নগর উন্নয়ন-ঢাকাকে বাঁচাতে ড্যাপ বাস্তবায়নের নৈতিক দায়

মাননীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী, ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানের রিভিউ কমিটির সদস্য, রাজউকের প্রতিনিধি এবং আবাসন ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিদের মধ্যে প্রচণ্ড বাগিবতণ্ডার খণ্ডচিত্র গণমাধ্যমের কল্যাণে এ দেশের জনগণ দেখল। এ জন্য গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ।


পত্রিকা মারফত বিস্তারিত জানলাম, মাননীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রীর প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণের বিবরণ এবং উপস্থিত বরণ্যে শিক্ষাবিদ ও গবেষকদের অসহায় ভাষ্য, ‘ঢাকা শহর... কীভাবে বাঁচবে?’ এ ঘটনার পর শিক্ষক হিসেবে মনে হয়, এ কোন দেশে বাস করছি আমরা? প্রশ্ন জাগে, এ দেশের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা, সমাজবিজ্ঞান, ভূগোল, লোকপ্রশাসন-জাতীয় বিষয়গুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যতালিকায় রাখার আর কি প্রয়োজন আছে? ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ইচ্ছা-অনিচ্ছায় যদি দেশের সব কার্যক্রম চলত, তবে কোনো পরিকল্পনা প্রণয়ন তথা সরকারেরই প্রয়োজন থাকত না। অর্থনীতি যদি উন্নয়নের একমাত্র মাপকাঠি হতো, তবে দুনিয়াজুড়ে উন্নয়নের ক্ষেত্রে এত পূর্বশর্ত থাকত না, চিন্তা করা হতো না পরিবেশ ও সমাজ-মানুষের ওপর উন্নয়নের প্রভাব নিয়ে।
টেকসই উন্নয়নের তিনটি শর্ত—পরিবেশ, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সামাজিক সমতা বিধান। আমাদের ঢাকার উন্নয়নে অর্থনীতি ব্যতীত বাকি দুটো বিষয়ই সম্পূর্ণভাবে উপেক্ষিত। এমনকি বর্তমানে ‘আবাসন শিল্প’-এর নামে যা চলছে, তা অর্থনৈতিকভাবে কতটুকু যৌক্তিক, এ প্রশ্নও জাগে। দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগণের সম্পদ ছলে-বলে-কৌশলে লুটে উচ্চবিত্তের জন্য প্লট-বাণিজ্য দেশের অর্থনীতিতে কী উন্নয়ন আনবে, তা বিচক্ষণতার সঙ্গে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। অতি মুনাফার লোভে কতিপয় ব্যবসায়ী যথেচ্ছভাবে জলাভূমি ও কৃষিজমি নিশ্চিহ্ন করছে, যার ফলে বাড়ছে বন্যা ও জলাবদ্ধতা; হুমকির মুখে পড়ছে খাদ্যনিরাপত্তা, সৃষ্টি হচ্ছে সামাজিক বৈষম্য ও অস্থিরতা, মানুষ হচ্ছে ছিন্নমূল। এক অনিবার্য বিপর্যয়ের দিকে যাচ্ছে আমাদের প্রাণপ্রিয় ঢাকা শহর। এই বন্যা ও জলাবদ্ধতার শিকার সাধারণ মানুষ, সর্বোপরি সরকার অর্থনৈতিকভাবে কী পরিমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তার হিসাব কি আমরা কেউ করে দেখেছি? চাকচিক্যময় বিজ্ঞাপনে আকৃষ্ট হয়ে মানুষ অনুমোদনহীন বিভিন্ন আবাসিক প্রকল্পে জমি কিনছে। জনগণকে প্রতারিত করছে—এমন তথাকথিত ‘আবাসন ব্যবসায়ী’-এর দায়ভার কেন জনগণ ও সরকার বহন করবে? একটি কথা, এসব আবাসন ব্যবসায়ী বলেন, তাঁরা আবাসন সমস্যার সমাধান করছেন। মোটা দাগে ঢাকার ৪০ শতাংশ লোক দরিদ্র, ৫০ শতাংশ লোক মধ্যবিত্ত। অথচ বাকি ১০ শতাংশ উচ্চবিত্তের হাতে নগরের প্রায় ৮০ শতাংশ সম্পদ, যাদের আবাসন ব্যবসায়ীরা ব্যবসার আড়ালে আরও সম্পদশালী করছেন। প্লটের পর প্লট উচ্চবিত্ত দখল করে রাখছেন ভবিষ্যতের মুনাফার আশায়। অন্যদিকে জমির ক্রমবর্ধমান মূল্য বৃদ্ধির কারণে নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা পাচ্ছে না মাথা গোঁজার