সময়ের প্রেক্ষিত-ভূমিকম্পের আলোকে পারমাণবিক বিতর্ক by মনজুরুল হক

গত শুক্রবার ভূমিকম্প আঘাত হানার পর আমি যখন প্রেসক্লাবের তুলনামূলক নিরাপত্তায় রাতের আশ্রয়ে অবস্থান করছিলাম, আমার সঙ্গে আরও বেশ কয়েকজন বিদেশি সাংবাদিক সেই রাতে সেখানে ছিল। এদের একজন হচ্ছে ডেভিড ম্যাকনিল, ব্রিটিশ দৈনিক ইনডিপেন্ডেন্ট-এর টোকিও ব্যুরোর প্রধান।


প্রেসক্লাবের কম্পিউটার টার্মিনাল কর্নারে পাশাপাশি আসন গ্রহণ করে আমরা যখন ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রতিবেদন লেখায় ব্যস্ত, ডেভিড তখন এক ফাঁকে আমাকে বলেছিল, পরদিন ভোরেই সে রওনা হবে ফুকুশিমার পথে। আমি জানতে চেয়েছিলাম, সবচেয়ে দুর্গত এলাকা হিসেবে গণ্য মিয়াগি জেলায় না গিয়ে সে কেন ফুকুশিমায় যাচ্ছে। উত্তরে তখনই সে আমাকে বলেছিল যে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ভূমিকম্পের প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে, তা কাছে থেকে দেখার জন্যই ফুকুশিমায় যাওয়ার পরিকল্পনা তার।
রাত দেড়টার দিকে বিদায় নিয়ে সে যখন দু-একটি লাইনে মাত্র চালু হওয়া রেল ধরার জন্য ক্লাব ছেড়ে চলে যায়, তখনো ঠিক নিশ্চিত ছিলাম না, আসলেই ফুকুশিমা সে যাচ্ছে কি না। কেননা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে সমস্যা দেখা দেওয়ার বিষয়টি তখনো খবরে প্রচারিত হয়নি এবং কোন ধরনের সমস্যা সেখানে দেখা দিতে পারে, সে সম্পর্কেও কারও তেমন কিছু জানা ছিল না। তবে ডেভিড ম্যাকনিলের সাংবাদিকসুলভ প্রখর চোখ আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল, কিছু একটা সেখানে ঘটে যেতে পারে এবং দুর্ঘটনা ঘটে গেলে তাকে যেন আর কপাল চাপড়ে বলতে না হয়, সময়মতো কেন সে সেখানে উপস্থিত ছিল না। সে রকম দুর্ভাগ্য এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যেই পরদিন, অর্থাৎ গতকাল ভোরে ফুকুশিমার উদ্দেশে সে টোকিও ত্যাগ করে এবং সেই যাত্রার প্রথম ফসল হিসেবে আজকের ইনডিপেন্ডেন্ট-এ ছাপা হয়েছে ফুকুশিমা থেকে পাঠানো তার প্রতিবেদন, ‘ওরা আমাদের বিশুদ্ধ হাওয়ার নিঃশ্বাস নিতে নিষেধ করছে—বিষয়টা খুবই ভয় জাগানো।’
ফুকুশিমার পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র যেখানে অবস্থিত, সেই গন্তব্যে পৌঁছানোর আগে প্রায় পরিত্যক্ত একটি পেট্রল স্টেশনে কর্মরত এক নারী এই কথাগুলো বলেছিল—ডেভিড ম্যাকনিল যে মন্তব্যকে প্রতিবেদনের শিরোনাম হিসেবে ব্যবহার করেছে। বিষয়টা যে কতটা ভয়ের, সাধারণ মানুষ তা পরিষ্কারভাবে আঁচ করতে না পারলেও ১৯৮৬ সালের চেরনোবিল দুর্ঘটনার হালকা হয়ে আসা স্মৃতি বয়স্ক ব্যক্তিদের অনেকের মনে সম্ভবত এর থেকে ফিরে আসে; এমনকি জাপান সরকারও যে দুশ্চিন্তা থেকে মুক্ত নয়, সরকারের দেওয়া বিভিন্ন বিবৃতি ও গৃহীত পদক্ষেপ থেকেও এর পরিষ্কার কিছু আভাস এখন পাওয়া যাচ্ছে। জাপান সরকারের প্রধান মুখপাত্র, মন্ত্রিসভার চিফ ক্যাবিনেট সেক্রেটারি ইয়ুকিও এদানো যেমন আজ সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন, ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত একটি পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে নতুন করে আবারও বিস্ফোরণ ঘটার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ফুকুশিমার দাই-ইচি বা ১ নম্বর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের তৃতীয় একটি ইউনিটেও যে হাইড্রোজেনের বিস্ফোরণ ঘটতে পারে, ওই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সে রকম ইঙ্গিত তিনি দিয়েছেন।
