বীর মুক্তিযোদ্ধা-তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৩৯৭ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। আলী আকবর আকন, বীর প্রতীক প্রতিরোধযুদ্ধে আহত হন তিনি কয়েক দিন ধরে সেনানিবাসের ভেতরটা থমথমে। অবাঙালি সেনাসদস্যরা বাঙালিদের কেন জানি এড়িয়ে চলছে। সেনানিবাসে বাঙালিও তেমন নেই। বেশির ভাগ অবাঙালি।


বাঙালি বলতে আছেন আলী আকবর আকনসহ আনুমানিক ১৬০ জন। কর্মকর্তা বলতে ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেন (বীর প্রতীক, পরে মেজর জেনারেল), সুবেদার মেজর হারিছ মিয়া (বীর প্রতীক) এবং তিনি।
সেনানিবাসের বাইরে কী ঘটছে, সেটা আলী আকবর আকন ও তাঁর সহযোদ্ধারা তেমন জানেন না। ২৫ মার্চের পর দৃশ্যপট একেবারে পাল্টে গেল। এর মধ্যে আদেশ এল অস্ত্র জমা দেওয়ার। আলী আকবর আকনের মনে হলো কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। নিজের উপস্থিত বুদ্ধিতেই তিনি সজাগ হয়ে গেলেন। তাঁর সহযোদ্ধারাও একইভাবে সজাগ। কেউ অস্ত্র জমা দিলেন না। তারপর সময় গড়াতে থাকল।
২৮ মার্চ আলী আকবর আকন ও তাঁর সহযোদ্ধারা জানতে পারলেন দেশের কিছু ঘটনা। এরপর ক্যাপ্টেন আনোয়ার হোসেনের সঙ্গে তাঁরা কয়েকজন আলোচনা করলেন। সবাই বিদ্রোহ করে পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে একমত হলেন। কিন্তু সেই সুযোগ তাঁরা পেলেন না।
৩১ মার্চ রাতে পাকিস্তানিরাই আলী আকবর আকনদের অতর্কিতে আক্রমণ করল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ২৬ ফ্রন্টিয়ার ফোর্স ও ২৩ ফিল্ড রেজিমেন্ট গোলন্দাজ বাহিনী। আলী আকবর আকন ও তাঁর সহযোদ্ধারা সতর্কই ছিলেন। তাঁরাও পাল্টা আক্রমণ শুরু করলেন। দুই পক্ষে তুমুল গুলিবিনিময় চলতে থাকল। পাকিস্তানি সেনাদের আক্রমণে আলী আকবর আকনদেরই বেশি ক্ষয়ক্ষতি হলো। কয়েকজন শহীদ ও আহত হলেন।
সকালবেলা গোলাগুলি কমে গেল। তিনি ধারণা করলেন, পাকিস্তানি সেনারা আবার সন্ধ্যায় প্রচণ্ড আক্রমণ চালাবে। সেই আক্রমণে তাঁদের টিকে থাকতে হবে। তিনি সহযোদ্ধাদের গোলাবারুদ সংগ্রহ করতে বললেন। বেলা আনুমানিক পাঁচটা কি সাড়ে পাঁচটা। আলী আকবর দুরবিন দিয়ে আড়াল থেকে দেখতে থাকলেন পাকিস্তানি সেনাদের তৎপরতা। ঠিক তখনই পাকিস্তানি অবস্থান থেকে ছুটে এল একঝাঁক গুলি। একটি গুলি বিদ্ধ হলো তাঁর বুকে। তাঁর হাত থেকে ছিটকে পড়ে গেল স্টেনগান ও দুরবিন।
তীব্র যন্ত্রণায় আলী আকবর আকনের মুখটা নীল হয়ে গেল। তবে দমে গেলেন না। সাহসও হারালেন না। সেখানে তাঁর কোনো সহযোদ্ধা নেই। তাঁরা জানেও না তিনি আহত। অনেক কষ্টে সেখান থেকে ফিরে গেলেন সহযোদ্ধাদের কাছে। এর পরের ঘটনা সে আরেক কাহিনি।
আলী আকবর চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। ১৯৭১ সালে এই রেজিমেন্টের অবস্থান ছিল সৈয়দপুর সেনানিবাসে। তখন তাঁর পদবি ছিল নায়েব সুবেদার। সৈয়দপুর সেনানিবাস থেকে তাঁরা পালিয়ে গিয়ে সমবেত হন বদরগঞ্জে। সেখানে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে তাঁকে পাঠানো হয় ভারতে। চিকিৎসা নিয়ে আবার যোগ দেন যুদ্ধে। কিন্তু প্রত্যক্ষযুদ্ধে তিনি আর অংশ নিতে পারেননি। পরে তৃতীয় ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের কোয়ার্টার মাস্টার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
আলী আকবর আকন বীর প্রতীক খেতাব পেয়েছেন। ১৯৭৩ সালের সরকারি গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৮২।
আলী আকবর আকন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অনারারি ক্যাপ্টেন হিসেবে অবসর নেন। ২০১২ সালের জানুয়ারি মাসে মারা গেছেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার গৌরীপুর গ্রামে (বর্তমান ঠিকানা মুসলিমপাড়া, প্রথম লেন, দক্ষিণ ভান্ডারিয়া)। তাঁর বাবার নাম আসমত আলী আকন, মা আয়েশা খানম। স্ত্রী হাসিনা বেগম। তাঁদের এক ছেলে ও এক মেয়ে।
সূত্র: শিমুল আকন (আলী আকবর আকন বীর প্রতীকের ছেলে) এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ দলিলপত্র, নবম খণ্ড।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.