ঠাঁই। আবাসন ব্যবসায়ীরা কোনো দিনও ঢাকার নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্তের জন্য কাজ করেননি, কিন্তু তাঁদের কার্যক্রমের ফলে সৃষ্ট পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রথম ও প্রধান ভুক্তভোগী এই জনগোষ্ঠী। কিছু দূরদর্শী ও বিবেকবান পেশাজীবী নগর দুর্বৃত্তায়নের এ ধারা আগেই অনুধাবন করেছিলেন; কেননা এ ধারা পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই বিদ্যমান। অনেক দেশেই সরকারের কঠোর হাত এই দুর্বৃত্তদের হাত থেকে রক্ষা করে জনগণ, প্রকৃতি ও সমাজকে।
১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের আওয়ামী লীগ সরকার মহানগর ঢাকাকে পরিকল্পনামাফিক গড়ে তোলা এবং এর প্রাকৃতিক সম্পদকে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে দুটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ নেয়, যার প্রথমটি ঢাকার মাস্টার প্ল্যান (DMDP) ও অন্যটি জলাধার সংরক্ষণ আইন। ঢাকার টেকসই উন্নয়নের জন্য প্রণীত মাস্টার প্ল্যানকে ১৯৯৭ সালে সরকার গেজেট আকারে আইনি ভিত্তি প্রদান করে (SRO NO-৯১-আই/৯৭, তারিখ ৫ এপ্রিল ১৯৯৭)। কিন্তু একটি গোষ্ঠী তার স্বার্থসিদ্ধির জন্য সরকারের প্রশংসনীয় এসব উদ্যোগকে সব সময়ই বাধাগ্রস্ত করে আসছে। তিন স্তরবিশিষ্ট এই প্ল্যানের তৃতীয় ধাপ Detailed Area Plan (DAP)। ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৮-এ খসড়া DAP-এর ওপর গণশুনানির জন্য সরকারি প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এ ছাড়া রাজউক প্ল্যান সম্পর্কে সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের অবহিত করার লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি পরামর্শ সভার (Consultation Meeting) আয়োজন করে। এ সময় খসড়া প্ল্যানটির বিভিন্ন পরিকল্পনাগত ও পরিবেশগত ত্রুটি-বিচ্যুতি সুশীল সমাজ, পেশাজীবী ও বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিগোচর হয় (বিস্তারিত দেখুন দি ডেইলি স্টার, ১৪.১২.২০০৮ পৃষ্ঠা, ৫, ২০.১২.২০০৮; প্রথম আলো, ২৩.১২.২০০৮, পৃষ্ঠা ১৪)। খসড়া DAP-এর প্রস্তাবনার পরিবেশগত ও সামাজিক বিরূপ প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে কিছু নমুনা নিচে দেওয়া হলো—
১। প্রস্তাবিত খসড়া DAP-এ DMDP নীতিমালা, ‘জলাধার সংরক্ষণ আইন ২০০০’ ও ‘পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ১৯৯৫’-কে সুস্পষ্টভাবে লঙ্ঘন করে যথেচ্ছভাবে বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (Flood Flow Zone), উপ-বন্যাপ্রবাহ অঞ্চল (Sub Flood Flow Zone), উচ্চফলনশীল কৃষিজমি (High Value Agricultural Land) ও কৃষিজমি এলাকায় আবাসিক ও মিশ্র ব্যবহার এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এতে ঢাকার বন্যা ব্যবস্থাপনা ও জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা চরমভাবে বিঘ্নিত হতো।
২। প্রস্তাবিত খসড়া DAP-এ ২০১৫ পর্যন্ত আবাসনের জন্য যে পরিমাণ জমি প্রয়োজন, তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ জমি আবাসনের জন্য বরাদ্দ করা হয়; যা অবশ্যই আবাসন ব্যবসায়ীদের স্বার্থ রক্ষার্থে করা হয়েছিল।
