চারদিক-চলে আসুন জেন্ডার মেলায় by শিখ্তী সানী

নারীর ক্ষমতায়ন প্রতিষ্ঠায় কতটুকু এগিয়েছি আমরা? জেন্ডার সমতায়নের এ যাত্রায় সফল হয়েছি কি? সর্বক্ষেত্রে নারীর অবস্থান কোথায়? আন্তর্জাতিক নারী দিবস উপলক্ষে আগারগাঁওয়ের বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে আজ শুরু হচ্ছে দুই দিনব্যাপী জেন্ডার এবং উন্নয়ন মেলা।


ইউএসএইড আয়েজিত এই উন্মুক্ত মেলা পালন করছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং আহ্বান জানাচ্ছে দেশে নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতায়ন প্রতিষ্ঠায় সবার সঙ্গে মিলে কাজ করার। গত ৮ মার্চ সারা বিশ্ব পালন করেছে নারী দিবস, স্মরণ করেছে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীর সাফল্যকে। গুরুত্বের সঙ্গে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তি ও বিজ্ঞানে নারীর সম-অধিকার প্রতিষ্ঠায় কাজ করার শপথ নিয়েছে। এ দিবসের পরিপ্রেক্ষিতে মেলাটি সেই শপথকেই প্রতিধ্বনিত করার প্রয়াস। জেন্ডার সমতায়ন আর নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে কাজ করতে হবে সবাইকে একসঙ্গে। সে অগ্রযাত্রায় সচেতন নারী ও পুরুষের প্রয়োজন সমান অংশগ্রহণ। তাই জেন্ডার এবং উন্নয়ন মেলা আহ্বান করছে এ যাত্রায় একাত্মতা প্রকাশকারী সবাইকে। মেলার স্লোগান—‘শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তিতে নারী ও পুরুষের সমতা: নিশ্চিত করবে নারীর উন্নয়ন’।
২০০৯ সালে ইউএসএইড প্রথমবারের মতো জেন্ডার এবং উন্নয়ন বিষয়ে মেলার আয়োজন করে। সেবার মেলা বলতে মূলত জেন্ডারবিষয়ক বই এবং প্রকাশনা নিয়ে সচেতনতা সৃষ্টির প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। এ বছর আরও ঘটা করে মেলার আয়োজন করছে, সেখানে শুধু বই নয়; থাকবে নারী, জেন্ডার ও উন্নয়নবিষয়ক কর্মরত বিভিন্ন এনজিও, বেসরকারি সংস্থা, প্রকাশনা সংস্থা, সরকারি প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক সংস্থা, ইউএসএইডের সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ ডোনাররা। মেলায় সরকারের পক্ষ থেকে নারী ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়, তথ্য মন্ত্রণালয়, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয় উপস্থিত থাকবে। প্রায় ৯৫টি বুথের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের উন্নয়ন নিয়ে কাজ করছে, এমন প্রতিষ্ঠানগুলো তুলে ধরবে তাদের কাজের ক্ষেত্র ও সাফল্য এবং আদান-প্রদান করবে তথ্য ও অভিজ্ঞতা। ইউএসএইড জেন্ডার উপদেষ্টা মাহমুদা রহমান খান বললেন, ‘আমাদের সমাজে নারীদের ক্ষমতায়ন, সফলতা এবং জেন্ডার নিয়ে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। তাদের প্রত্যেকেরই লক্ষ্য নারীর সমতায়ন ও অধিকার প্রতিষ্ঠা। কাজ করতে গিয়ে প্রত্যেকেই আমরা নানা প্রতিকূলতার সম্মুখীন হই। এই মেলার মধ্য দিয়ে আমরা সমন্বয় করতে চাই সবার কাজকে। কারণ, এ অধিকার প্রতিষ্ঠা ও সমতায়ন আদায়ের আন্দোলনে আমাদের একসঙ্গে কাজ করতে হবে। মেলায় বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নারীরা কীভাবে নিজেদের ভাগ্যের পরিবর্তন করছেন, প্রতিষ্ঠানগুলোই বা কীভাবে কাজ করছে, তারা আমাদের নারীদের কী সুযোগ-সুবিধা দিয়ে থাকে, সেগুলো পরস্পরকে জানাবে, জানাবে আগত অতিথিদের। গ্রামের সংগ্রামী নারীরা দেখাবেন তাঁদের জীবনধারাকে, আদিবাসী নারীরা