প্রতারণা, সমাজ ও ইসলাম by মুফতি এনায়েতুল্লাহ

রাজধানীর কারওয়ানবাজারে অভিযান চালিয়ে ২৯ মে তিন হাজার কেজিরও বেশি আম ধ্বংস করা হয়েছে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই) পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বিশেষভাবে কার্বাইড দিয়ে পাকানো আম ধ্বংস করে। ম্যাজিস্ট্রেট জসিম উদ্দিনের নেতৃত্বে এ অভিযান পরিচালিত হয়।


এখন চলছে মধুমাস। বাজারে পসরা সাজানো হয়েছে মধুমাসের বিভিন্ন ফল দিয়ে। বিকিকিনিও হচ্ছে দেদার। অথচ আমরা যে ফলগুলো কিনে খাচ্ছি তা কি নিরাপদ? বিক্রীত ফলগুলো সাধারণত এক ধরনের কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হয়। পত্রপত্রিকায় প্রায়ই এ ধরনের রিপোর্ট প্রকাশিত হচ্ছে। এগুলো জনস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াচ্ছে। ফলে বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। এটা ভোক্তাসাধারণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা বা শঠতা। ইসলাম এ ধরনের প্রতারণাকে অত্যন্ত ঘৃণার চোখে দেখে।
প্রতারণা একটি সামাজিক ব্যাধি। মানুষ জীবনের নানা ক্ষেত্রেই একজন অপরজন কর্তৃক প্রতারিত হচ্ছে। এ মাত্রা দিন দিন যেন বেড়েই চলছে। প্রতারণার সুনির্দিষ্ট কোনো ক্ষেত্র নেই। বরং নানাভাবে প্রতারণা করা হয়ে থাকে।
কথাবার্তা, কাজকর্ম, লেনদেন, ব্যবসা-বাণিজ্য, বিদেশ গমন, এমনকি পবিত্র হজযাত্রায়ও ট্রাভেল এজেন্সির মালিকরা বিভিন্নভাবে প্রতারণার অপপ্রয়াস চালায়। এ ছাড়া মিথ্যা বলা, আমানতের খিয়ানত করা, দ্রব্যে ভেজাল মেশানো, পণ্যদ্রব্যের দোষ গোপন করা, ডলারের বিনিময়ে টাকার প্রলোভন দেওয়া, জিনের বাদশা সেজে মানুষকে ঠকানো, মোবাইল ফোনে লটারি জেতার কথা বলে প্রতারণা, মাছ ও সবজিতে ফরমালিন মেশানো, জাল টাকা চালিয়ে দেওয়া, ওজনে কমবেশি করা, বেশি দামের জিনিসের সঙ্গে কম দামের জিনিস মিশিয়ে দেওয়া, মিথ্যা হলফ করে অন্যের হক নষ্ট করা, মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া, লেখাপড়ায় ফাঁকি দেওয়া, পরীক্ষায় অসদুপায় অবলম্বন করা প্রভৃতি। এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড আমাদের সমাজে এতটাই প্রকট যে, এ থেকে বেরিয়ে আসা যাবে কি-না বলা যাচ্ছে না। তবে একমাত্র ধর্মীয় অনুভূতিই পারে মানুষকে নানা ধরনের প্রতারণামূলক কাজ থেকে বিরত রাখতে। পৃথিবীর কোনো ধর্মই এ ধরনের কাজকে সমর্থন করে না। প্রতারণা সম্পর্কে ইসলামের দিকনির্দেশনা অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইসলাম প্রতারণা ও প্রবঞ্চনাকে কখনও প্রশ্রয় দেয়নি। ইসলামের দৃষ্টিতে প্রতারণা হারাম। এটা মস্তবড় গুনাহর কাজও বটে। প্রতারণাকারীর জন্য দুনিয়া ও আখিরাতে কঠিন শাস্তির ঘোষণা রয়েছে ইসলামে।
মুসলমানদের পারস্পরিক লেনদেন, চালচলন, আচার-ব্যবহার, জীবনাচরণ প্রভৃতি সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট নীতিমালা রয়েছে। কোনো ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে প্রতারণার মাধ্যমে যে জীবিকা উপার্জন করা হয়, তা সম্পূর্ণরূপে হারাম। এ নীতিমালা লঙ্ঘন করে ইসলামে প্রতারণার আশ্রয় নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। হারাম রুজি খেয়ে ইবাদত করলে তা কবুল হয় না। হারাম দ্বারা পরিপুষ্ট দেহের আবাসস্থল জাহান্নাম। পক্ষান্তরে ইসলামের আলোকে সৎভাবে জীবনযাপনের মাধ্যমে আল্লাহতায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করলে জান্নাতে স্থান পাওয়া যায়। যে ধরনের ক্রয়-বিক্রয় বা লেনদেনে ধোঁকা দেওয়া বা এক পক্ষ কর্তৃক অন্য পক্ষকে ক্ষতিসাধনের সুযোগ থাকে, এমন প্রতারণামূলক ক্রয়-বিক্রয় করা ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ সম্পর্কে হজরত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাবধানবাণী উচ্চারণ করে বলেছেন, \'পণ্যের দোষত্রুটি না জানিয়ে বিক্রয় করা অবৈধ। দোষত্রুটি জানা থাকা সত্ত্বেও তা বলে না দেওয়া বা গোপন করা অবৈধ।