় কি দশ। আমাদের বাড়ির সমবয়সী সবাই এ সিদ্ধান্ত নিলাম যে, রোজা রাখব। অন্ততপক্ষে ২৭শে রোজাটা। এ রোজায় নাকি বিশেষ সওয়াব। শেষ রাতে উঠে মায়ের আদর-যত্নে তৈরি করা পঞ্চব্যঞ্জন দিয়ে ভাত খাওয়া হলো। তারপর আখের গুড়ের পায়েস। সেহরি খেয়ে মনে হলো, বাহ, রোজা রাখাটা তো মজার! পরের দিন ছিল রোববার। স্কুলে সাপ্তাহিক ছুটি। তাই ঘুমিয়েই রইলাম সারা সকাল। সকাল গড়িয়ে দুপুর। এমন সময় মা ডাক দিয়ে বললেন, 'রোজা রেখে মোষের মতন পড়ে পড়ে ঘুমালে রোজা ভেঙে যায়।' ফলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও বিছানায় উঠে বসলাম। বসেই মনে হলো, আমার গলা শুকিয়ে কাঠ। শরীরে একটুও শক্তি নেই অবশিষ্ট। কী করে দিন পার করব? মা ঘর থেকে বেরিয়ে গেলে আবার শুয়ে পড়লাম। এক ঘুমে বিকেল ৫টা। ঘুম ভাঙতেই আবিষ্কার করলাম, বিছানা ঘামে ভিজে গেছে। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য যে, আমাদের শোয়ার ঘরে তখন ফ্যান ছিল না। ঘুম থেকে উঠে গোসল করে তৈরি হলাম ইফতারের জন্য। কিন্তু সময় আর আসে না। বারবার দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাই, সময় যেন এগোতেই চায় না, যেন থেমে গেছে চিরকালের জন্য। গলা কাঠ, মাথা গরম, পেটের ভেতরে ছুঁচোয় ডন মারছে। কিন্তু সময় তো পার হয় না। অপেক্ষা আর অপেক্ষা। অবশেষে মাহেন্দ্রক্ষণ এলো। সাইরেন বাজল। পানি দিয়ে রোজা খুলেই পরপর কয়েক গ্গ্নাস পানি খেয়ে ধড়ে প্রাণ ফিরে এলো। কিন্তু তখনও কিছু খাওয়া হয়নি। বিভিন্ন উপচারে সাজানো হয়েছে ইফতারের টেবিল। আমার জন্য নির্ধারিত প্লেটটার ওপরে ঝাঁপিয়ে পড়লাম। কিন্তু পেটভর্তি এত পানি যে, আর কিছুই উদরে প্রবেশ করতে চাইছে না। জ্যৈষ্ঠ মাস, গরম এবং রোজার এ অভিজ্ঞতা মিলেমিশে দীর্ঘদিন আমার মনে এ সময়টি সম্পর্কে একটি আতঙ্ক বিরাজ করত। এখন আমি, এ ভরা জ্যৈষ্ঠতেও কড়া রোদকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সপ্তাহান্তে আমার ছুটির দিনে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। রাস্তায় রাস্তায় সাইকেল চালাই এবং হঠাৎই আবিষ্কার করি, একদিক দিয়ে প্রকৃতি এ গ্রীষ্মকালে যেমন নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে তেমনি আরেকদিক দিয়ে সে হয় উদার। এমন জমকালো রঙের বাহার, রাস্তার দু'ধারে লাল-হলুদ কৃষ্ণচূড়া, বেগুনি জারুল, হলুদ সোনালু_ এসব আচ্ছন্ন করে ফেলে আমাকে। এছাড়া বাংলার আদি এবং অকৃত্রিম সুগন্ধি ফুল যেমন_ বেলি, জুঁই, কামিনী অথবা গন্ধরাজ এবং হাসনাহেনা_ এই শ্বেতশুভ্র সুবাস ছড়ানো ফুলগুলো সন্ধ্যাবেলায় মাতাল করে দেয় আমাকে। একেবারে গুমোট