আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া যায় না-গণপিটুনি দিয়ে মানুষ হত্যা

গত রোববার রাতে ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে দুটি আলাদা ঘটনায় এলাকাবাসী ছিনতাইকারী সন্দেহে তিন যুবককে পিটুনি দিয়ে মেরে ফেলে। তাদের মধ্যে দুজন নৌযাত্রীদের টাকা ছিনিয়ে নেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়ে। অপর ঘটনায় মাঝরাতে এক যুবককে সন্দেহজনক ঘোরাফেরা করতে দেখে এলাকাবাসী এমন পিটুনি দেয় যে শেষপর্যন্ত তার মৃত্যু হয়।


এই নিহত যুবককে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে বলে তার মা অভিযোগ করেছেন।
চোর, ডাকাত, ছিনতাইকারীদের অবশ্যই শাস্তির আওতায় আনতে হবে; তাদের বিরুদ্ধে যেমন থানা-পুলিশের সক্রিয় তৎপরতা দরকার, তেমনি দরকার জনপ্রতিরোধ। কিন্তু গণপিটুনি আর জনপ্রতিরোধ এক কথা নয়। শুধু সন্দেহের বশবর্তী হয়ে কেউ মানুষ মেরে ফেলতে পারে, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু বারবার এসব মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে চলেছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে মানুষ এতই ক্ষুব্ধ ও হতাশ যে তারা নিজের হাতে আইন তুলে নিতে দ্বিধা করছে না। অথচ ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করলে সবাই বুঝবেন, একটি গণতান্ত্রিক সমাজে গণপিটুনির মতো হিংসাত্মক তৎপরতা চলতে পারে না।
আমাদের দেশে অপরাধীরা সহজেই ছাড়া পেয়ে যায়। আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবে এ রকম হয়। তা ছাড়া আদালতে মামলা বছরের পর বছর গড়ায়। বিলম্বিত বিচার বিচারবঞ্চনারই শামিল। অপরাধীকে গ্রেপ্তারে থানা-পুলিশও অনেক সময় নিষ্ক্রিয় ভূমিকা পালন করে। মানুষ যুগ যুগ ধরে দেখে আসছে যে অনেক অপরাধীর শাস্তি হয় না, উপরন্তু তারা আইনের ফাঁকফোকরে বেরিয়ে এসে অভিযোগকারীদের ভয়ভীতি দেখায়, নিরীহ মানুষ প্রাণভয়ে কাঁপে।
সাধারণ মানুষ নিরীহ ও শান্তিপ্রিয়। কিন্তু বিচারবঞ্চনার খারাপ দৃষ্টান্তগুলো মানুষের ধৈর্যচ্যুতি ঘটায়। এটাই গণপিটুনির সামাজিক ভিত্তি। কিন্তু মনে রাখা দরকার, কোনো অপরাধের বিচারের ভার একমাত্র আদালতের। অপরাধীর বিরুদ্ধে ক্ষেত্রবিশেষে আইনি ব্যবস্থা নিতে সরকারের ব্যর্থতা কখনো গণপিটুনির মাধ্যমে হত্যার যুক্তি হতে পারে না। শুধু সন্দেহের কারণে কাউকে মারপিট বা গণপিটুনি দেওয়া আইনের চোখে অপরাধ। বুঝে বা না-বুঝে কেউ গণপিটুনিতে অংশ নিলে সেটা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবেই
গণ্য হবে।
একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির আইনের আশ্রয় নেওয়ার অধিকার রয়েছে। এটা তার মৌলিক মানবাধিকারের অংশ। এ কারণেই প্রচলিত ‘ক্রসফায়ারে’ বা পুলিশি হেফাজতে মৃত্যু দেশে-বিদেশে মানবাধিকারের লঙ্ঘন বলে গণ্য করা হয়। ক্রসফায়ার ও গণপিটুনির মধ্যে তেমন কোনো পার্থক্য নেই। দুটিই বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড। গণপিটুনির সংস্কৃতি থেকে সাধারণ মানুষকে বেরিয়ে আসতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.