শ্রদ্ধাঞ্জলি-মানুষকে ভালোবাসতেন তিনি by তৃপ্তি বালা

সময়ের বিচারে উত্তীর্ণ গৌরচন্দ্র বালা এই সমাজ-দেশের একজন মানুষ ছিলেন। সহজাত বিনম্র ছিল তাঁর জীবনাচরণ। মানুষের প্রতি ভালোবাসায় যে দরদি মনটি ছিল—তাতেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন সাধারণের একজন। ফরিদপুর জেলার তৎকালীন মাদারীপুর মহকুমার উল্লাবাড়ী গ্রামের মতো অজপাড়াগাঁয়ের এক অন্ধকার পরিবেশ থেকে উঠে এসে নিজ


আলোকে আলোকিত করার প্রয়াসে মেতেছিলেন তাঁর চারপাশ এবং কালক্রমে এই দেশ-ভূমির এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেয়েছিলেন। আজ তিনি এই দেশের জন্ম-ইতিহাসেরই অংশ।
শৈশবেই দিব্যকান্তি গৌরবর্ণ নাতিটিকে দেখে ঠাকুরদা কোদাই বালা যে ছেলে রাজমোহনকে বলেছিলেন, ‘গৌরকে পড়ালেখা শেখাস, ও মানুষ হবে।’ বাবার ওই কথাতেই আমার ঠাকুরদা রাজমোহন বালা এবং ঠাকুরমা নারায়ণী দেবী মেতে উঠেছিলেন ছেলেকে মানুষ করার ব্রতে।
উল্লাবাড়ী গ্রাম থেকে প্রায় দুই মাইল দূরে জলিরপাড় পাঠশালা দিয়ে শুরু করে ১৯৪৯-এ কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এমএ সম্পন্ন করার মধ্য দিয়ে গৌরচন্দ্র বালা হন ১৭ গ্রামের মধ্যে প্রথম এমএ পাস যুবক এবং সুযোগ পান মাতৃভূমির এক ঐতিহাসিক মুহূর্তে ভূমিকা রাখতে।
দেশ বিভাগের ফলে পাকিস্তানের উদ্ভব ও বিকাশকালে স্বভূমিতে তখন চলছিল নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন, শোষণ আর বঞ্চনার ঘটনা। সেই সময়ই ১৯৫২-৫৩ সালে মুসলিম লীগ সরকারের বিপরীতে দাঁড়াতে দেশগ্রাম থেকে যাওয়া ছোট কাকার অনুরোধে একবাক্যে ভারতীয় কেন্দ্রীয় সরকারের চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে স্বদেশভূমিতে চলে আসেন তিনি। ১৯৫৪ সালে তিনি তপসিলি ফেডারেশনের পক্ষে যুক্তফ্রন্টের প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন এবং মুসলিম লীগের মন্ত্রীকে হারিয়ে দিয়ে প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৫ সালে গণপরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং ১৯৫৬ সালে ঐতিহাসিক যুক্তফ্রন্ট সরকারের পরিবেশ, বন ও খাদ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ই তিনি তপসিলি ফেডারেশন ছেড়ে আওয়ামী লীগে যোগ দেন।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে তিনি এবং আওয়ামী লীগের আরও কয়েকজন এমএলএ কারাবরণ করেন। ছয় দফা ও আইয়ুববিরোধী আন্দোলনে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, তাজউদ্দীন আহমদের সঙ্গে একাত্ম হয়ে কাজ করেন।
১৯৬৪ সালে ফাতেমা জিন্নাহর পক্ষে আইয়ুববিরোধী নির্বাচনে বৃহত্তর ফরিদপুর জেলায় আওয়ামী লীগের সব সভায় সভাপতি থাকতেন তিনি এবং বঙ্গবন্ধু ছিলেন প্রধান অতিথি, প্রধান বক্তা। দক্ষিণবঙ্গের বিল অঞ্চলগুলোতে ওই নির্বাচনী প্রচারণায় নৌকায় চড়ে দিনের পর দিন তাঁরা একযোগে কাজ করে গেছেন।