\' মানবজীবনে প্রতারণা বা ধোঁকাবাজি একটি বিরাট অভিশাপ। এটা জাতীয় উন্নয়নের প্রতিবন্ধকও বটে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও পণ্যসামগ্রীর দোষত্রুটি গোপন করে বিক্রয় করা তথা ব্যবসা-বাণিজ্যে প্রতারণা করলে আল্লাহতায়ালার ঘৃণা ও ফেরেশতাদের অবিরাম অভিশাপ বর্ষিত হতে থাকে। ব্যবসার ক্ষেত্রে প্রতারণার মাধ্যমে কোনো পণ্যের দোষত্রুটি গোপন করার পরিণতি সম্পর্কে হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে_ হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, \'যে ব্যক্তি দোষযুক্ত পণ্য বিক্রি করে, ক্রেতাকে দোষের কথা জানায় না, এমন ব্যক্তি সবসময় আল্লাহর ঘৃণার মধ্যে থাকবে এবং ফেরেশতারা সব সময় তাকে অভিশাপ দিতে থাকবে।\' প্রতারণা করা মুনাফিকের স্বভাব। যারা প্রতারণা করে, তারা প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। একসময় প্রতারকের মুখোশ খুলে যায়, তখন আর পালানোর পথ থাকে না। প্রতারক কখনও ইমানদার বা বিশ্বাসী হতে পারে না। ধর্মভীরু হতে হলে তাকে নিশ্চয়ই প্রতারণামূলক আচরণ পরিহার করতে হবে। যে লোক প্রতারণা করে, তাকে কেউ বিশ্বাস ও ভক্তি-শ্রদ্ধা করে না। এমনকি তার সঙ্গে কেউ লেনদেন বা ব্যবসা-বাণিজ্য করতে উৎসাহিত হয় না। সবার কাছে সে উপেক্ষিত ও ঘৃণিত ব্যক্তিতে রূপান্তরিত হয়। ফলে প্রতারক ব্যক্তির সামাজিক মর্যাদা দারুণভাবে ক্ষুণ্ন হয় এবং সে সমাজের সবচেয়ে নিকৃষ্ট জীব হয়ে যায়। যারা প্রতারণামূলক অপরাধে জড়িয়ে পড়বে, তাদের ইসলামী আদর্শের গণ্ডিবহির্ভূত বলে গণ্য করা হয়েছে। হজরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, \'যে ব্যক্তি আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করে সে আমাদের মুসলমানদের দলভুক্ত নয়।\' _মুসলিম
মানবজীবনে প্রতারণার মাধ্যমে অন্যের অধিকার দারুণভাবে খর্ব হয়; নৈতিক, ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধ বিনষ্ট হয় এবং সামাজিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়, যা মানুষের নেক আমলকে ধ্বংস করে তাকে জাহান্নামের পথে পরিচালিত করে।
তাই ইহকালীন ও পারলৌকিক অনিষ্ট সৃষ্টিকারী এহেন জঘন্য অমানবিক অপকর্ম থেকে ধর্মপ্রাণ মানুষকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে এবং এর বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে প্রতিরোধ গড়ে তোলার জন্য জনসচেতনতা সৃষ্টিতে জাতি ধর্ম বর্ণনির্বিশেষে সবাইকে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।
লেখার শুরুতে উল্লেখ করেছিলাম আমে বিষ প্রয়োগ প্রসঙ্গে। মানবদেহের কথা না ভেবে যারা শুধু মুনাফা লাভের আশায় ফলমূলে বিষ প্রয়োগ করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা অত্যাবশ্যক। তারা কেমিক্যাল মিশিয়ে শুধু কাঁচা ফল পাকিয়ে এর পুষ্টিমানই নষ্ট করছে না, সে সঙ্গে গোটা জাতিকে ঠেলে দিচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে। এ ছাড়াও সমাজে চলমান অন্যান্য প্রতারণা সম্পর্কেও আমাদের সচেতন হতে হবে। প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে এর বিরুদ্ধে। আমাদের ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধ ও সচেতনতাই পারে এসব দুরাচারের কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে।
muftianaet@gmail.com
 

No comments

Powered by Blogger.