মনের কোণে হীরে-মুক্তো-নির্বাচনসর্বস্ব গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত যদি হয় ত্রুটিপূর্ণ by ড. সা'দত হুসাইন

কয়েক সপ্তাহ ধরে পশ্চিমা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন দেশের নির্বাচন পদ্ধতির অসম্পূর্ণতা এবং ত্রুটি-বিচ্যুতি সম্পর্কে আলোচনা-সমালোচনা এবং তথ্যবহুল নিবন্ধ ছাপা হচ্ছে। বিশেষ করে রাশিয়ার নির্বাচনের পর এ ধরনের লেখা প্রকটভাবে চোখে পড়ছে।


এসব লেখার মূল সুর একটিই_বিভিন্ন দেশে বর্তমান সময়ে অনুষ্ঠিত অনেক নির্বাচনই ত্রুটিপূর্ণ। শাসকদল কিংবা প্রভাবশালী গোষ্ঠী নানা কৌশলে নির্বাচনী ফলাফলকে তাদের অনুকূলে নিয়ে যেতে পারে। নির্বাচনী আইন প্রণয়ন, নির্বাচনী এলাকা নির্ধারণ থেকে শুরু করে ভোট গণনা এবং ফলাফল প্রকাশ করা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে তাদের প্রভাব লক্ষণীয়। এক কথায় নির্বাচনী ফলাফলে জনগণের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটে না। যেনতেন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নির্বাচিত হওয়ার পর নির্বাচিত শাসক গোষ্ঠীকে কোনো রকমেই জবাবদিহিতার আওতায় আনা যায় না। জনগণের দাবি, চাপ কিংবা সাধারণ গোছের আন্দোলনের বিপরীতে তাদের সাফ জবাব : ভোটাররা আমাদের একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শাসক হিসেবে নির্বাচিত করেছে, অতএব কোনো পরিবর্তন চাইলে আপনাদের পরবর্তী নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এর আগ পর্যন্ত আমাদের হয় সমর্থন দিতে হবে অথবা সহ্য করতে হবে।
বিশ্বের অনেক দেশের, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের নির্বাচন-পদ্ধতির মৌল কাঠামোতে বড় রকমের ত্রুটি থাকলেও এত দিন পর্যন্ত এ বিষয়ে নতুনভাবে আলোচনা-পর্যালোচনা করার প্রয়োজন আছে বলে কেউ মনে করেনি। এখন কয়েকটি দেশের নির্বাচনী ফলাফল এবং প্রশাসন ব্যবস্থা মনঃপুত না হওয়ায় পশ্চিমা বিশ্বের জ্ঞানী ব্যক্তিরা সামগ্রিক নির্বাচন ব্যবস্থার যৌক্তিকতা বা যথার্থতা সম্পর্কে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেছেন। নির্বাচিত সরকার এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে এত দিন পর্যন্ত সমার্থক হিসেবে দেখা হয়েছে। এ রীতিও আজ প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন না উঠলেও জনস্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য কয়েকটি দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন হয়েছে, নির্বাচিত সরকারপ্রধানকে ক্ষমতা ছেড়ে চলে যেতে হয়েছে। নতুনভাবে সরকার গঠিত হয়েছে।
সাধারণ নির্বাচনও এক ধরনের নিয়োগ-পদ্ধতি। যদিও বলা হয়, এ ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশের লোক তাদের নেতা নির্বাচন করে থাকে, প্রকৃতপক্ষে দেশের প্রধান নির্বাহী বাছাইয়ের লক্ষ্যে ভোটাররা তাদের ভোট প্রয়োগ করে থাকে। ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতে নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা প্রতিটি এলাকার জন্য একজন সংসদ সদস্য নির্বাচন করে। সংসদ সদস্যরা দেশের প্রধানমন্ত্রী তথা প্রধান নির্বাহী নির্বাচন করেন। যুক্তরাষ্ট্রে সাধারণ ভোটাররা 'ইলেকটোরাল' কলেজের সদস্য নির্বাচিত করেন। এসব সদস্য ভোট দিয়ে প্রেসিডেন্ট বা প্রধান নির্বাহী নির্বাচন করেন। দুই পদ্ধতিতেই পরোক্ষ ভোটে দেশের প্রধান নির্বাহী নির্বাচিত হয়ে থাকেন, সরাসরি নির্বাচনের কোনো ব্যবস্থা নেই। ওয়েস্ট মিনিস্টার পদ্ধতিতে নির্বাচনী এলাকার ভোটাররা পার্লামেন্টে আইন প্রণয়ন এবং পার্লামেন্ট সংশ্লিষ্ট কাজ সম্পাদনের জন্য তাদের প্রতিনিধি হিসেবে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করে। কিন্তু বাস্তবে তাদেরই একাংশ মন্ত্রী হিসেবে নির্বাহী ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। অন্য সদস্যরাও নানাবিধ প্রশাসনিক কাজে ব্যাপৃত হন। এক কথায় বর্তমান অবস্থায় নির্বাচনের প্রাথমিক লক্ষ্য এবং নির্বাচিত ব্যক্তির চূড়ান্ত অর্জনের মধ্যে অসংগতি পরিলক্ষিত হয়।
দুটি বিষয়ের প্রতি পণ্ডিতদের দৃষ্টি নিবদ্ধ : প্রথমটি হচ্ছে নির্বাচনের মাধ্যমে যথোপযুক্ত প্রতিনিধি/আইন প্রণেতা অথবা নির্বাহী পাওয়া যাচ্ছে না। নির্বাচনের মাধ্যমে যারা জয়ী হয়ে পার্লামেন্টে বা পাবলিক অফিসে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন, তাঁদের অনেকের প্রাক-নির্বাচনী কর্মকাণ্ড এবং ভাবমূর্তি গ্রহণযোগ্য মানের নয়। যে পদ্ধতিতে তাঁরা জয়ী হয়েছেন সেটিও প্রশ্নবিদ্ধ। নির্বাচন ব্যবস্থার ত্রুটি-বিচ্যুতি যে তাঁদের জয়ী হওয়ার ব্যাপারে বড় রকমের সহায়ক হয়েছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। যুক্তরাষ্ট্র সরকারের এক হাজারটি নির্বাচনের ওপর প্রণীত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করে একজন গবেষক দেখতে পেয়েছেন, প্রায় ৪০ শতাংশ নির্বাচন অর্থাৎ প্রায় ৪০০টি নির্বাচনের ক্ষেত্রে বড় রকমের অনাচার ঘটেছে। উদ্বেগের দ্বিতীয় বিষয়টি হচ্ছে, নির্বাচিত ব্যক্তিরা বা সরকার এর আত্ম বা গোষ্ঠী কেন্দ্রিকতা, জনস্বার্থের প্রতি উদাসীনতা, জনদাবির প্রতি অবজ্ঞা, স্বেচ্ছাচারিতা এবং ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা। শাসনতান্ত্রিক উপায়ে সুশাসন নিশ্চিত করতে সরকারকে বাধ্য করা বর্তমান অবস্থায় পৃথিবীর অধিকাংশ দেশেই একটি অসম্ভব ব্যাপার।
নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ত্রুটি-বিচ্যুতি দূরীকরণ এবং নির্বাচিত শাসক দলকে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত বা বাধ্যকরণের কৌশল নির্ধারণের ওপর পর্যালোচনা এবং গবেষণা চালাতে পণ্ডিতরা এখন বেশ আগ্রহী। যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের পরোক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে বড় রকমের গাণিতিক অসংগতি থাকা সত্ত্বেও ডিজিটাল বিশ্বে কেন এত দিন পর্যন্ত এ পদ্ধতিতে সংস্কার আনার জন্য কোনো অর্থবহ পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হয়নি, তা সহজবোধ্য নয়।
