প্রশংসনীয় উদ্যোগ

দুই বছর পর হলেও নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। আওয়ামী লীগের নির্বাচনী ইশতেহারে বলা হয়েছিল, 'প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রিসভার সদস্য ও সংসদ সদস্য এবং তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে।'


দুই বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে অনেক কথাবার্তা হয়েছে। সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের ব্যাপারে সরকার নির্বাচনী অঙ্গীকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে_এমন কথাও বিভিন্নভাবে বলার চেষ্টা করা হয়েছে। গত বছর মন্ত্রিসভার বৈঠকে 'সম্পদ বিবরণী নতুন করে জমা দিতে হবে না'_এমন সিদ্ধান্তের পর বিষয়টি চাপাও পড়ে যায়। গত বুধবার জাতীয় সংসদের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে জানানো হয়েছে, মন্ত্রী ও মন্ত্রী পদমর্যাদার ব্যক্তিদের এক সপ্তাহের মধ্যে সম্পদের হিসাব জমা দিতে হবে। রবিবারের মধ্যে তাঁদের কাছে এ-সংক্রান্ত চিঠিও পেঁৗছে যাবে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য ও সিটি করপোরেশনের মেয়রদের নির্ধারিত ফরমে সম্পদের হিসাব বিবরণী জমা দিতে হবে। বিচারপতিদের সম্পদের হিসাব বিররণী জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে আলোচনা করার কথাও উল্লেখ করেছেন অর্থমন্ত্রী। এর আগে প্রধান বিচারপতিসহ ১৭ জন বিচারপতি তাঁদের বিবরণী জমা দিয়েছেন। গত ৩০ ডিসেম্বর রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের সম্পদ বিবরণী জমা দিয়ে প্রধান বিচারপতি অন্য বিচারপতিদের বিবরণী জমা দেওয়ার আহ্বান জানালে ১৬ বিচারপতি তাঁর আহ্বানে সাড়া দিয়ে সম্পদের হিসাব জমা দিয়েছেন।
মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস জানানোর বিষয়টি অতি গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের জন্য এ বিষয়টি গুরুত্ব বহন করে এ কারণে যে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, ক্ষমতা একসময় টাকা উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। অতীতে এই ক্ষমতার অপপ্রয়োগ বা ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অবৈধ পন্থায় সম্পদ অর্জনের অনেক ঘটনা ঘটেছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমরা এর অনেক দৃষ্টান্ত দেখেছি। মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও তাঁদের পরিবারের সম্পদের হিসাব ও আয়ের উৎস প্রতিবছর জমা দেওয়া ও তা জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলে প্রতিবছর তাঁদের সম্পদের পরিবর্তনের বিষয়টি যেমন জানা যাবে, তেমনি এ ব্যাপারে তাঁদের স্বচ্ছতার বিষয়টিও জনগণের গোচরে থাকবে। এতে তাঁদের প্রতি জনগণের আস্থা বাড়বে বলেই মনে করা যেতে পারে। মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের প্রতি জনগণের আস্থা নিশ্চিত করতেই তাঁদের সম্পদ ও আয়ের উৎস জানা ও জানানো প্রয়োজন। কারণ, ধরেই নেওয়া যেতে পারে যে এখানে কোনো লুকোচুরির আশ্রয় নেওয়ার সুযোগ থাকছে না। অবশ্য কেউ যদি লুকোচুরির আশ্রয় নেন বা কোনো রকমে একটি হিসাব বিবরণী দাখিল করেন, তাহলে সেটা ভিন্ন ব্যাপার। তবে নিজেদের স্বচ্ছতা প্রমাণ করতে কেউই সেটা করবেন না বলে আশা করা যায়। কারণ, ভবিষ্যতে এই লুকোচুরি ধরা পড়ে গেলে তিনি নিজেই ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।
মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরা নিয়মিত আয়কর দিয়ে থাকেন। তাঁদের আয়করের হিসাব বিবরণী প্রকাশ করা যায় না বলেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। সরকারের এ সিদ্ধান্তটি অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। এতে একদিকে যেমন নির্বাচনী ইশতেহারে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূরণ করা হলো, তেমনি নিশ্চিত করা হলো স্বচ্ছতার বিষয়টিও। দুই বছর পর হলেও এ সিদ্ধান্তটি জনপ্রতিনিধিদের স্বচ্ছতা অনেকটাই নিশ্চিত করবে। তবে শুধু সম্পদ বিবরণী বা আয়ের উৎস জমা দিলেই হবে না, তা জনসমক্ষে প্রকাশ করাটাও জরুরি। সেখানেই স্বচ্ছতা অধিক নিশ্চিত হবে।

No comments

Powered by Blogger.