গরমেও লোডশেডিংয়ে আচ্ছন্ন এ শহরে বৃক্ষরাজি ঘেরা কোনো নিভৃত রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে এসব সৌরভ হঠাৎ কোথা থেকে ভেসে আসে জানি না। বাতাসহীন এ গুমোটে লগ্ন হয়েই থাকে যেন। তার সঙ্গে এসে মেলে এক ধরনের বুনো গন্ধ। এর উন্মাদনাও আমায় ব্যাকুল করে। আমি হাঁটতে হাঁটতে বুক ভরে জোরে নিঃশ্বাস নিই। প্রশ্বাসটি ছাড়তে ইচ্ছা করে না। ধরে রাখতে চাই বুকের ভেতরে যতক্ষণ পারি। আমার সেই বাল্যকালের গ্রীষ্মভীতি আজ হাস্যকর বলে মনে হয়। এ গ্রীষ্মে নিসর্গ যে কেবল আমাদের সুন্দর-সুরভিত পুষ্পই উপহার দেয় তা নয়। রসালো সব ফলেও ভরে তোলে আমাদের চারপাশ। আম, কাঁঠাল, জাম, লিচু... প্রকৃতি উদার হয়ে যেন নিষ্ঠুর উত্তাপের বিনিময়ে আমাদের ভরিয়ে দেয়, ভাসিয়ে দেয় এ উষ্ণ আদরে।
সেদিন গ্রামের বাড়িতে গিয়েছিলাম। শহর থেকে দূরে। আমাদের এলাকাটা নিচু অঞ্চল। তাই এ মৌসুমে উচ্চ ফলনশীল ধান পাকে এবং তা ঘরে তোলা হয়। এবার প্রচুর ধান হয়েছে সর্বত্র। সোনালি ধান ঘরে তুলছে মানুষ। ধান ছড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে রাস্তার ওপরে। ওইসব ধানের ওপর দিয়ে অবলীলায় চলছে সব যানবাহন। এতে যেন ধান মাড়াইয়ের কাজও হয়ে যাচ্ছে। চারদিকে তাকিয়ে দেখলে অসাধারণ এক দৃশ্য নজরে পড়ে। অজস্র মানুষ এক দক্ষযজ্ঞে ব্যস্ত যেন। হাসিমুখে ধান কাটার পর সেটিকে ঝাড়ছে, সিদ্ধ করছে, রোদে শুকাচ্ছে। এসব কাজ করে যাচ্ছে মহাআনন্দে। রাস্তার দু'পাশে এ ধরনের দৃশ্য চোখে পড়ে। আমি ছবি তুলে যাই একের পর এক, অনেক ছবি। বেশির ভাগ ছবিই আসল দৃশ্যগুলোকে অতিক্রম করতে পারে না। আমি ভাবি, হৃদয়নন্দন যে দৃশ্য হৃদয়ে গিয়ে গেঁথেছে তা তো আরেকটি যন্ত্রের পক্ষে ধারণ করা সম্ভব নয়। এখনও চোখ বন্ধ করলে আমার তোলা ছবির চেয়ে অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি আমার চোখে ভাসে। আহ! যদি আঁকিয়ে হতাম তাহলে হৃদয়ের ছবি আঁকা যেত চিত্রপটে। আমি আবারও উন্মাদ হয়ে যাই জ্যৈষ্ঠ মাস নিয়ে। এক সময় অবাক বিস্ময়ে আবিষ্কার করি, ধান মাড়াই, ধান বিছানো, ধান সিদ্ধ, ধান শুকানো_ এসব কাজে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই অগ্রণী ভূমিকা আমাদের গ্রামের নারীদের। ধান কুলায় তুলে ঝাড়ছেও নারী। প্রতি ১০-১২ নারীর মধ্যে হয়তো একজন প্রবীণ পুরুষ রয়েছেন বসে। কিন্তু এই যে কঠিন পরিশ্রম করে যাচ্ছে নারীরা তাতে তাদের মনে কোনো খেদ নেই। হাসিমুখে সব কাজ সমাপন করছে তারা। তারপর সন্ধ্যার দিকে কাজ শেষে পান চিবুতে চিবুতে রাস্তার ধারে বসে তিন-চারজন মিলে সুখ-দুঃখের গল্প করছে হয়তো। সারাদিন এ দৃশ্যটি