শামুকের পিঠে দ্রুত বিচার-দূর হোক বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি

বাংলায় শম্বুকগতি বলে একটা কথা আছে। দ্রুত বিচার যেন সেই শামুকের পিঠে চড়েছে। দ্রুত বিচার আইন আছে। কিন্তু বিচার দ্রুত শেষ হচ্ছে না। দ্রুত বিচার আইন প্রণীত হয় ২০০২ সালে। কার্যকর হয় ওই বছরই। তখন দেশে অপরাধপ্রবণতা বেড়ে যাওয়ায় তা রোধ করার জন্য দ্রুত বিচার আইন প্রণয়ন করা হয়েছিল।


এ আইনের ১০ ধারার ১ উপধারা অনুযায়ী, আদালত এই আইনের অধীন সংঘটিত অপরাধের বিচার সংক্ষিপ্ত পদ্ধতিতে সম্পন্ন করবেন। উপধারা ২-এ বলা হয়েছে, এই আইনের আওতায় চাঁদাবাজি ও ছিনতাই জাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে সাত কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে অভিযোগপত্র বা চার্জশিট দিতে হবে। আর আদালত ৩০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করবেন। অপরাধী হাতেনাতে ধরা না পড়লে ৬০ দিনের মধ্যে মামলার বিচারকাজ শেষ করতে হবে। অপরাধী হাতেনাতে ধরা না পড়ে যদি অন্য কোনো উপায়ে গ্রেপ্তার হয় বা আদালতে আত্মসমর্পণ করে, তাহলেও অভিযোগপত্র দাখিলের ৩০ দিনের মধ্যে বিচারকাজ শেষ করতে হবে। বিচারকাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করে দেওয়া হলেও ওই সময়ের মধ্যে মামলার বিচার শেষ হওয়ার নজির খুব একটা নেই। এই আইনের ১০ ধারার ১ উপধারার শেষ অংশে বলা হয়েছে, 'এই আইনে (দ্রুত বিচার আইনে) ভিন্নতর কিছু না থাকলে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ অধ্যায়ে বর্ণিত পদ্ধতি যত দূর প্রযোজ্য হয় অনুসরণ করবে।' আইনে সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হলেও ওই সময়ের মধ্যে মামলার বিচার শেষ না হলে কী হবে, তা বলা হয়নি। তাই এ ক্ষেত্রে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ অধ্যায় অনুসরণ করতে হবে। আর ফৌজদারি কার্যবিধিতে মামলা নিষ্পত্তির নির্ধারিত সময় নেই। সম্ভবত আইনের এই ফাঁকটুকুই সুযোগ হিসেবে নেওয়া হচ্ছে। আইনের এই ফাঁক গলে দীর্ঘ হচ্ছে দ্রুত বিচার আইনের বিচার। এই সুযোগটিই নেওয়া হচ্ছে।
আদালত সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে কালের কণ্ঠে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ঢাকার আট দ্রুত বিচার আদালতে বিচারাধীন মামলার সংখ্যা আট শতাধিক। ৩০ দিনের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তির কথা থাকলেও বেশির ভাগ মামলার একটি শুনানির পর আরেকটি শুনানির তারিখ নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ দিন পর। অনেক মামলা গড়িয়েছে দুই বছরেরও বেশি সময়। এ ক্ষেত্রে মামলার বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষকেই ক্ষতিগ্রস্ত হতে হচ্ছে। অনেক সময় মামলার বাদী ও বিবাদী পক্ষ আদালতে হাজির না হওয়ায়ও বিচার বিঘি্নত হয়।
দ্রুত বিচার আইনের শম্বুকগতির প্রধান কারণটিই হচ্ছে আইনের পেছনের দুর্বলতা। বিচারকাজ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ না হলে সেই মামলা ফৌজদারি কার্যবিধির ১২ অধ্যায় অনুসরণের মাধ্যমে শেষ করতে বলা হয়েছে, যেখানে ফৌজদারি মামলা নিষ্পত্তির কোনো নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেওয়া নেই। এ সুযোগেই দ্রুত বিচার আইনের মামলা নির্দিষ্ট সময়ে শেষ হচ্ছে না। দ্রুত বিচার আইনের লক্ষ্য ছিল দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করা। বাদী ও বিবাদী উভয় পক্ষের ভোগান্তি দূর করা। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জন সম্ভব হচ্ছে না। আইনই এখানে আইনের পথে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই আইন সংশোধন করা এখন জরুরি। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিচার সম্পন্ন না হলে তার জন্য কী ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে, তার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে জনস্বার্থে আইন সংশোধন করতে হবে। বিচারপ্রার্থী মানুষের ভোগান্তি দূর করতে এর বিকল্প নেই।

No comments

Powered by Blogger.