তাঁত বোনার মধ্য দিয়ে তুলে ধরবেন জীবন-জীবিকাকে। মন্ত্রণালয়গুলো জানাবে তাদের কাজের ক্ষেত্রের কথা, আশ্বাস দেবে সহযোগিতার। একই সঙ্গে সাহায্য প্রদানকারী সংস্থাগুলোও মেলার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে নারীদের অবস্থা এবং অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সম্পর্কে তথ্য আদান-প্রদান করবে। দর্শনার্থীরা পরিচিত হবেন নারীনেত্রীদের ও অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা প্রদানকারী নারী উদ্যোক্তাদের সঙ্গে, নারীদের আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী নারী ও সফল নারীদের সঙ্গে। মেলাটি বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল নারীদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে জয়গান গাইবে নারীদের।’
দুই দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের প্রথম দিন আজ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের শুরু সকাল ১০টায়। উপস্থিত থাকবেন মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী শিরীন শারমিন চৌধুরী, বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস এফ মরিয়ার্টি, ইউএসএইড মিশন পরিচালক ডেনিস রোলনস, সাংসদ তারানা হালিম এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা গীতি আরা সাফিয়া চৌধুরী। এর পর থেকে দিনব্যাপী মেলা চলতে থাকবে। থাকবে চিত্রশিল্প প্রদর্শন, তথ্যচিত্র সম্প্রচার, বিভিন্ন সচেতনতামূলক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও অভিজ্ঞতার আদান-প্রদান। মেলায় থাকবে একটি মুক্তমঞ্চ, যেখানে ‘বন্ধু’ যাঁরা Trans-Gender নিয়ে কাজ করছেন, তাঁরা তুলে ধরবেন সমাজে তাঁদের অধিকার প্রতিষ্ঠান কথা; ‘জাইকা’ তাদের অনুষ্ঠান প্রচার করবে মেলার দ্বিতীয় দিন। দ্বিতীয় দিন আমাদের আন্তর্জাতিক নারী দিবসের স্লোগানকে কেন্দ্র করে গোলটেবিল আলোচনা চলবে। উপস্থিত থাকবেন মন্ত্রী, নারীনেত্রী, বিজ্ঞানী, শিক্ষক, সাংবাদিক, সফল ব্যবসায়ী নেত্রীসহ সমাজের বিভিন্ন স্তরের সচেতন নাগরিকেরা।
মাহমুদা রহমান খান মনে করেন, নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠায় তাঁকেই প্রত্যয়ী হতে হবে। এ জন্য পুরুষের বিরুদ্ধে নয়, তাঁদের নিয়েই নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতায়ন প্রতিষ্ঠা সম্ভব। নারী দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত একটি মঞ্চনাটকের কথা জানিয়ে তিনি বললেন, নাটকটিতে এক নারী জানাল যে সে আর সন্তান ধারণ করতে রাজি নয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে নারীর জন্য বেঁধে দেওয়া গণ্ডিতে শোষিত, বঞ্চিত ও অত্যাচারিত নারী চায় না তার সন্তান এই পৃথিবীতে তার মতো পরিস্থিতি তৈরি করুক কিংবা শিকার হোক। পৃথিবীতে আঁধার নেমে এল, ফুল ফুটছে না, গাইছে না পাখি। পৃথিবীর পুরুষজাতি তখন করজোড়ে ভিক্ষা চাইল এই পৃথিবীর সন্তানদের, যাদের কেবল নারীরাই পৃথিবীতে নিয়ে আসে, বড় করে, মানুষ করে। নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলনে নারী ও পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব অনেক। তাদের এর ভার নিতেই হবে। নয়তো নারীরা যেমন আরও অসহায় হয়ে পড়বে, তেমনি পুরুষেরাও শতভাগ সফলতায় সামনে এগিয়ে যেতে পারবে না। প্রয়োজন, একসঙ্গে কাজ করার প্রচেষ্টা, সচেতনতা।

No comments

Powered by Blogger.