চোখে পড়ে। বড় ভালো লাগে। হঠাৎ মনে হয়, আচ্ছা, দেখিই না আমাদের পুরুষপ্রবররা কী করছে তখন? আমি হয়তো আনমনে এ প্রশ্নটি উচ্চারণ করি। আমার সহকর্মী, গাড়িচালক আমাকে বলে, রাস্তার দু'ধারে চায়ের দোকানের দিকে দৃষ্টিপাত করলে বোঝা যাবে কী করে তারা। আমি তাকিয়ে দেখি, যুবক থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী পর্যন্ত সব পুরুষ তুমুল আড্ডা জুড়ে দিয়েছে চায়ের দোকানে। কাপের পর কাপ চা নিঃশেষিত হয়ে যাচ্ছে। ওরা কথা বলে চলে। কথা বলে চলে বিশেষ করে এখন, যখন স্থানীয় সরকার নির্বাচন অত্যাসন্ন। আমার চালক বলে, এখানে হাতি-ঘোড়া, রাজা-উজির, মারা হয় প্রতিনিয়ত। সবাই বড় ব্যস্ত এ নির্বাচন কেন্দ্র করে বহুবিধ কথাবার্তায়। এসব দোকানে প্রায়ই দেখা যায়, প্রার্থীরা এসে ভিড় জমান একের পর এক ভোট ভিক্ষা করতে। তারা বিনিময়ে কিছু দেওয়ারও আশ্বাস দেন ভোটারদের। তবে এ 'দেওয়া' সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের জীবনযাত্রা সহজ করে দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা নয়। ভোটের বিনিময়ে কিঞ্চিৎ উৎকোচ। এদিকে নারীরা কাজ করে চলে দিনের পর দিন। বাড়িতে ফিরে শিশুদের দেখাশোনা করে, রাঁধে, বাড়ে। সন্ধ্যার অন্ধকার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বামীরা এসে হাজির হবেন, তাদের খাওয়াতে হবে। তারপর তারা, ওই পুরুষরা আবার বেরিয়ে যান হাতি-ঘোড়া মারতে, চায়ের দোকানে, পেয়ালা-পিরিচে। কিন্তু আমাদের নারীরা কাজ করে চলে। কাজ করে চলে দিনের পর দিন। মাসের পর মাস। মাস পেরিয়ে বছর। তারপর আজীবন, যতদিন শরীরটা চলে। কাজ করে তারা মনের আনন্দে দিবস রজনী। আমি ভাবি, কোনোদিন এ নারীরা যদি বন্ধ করে দেয় কাজ করা? বলে, আজ আমাদের হরতাল! আজ কোনো কাজ নয়! আজ আমরা সারাদিন ধরে আপন আনন্দে মেতে থাকব। গাইব, 'দে লো সখী, দে পরাইয়া গলে সাধের বকুল ফুলহার' (রবীন্দ্রনাথ : মায়ার খেলা)। তাহলে তো সর্বনাশ! আমাদের উৎপাদন প্রক্রিয়ার ষাট শতাংশ শ্রমের অংশীদার এ নারীরা। তারা কাজ বন্ধ করে দিলে তো মাথায় আকাশ ভেঙে পড়বে আমাদের। আমরা কি চিন্তা করে দেখি কখনও যে, আমাদের সমাজের ৫০ শতাংশ জনশক্তির উৎস নারী এবং তাদের শ্রম ষাট শতাংশের উপরে? এ নারীরা অনেক সহমর্মিতার দাবিদার এ সমাজ থেকে। কোনোদিন কি আসবে এমন, যখন আমরা আমাদের নারীদের প্রতি এতটুকু কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করতে
পারব তাদের অক্লান্ত এবং স্বার্থহীন পরিশ্রমের জন্য?

আলী যাকের : সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব
 

No comments

Powered by Blogger.