অসহযোগ আন্দোলনের পর ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তিনি আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের সদস্য হন এবং পুনরায় প্রাদেশিক পরিষদ সদস্য নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি দক্ষিণ-পশ্চিম জোন-২-এ কার্যকরী চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বাংলাদেশ সংবিধান প্রণয়ন কমিটির ১০ সদস্যের মধ্যে তিনি অন্যতম।
এই যে মানুষটি গৌরচন্দ্র বালা—আমার বাবা, তাঁকে যখন আমি পেয়েছি তাঁর কর্মের, ক্ষমতার গৌরবোজ্জ্বল দিনগুলো এক অতীত। তখনো আমার শৈশবে দেখেছি সকাল-বিকেল আমাদের বাড়িতে বাড়তি অনেকগুলো পাত পড়ছে এবং ট্রেতে করে কাপে কাপে চা বাবার বৈঠকখানায় যাচ্ছে; আত্মীয়-অনাত্মীয়, গ্রাম সম্পর্কে কাছে-দূরের মানুষজন সবাই আমরা ডাল-ভাত-তরকারিতে খাওয়া শেষ করছি এবং বাবা আমার সারাক্ষণ তালপাখাতেই বাতাস নিচ্ছেন। আমাদের বাড়িতে বৈদ্যুতিক পাখার প্রয়োজন কখনো বোধ করেননি তিনি সেই সত্তরের দশকেও। গ্রামজীবনের সঙ্গে মানিয়েই বুঝি ঠিক করেছেন তাঁর জীবনাচরণ।
বিষয়-সম্পত্তির প্রতি আজীবনই নির্মোহ আমার বাবা তাঁর জীবনে যে কিছু সরল অথচ বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, তারই দু-একটির অবতারণা এখানে অপ্রাসঙ্গিক নয়। ঠাকুরদা যে নিজ জীবনে বুকের ঘাম ঝরিয়ে ১০০ বিঘা জমি অর্জন করেছিলেন, কলকাতা থেকে ফিরে এসে তাঁর শিক্ষিত ছেলে প্রথমেই ঠাকুরদার কাছে একটা বিনীত আবদার করেছিলেন; ঠাকুরদার অর্জিত সম্পত্তি তাঁর চার ভাইয়ের মাঝে সমান ভাগ করে দিতে অনুরোধ করেছিলেন তিনি। ঠাকুরদা মানতে চাননি, ছেলেকে বেগ পেতে হয়েছে, বোঝাতে হয়েছে বাবাকে, ‘ওঁরা তো তোমার আপন সহোদর।’ ঠাকুরদা শেষ পর্যন্ত মেনে নিয়েছিলেন। ছেলের কর্তব্যবোধের কাছে নতিস্বীকার করেছিলেন তিনি।
যুক্তফ্রন্টের ক্ষমতায় থাকা মন্ত্রী হিসেবে তিনি যে তাঁর বরাদ্দকৃত জমিটুকুর প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছিলেন, ‘অতিশয় বিষয়-সম্পত্তিতে তাঁর প্রয়োজন নেই, নিজ গ্রামেই একটি ভিটা আছে তার’—এ সবই তাঁর জীবনবোধের সাক্ষ্য বহন করে।
ফরিদপুর শহরে লিজকৃত পরিত্যক্ত যে বাড়িতে বাস করেছি আমরা; এক ঐতিহাসিক সময়ের সাক্ষী ষাটের দশকের শুরু থেকেই যে বাড়িটিতে বাস করে বাবা তাঁর রাজনৈতিক কর্মযজ্ঞ চালিয়ে গেছেন, যে বাড়িটিতে তিনি কাটিয়েছেন জীবনের ৪২-৪৩টি বছর, আমাদের শৈশব-কৈশোরের স্মৃতিজড়িত সেই বাড়িটি ‘ফরিদপুর ডায়াবেটিক সমিতি’ মামুলি ক্ষতিপূরণের নামে দখল করে নেয়।
বাবা সময়ে তাঁর নিজের নামে কখনো বাড়িটি আইনসিদ্ধ করে লিখে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করেননি, যে কারণে জীবনের শেষ দিনগুলোতে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাঁকে বিপদেই পড়তে হয়েছে।
অনুমান করা তাই কঠিন নয় গৌরচন্দ্র বালার জীবনবোধের মূলমন্ত্র।
আমরা যে তাঁর সেই মহতী কর্মের উদ্যোগী সন্তান, বাবার নিষ্কাম কাজের ঐতিহ্যে মাথা সোজা করে পথ চলি। সময়ের কাছে তাই সন্তানের কর্তব্যকে অগ্রাহ্য করতে পারি না; বাবার ঐতিহাসিক স্মৃতি সংরক্ষণের দাবি করি সমাজ-দেশ-কালের কাছে। এ যে আমাদের ঐতিহ্যকে সংরক্ষণের এক ঐতিহাসিক দায়িত্ব।

No comments

Powered by Blogger.