এদিকে জাপান সরকার ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে দুর্ঘটনার ঝুঁকির মাত্রা চতুর্থ পর্যায়ে উন্নীত করে নিয়েছে। শূন্য থেকে ৭ মাত্রার হিসেবে নির্ধারণ করা এই ঝুঁকির সর্বোচ্চ ৭ নম্বরে আছে পারমাণবিক চুল্লি গলে গিয়ে চারদিকে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়া, যা কিনা নাগরিক জীবনে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। জাপান সরকার মনে হয় সে রকম আশঙ্কাও এখন আর একেবারে বাতিল করে দিচ্ছে না, যদিও সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, পরিস্থিতি এখনো সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আছে এবং মাত্রাতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়া পারমাণবিক চুল্লি শীতল করে নিতে নানা রকম পন্থা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ গ্রহণ করছে। তবে ঘটনা হচ্ছে, কর্তৃপক্ষের গ্রহণ করা সে রকম একটি পদক্ষেপ থেকেই কিন্তু পরবর্তী কিছু সমস্যা ও উদ্বেগ দেখা দেয়।
ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালক প্রতিষ্ঠান টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি বিস্ফোরণের পর পারমাণবিক চুল্লি ঘরের কংক্রিটের ছাদ ও এক দিকের দেয়াল ধসে পড়ার পর চুল্লির ভেতরে জমা হতে থাকা চাপ কমিয়ে আনার চেষ্টায় সমুদ্রের পানি ও বরিক এসিড ব্যবহার করছিল। পরবর্তী সময়ে ৩ নম্বর চুল্লির ভেতরের জলাধারের চাপ কমিয়ে এনে ক্ষতি এড়ানোর জন্য বাষ্পীভূত হাইড্রোজেন সেখান থেকে বের করে দেওয়া হয়। এই কাজটি কতটা ঝুঁকিপূর্ণ, সে বিষয়ে অবশ্য বিজ্ঞানীদের মধ্যে মতানৈক্য রয়েছে। চুল্লির তেজস্ক্রিয় জ্বালানি এর চেয়ে জটিল পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি করে দিতে পারে বলে কেউ কেউ মনে করেন।
প্রথম বিস্ফোরণ যেখানে হয়েছিল, সেই ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিটি ৪০ বছরের পুরোনো। বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিচালক কর্তৃপক্ষ যে চুল্লির মাত্রাতিরিক্ত উত্তপ্ত হয়ে আসা বন্ধ করতে সমুদ্রের পানি ব্যবহার করে, এই বাস্তবতা প্রমাণ করছে যে অন্য সব রকম পন্থা কার্যকর হয়নি বলেই শেষ পর্যন্ত সমুদ্রের পানির ওপর কর্তৃপক্ষকে নির্ভর করতে হয়েছে। তবে প্রকৃত অবস্থা হচ্ছে এ রকম, তেজস্ক্রিয়তা এমন একটি ক্ষতিকর উপাদান, কোথা থেকে তা ছড়িয়ে পড়ে সাধারণ নাগরিকদের জন্য কোন পর্যায়ের বিপদ নিয়ে আসতে পারে, এর সবটা কিন্তু বিজ্ঞানীরা এখনো পর্যন্ত ধরে উঠতে পারেননি। আর এ কারণেই তাঁদের মধ্যে শীতলীকরণের পন্থা নিয়েও রয়েছে মতভেদ।
বৈজ্ঞানিক পর্যায়ের এমন সব বিতর্ক চলতে থাকার মুখে ফুকুশিমা পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তার পরিমাণ কিন্তু বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। জাপানের কিওদো বার্তা সংস্থার গতকাল প্রচারিত খবরেই বলা হয়েছিল যে তেজস্ক্রিয়তার মাত্রা সেখানে নিরাপদ হিসেবে গণ্য পর্যায় ছাড়িয়ে গেছে এবং টোকিও ইলেকট্রিক পাওয়ার কোম্পানি জরুরি পরিস্থিতি সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করেছে। এদিকে ফুকুশিমা জেলায় আরও ১৯ ব্যক্তির দেহে আজ তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসার চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যায়। তাঁরা সবাই হলেন ফুকুশিমা-১ পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কাছে অবস্থিত ফুতাবা শহরের অধিবাসী এবং অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অবস্থান করার সময় স্বাস্থ্য পরীক্ষায় তাঁদের দেহে তেজস্ক্রিয়তার উপস্থিতি ধরা পড়ে।