৩। যদিও ঢাকার জনগণের বৃহত্তর অংশ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত, কিন্তু এই পরিকল্পনায় তাদের প্রতি কোনো মনোযোগ দেওয়া হয়নি। ভূমি ব্যবহারের একটি বড় অংশ আবাসনের জন্য বরাদ্দ ছিল, যা অবশ্যই আবাসন ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন অনুমোদনহীন প্রকল্পের কথা চিন্তা করেই করা হয়। খসড়া DAP বাস্তবায়িত হলে ঢাকা শহর এবং শহরতলির নিম্ন ও মধ্যবিত্ত স্থায়ী বাসিন্দাদের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা বৃদ্ধি পেত।
৪। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাহিদার তুলনায় ঢাকায় উন্মুক্ত স্থানের পরিমাণ অত্যন্ত কম। সুযোগ থাকা সত্ত্বেও DAP-এ নগর পর্যায়ে স্বল্প পরিমাণ উন্মুক্ত স্থান প্রস্তাব করা হয়, যা প্রয়োজনের তুলনায় অত্যন্ত নগণ্য।
এমতাবস্থায় পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের সমালোচনার মুখে রাজউক ২৩.১২.২০০৮-এ একটি সেমিনারের আয়োজন করে। ওই সেমিনারে সুশীল সমাজ, পেশাজীবী, প্ল্যান প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠান, বিভিন্ন রিয়েল এস্টেট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এই সেমিনারে রাজউক খসড়া DAP উপস্থাপন করে। BIP, BAPA, BELA, IAB ও CUS-এর পক্ষ থেকে খসড়া DAP-এর বিভিন্ন প্রস্তাবের উল্লেখযোগ্য ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। ওই প্রতিবেদনের যৌক্তিকতা অনুধাবন করে সরকার অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশের বিশিষ্ট বিশেষজ্ঞ, পেশাজীবী ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি ড্যাপ পর্যালোচনা কমিটি (Review Committee) গঠন করে। ড্যাপ পর্যালোচনা কমিটি, রাজউক ও পরিকল্পনা প্রণয়নকারী প্রতিষ্ঠানগুলো আলোচনার মাধ্যমে ছয় মাসের মধ্যে একটি গ্রহণযোগ্য ও বাস্তবায়নযোগ্য DAP-এর জন্য সুপারিশমালা পেশ করে। পরে সরকার DAP প্ল্যান প্রতিবেদন চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরীকে আহ্বায়ক করে ৩ মার্চ ২০১০-এ ছয় সদস্যবিশিষ্ট একটি পর্যালোচনা কমিটি গঠন করে। ২৬ মার্চ ২০১০-এ এই কমিটি তাদের চূড়ান্ত রিপোর্ট সরকারের কাছে পেশ করে।
নদী-নালা, খাল-বিলকে গলা টিপে মারা, মানুষকে বাস্তুভিটা থেকে উচ্ছেদ করা যে কোনোভাবেই শিল্প নয়, তা সবারই বোধগম্য। জনগণের ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং পাঠকের কাছে অনুরোধ, তুরাগ ও বালু নদের কাছে যান, শুনবেন বালুর নিচে চাপাপড়া হাজারো মানুষের দীর্ঘশ্বাস, নদী ও জলাভূমির কান্না। অতি মুনাফালোভী, বিবেকহীন কিছু মানুষের কারণে আজ পৃথিবীর বুকে প্রথম সারির দূষিত নগর হিসেবে ঢাকা শহর চিহ্নিত। আমার, আপনার সন্তান বড় হচ্ছে প্রাণহীন কনক্রিটের খাঁচায়, দেখছে এক অসম শহরে প্রকৃতির মৃত্যু, ভোগবাদী সমাজের বিস্তার।
‘এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার’
যে শিশু ভূমিষ্ঠ হলো আজ রাতে, এই শহরে তার সুন্দর ও সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ছাড়পত্র আমরা আদায় করে নেবই। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের প্রতিশ্রুতি ও সংকল্প অনুযায়ী এগিয়ে যাবে, এ আমাদের প্রত্যাশা। আমরা আশা করি, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং মাননীয় গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিমন্ত্রী ঢাকা তথা দেশের পরিবেশ রক্ষায় যে দৃঢ়তার পরিচয় দিয়ে যাচ্ছেন, তা শত বাধার মুখেও অব্যাহত রাখবেন।
লেখকেরা: শিক্ষক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ, বুয়েট।

No comments

Powered by Blogger.