বিশেষ করে যখন দেখা গেল, পরোক্ষ পদ্ধতিতে মোট ভোট কম পাওয়া সত্ত্বেও একটি দল শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়, আর মোট ভোট বেশি পাওয়ার পরও অন্য দলকে বিরোধীদলীয় আসনে বসতে হয়, তখন নির্বাচন পদ্ধতির সংস্কার অত্যাবশ্যকীয় হয়ে পড়েছিল। ইউরোপের বিভিন্ন দেশে এই ত্রুটি দূরীকরণের জন্য ব্যবস্থা নেওয়া হলেও খোদ যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রে ত্রুটিপূর্ণ সনাতনি ব্যবস্থা সংশোধনের জন্য কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। ডিজিটাল যুগে সরাসরি নির্বাচনের লক্ষ্যে আলোচনা-পর্যালোচনা অনুষ্ঠিত হতে কোনো অসুবিধা আছে বলে আমার মনে হয় না।
নির্বাচিত প্রধান নির্বাহী যাতে দুর্নীতিপরায়ণ এবং স্বেচ্ছাচারী হতে না পারেন সেজন্য সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা ও আইন-কানুনের মাধ্যমে তাঁকে কঠোর জবাবদিহিতার আওতায় আনা সমীচীন হবে বলে জ্ঞানী ব্যক্তিদের অনেকেই মনে করেন। কী কৌশলে এটি করা যাবে তা বিশদ আলোচনা-পর্যালোচনার মাধ্যমে নির্ধারণ করা বাঞ্ছনীয় হবে। এ ক্ষেত্রে 'ইনকু্লসিভ প্রশাসন' বা দলমত নির্বিশেষে সব গোষ্ঠীর অংশগ্রহণের বিষয়টি আলোচনায় প্রাধান্য পেয়ে থাকে। তাঁদের মতে, আজকের বিশ্বে গণতান্ত্রিক শাসন বলতে সংখ্যা গরিষ্ঠ দল বা তার নেতার একক শাসন বোঝায় না, গণতান্ত্রিক শাসন বলতে সংখ্যা গরিষ্ঠ দলের নেতৃত্বে সব দলমতের অনুসারীদের সম্মিলিত শাসনকে বোঝায়। জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে সংসদ এবং সংসদের বাইরে বিশদ আলোচনার প্রয়োজন। আলোচনার মাধ্যমে ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত ব্যবস্থা এবং কৌশল নির্ধারণ করা যেতে পারে। তা সম্ভব না হলে গণভোট অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। বর্তমান ডিজিটাল যুগে গণভোট অনুষ্ঠান মোটেই দুরূহ কাজ নয়। সদিচ্ছাই বড় কথা।
আলোচনা, সমালোচনা, পর্যালোচনার এবং সংস্কারের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে যুগোপযোগী করার সময় এসেছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে মানবসমাজের জন্য সবচেয়ে উপযোগী এবং বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ শাসনব্যবস্থা মনে করা হয়। যদি তাই হয়, তবে সজ্জন ব্যক্তি কেন পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থা থেকে বিতাড়িত হবেন আর নির্বাচনসহ গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সব প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রিত হবে কালো টাকার মালিক, স্বার্থান্ধ, সমাজবিরোধী, প্রতারক, ভাঁওতাবাজ, দুর্নীতিবাজ এবং চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের দ্বারা। যদি গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখতে হয়, তবে এ ব্যবস্থার মূলশক্তি নির্বাচন পদ্ধতিসহ আনুষঙ্গিক সব প্রতিষ্ঠানকে এমনভাবে পুনর্নির্মাণ করতে হবে, যাতে উপরোক্ত বিপজ্জনক গোষ্ঠীগুলো থেকে এ ব্যবস্থা নিজেই নিজকে রক্ষা করতে পারে।
লেখক : সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও
পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যান

No comments

Powered by Blogger.