আবারও ডেভিড ম্যাকনিলের দেওয়া বর্ণনায় ফিরে গেলে আমরা দেখা পাব, ৩৩ বছর বয়সী স্থানীয় একজন পুরুষ নিজের দুর্দশার বর্ণনা দিয়ে যিনি বলছেন, ‘শুক্রবারের ভূমিকম্পের পর প্রাণের ভয়ে পালিয়ে পরিবার নিয়ে এখানে আমি উঠেছি। আর এখন দেখছি, আরেক উটকো ঝামেলা! রেডিওতে প্রচার হওয়ার আগেই তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার গুজব আমরা শুনেছিলাম। তবে আমরা খুবই ক্লান্ত।’
জাপানের ভূমিকম্প আর সুনামি জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানা দুর্গত এলাকার সেসব ক্লান্ত, অবসন্ন লোকজনের জন্য একটি সুখবর অবশ্য হচ্ছে এ রকম যে আন্তর্জাতিক সমাজ তাদের সেই দুর্দশার সময়ে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে কোনো রকম কার্পণ্য করছে না। জার্মানি, সুইজারল্যান্ড ও হাঙ্গেরির একদল উদ্ধারকারী গতকাল টোকিও এসে পৌঁছায় এবং দলের সদস্যরা ইতিমধ্যে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার তৎপরতা শুরু করেছেন। যুক্তরাষ্ট্র এবং সেই সঙ্গে চীনের একটি জরুরি সাহায্য দলও আজ জাপানে এসেছে।
আন্তর্জাতিক ত্রাণ তৎপরতা শুধু উদ্ধারকারী ও চিকিৎসক দল প্রেরণের মধ্যেই সীমিত থাকেনি। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আজ প্রচারিত এক বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, বিশ্বের ৭০টির বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠন জাপানের ভূমিকম্প-বিধ্বস্ত অঞ্চলের জনগণের জন্য ত্রাণসাহায্য পাঠানোর প্রস্তাব সম্পর্কে জাপান সরকারকে অবহিত করেছে। দীর্ঘ সেই তালিকায় এমনকি কম্বোডিয়া, পূর্ব তিমুর, মালদ্বীপ ও পাকিস্তানের মতো জাপানের উন্নয়ন সাহায্য লাভকারী অনেক দেশের উল্লেখ থাকলেও নেই সেখানে বাংলাদেশ। এ সম্পর্কে অবশ্য জাপানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মাজিবুর রাহমান ভূঁইয়ার বক্তব্য হচ্ছে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে সাহায্য প্রদানে সরকারের প্রস্তুত থাকা সম্পর্কে জাপানকে ইতিমধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। তবে সম্ভবত প্রক্রিয়াগত বিলম্বের কারণে বাংলাদেশ এখনো তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি।
জাপানের যে আন্তর্জাতিক সাহায্য, বিশেষ করে উন্নয়নশীল দেশের সাহায্য খুবই প্রয়োজন, তা কিন্তু মোটেও নয়। তবে কথা হলো, দুর্যোগে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়া একই সঙ্গে হচ্ছে একটি কূটনৈতিক তৎপরতা, যার প্রতীকী মূল্য কোনো অংশেই কম নয়। হতে পারে বন্ধুপ্রতিম কোনো রাষ্ট্র খুবই ধনী দেশ এবং বিদেশি সাহায্য দেশটির দরকার হয় না। তবে তার পরও বন্ধুরাষ্ট্রের জনগণের দুর্যোগে নিজেদের সাধ্যমতো সীমিত আকারে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে এ রকম একটি আন্তরিক অনুভূতির প্রকাশ তুলে ধরা সম্ভব যে আন্তর্জাতিক সংহতির আদর্শে আমরা আসলেই বিশ্বাসী। আর তাই সে রকম কোনো সুযোগ হাতছাড়া করা কিংবা বিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ দেশের স্বার্থের অনুকূল কোনো অবস্থাতেই গণ্য হতে পারে না।
টোকিও, ১৩ মার্চ ২০১১
মনজুরুল হক: শিক্ষক ও সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.