যুদ্ধাপরাধ-দেবতুল্য দাদা ও পাহাড়চুড়োর বাড়িটি by বিশ্বজিৎ চৌধুরী

মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী গ্রেপ্তার হওয়ার পর তাঁর স্ত্রী, ছেলে ও মেয়েরা অনেক আবেগময় বক্তব্য দিয়েছেন সংবাদপত্র ও বৈদ্যুতিক গণমাধ্যমগুলোতে। প্রবীণ এই রাজনৈতিক নেতাকে নির্যাতন করা হচ্ছে অভিযোগ করে তাঁরা স্মরণ করিয়ে দেন,


একজন সাংসদ হিসেবে প্রাপ্য সম্মান থেকে তাঁকে বঞ্চিত করা জাতীয় সংসদকে অবমাননার শামিল। আমরা তাঁদের এই বক্তব্য সমর্থন করি, বিশেষত, সালাউদ্দিন কাদেরের বড় মেয়ে ফারজিন কাদের চৌধুরী খুবই হূদয়স্পর্শী ভাষায় বলেছেন, ‘আমি জানি, অনেকেই আমার বাবাকে পছন্দ করেন না। তার পরও তিনি মানুষ। আমরা চাই বাবা সুবিচার পান’ (প্রথম আলো ১৯ ডিসেম্বর, ২০১০)। পত্রিকান্তরে সালাউদ্দিন কাদেরের মেয়ে বলেছেন, তাঁর বাবার নামে মিথ্যা প্রচারণা চালানো হচ্ছে, এমনকি তাঁর ‘দেবতুল্য’ দাদারও চরিত্র হনন করা হচ্ছে।
দাদা মানে ফজলুল কাদের চৌধুরীর নামের পাশে দেবতুল্য শব্দটির প্রয়োগে অনেকে বিস্মিত হতে পারেন, কিন্তু রক্তের সম্পর্কের আপনজনের প্রতি পক্ষপাত মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি বলেই আমরা তাতে খুব একটা অবাক হই না। কিন্তু ফারজিন কাদের চৌধুরী শিক্ষিত ও নবপ্রজন্মের মানুষ। স্বাধীন বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি নির্মোহভাবে এ দেশের ইতিহাস জানার চেষ্টা করলে এবং যুক্তিতর্ক ও বিবেচনা দিয়ে তাঁর বাবা সালাউদ্দিন কাদের ও দাদা ফজলুল কাদের চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবন ও কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করলে আমরা তাঁর বক্তব্য শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণ করতাম। কিন্তু নিজের বিচারবোধ প্রয়োগ না করে বাপ-দাদার কর্মকাণ্ডের দায় কাঁধে নিয়ে ফারজিন আমাদের হতাশ করেছেন। এতে পরিবারের প্রতি অন্ধ আনুগত্যের প্রকাশ আছে, দেশ ও জাতির প্রকৃত ইতিহাস জানার অনুসন্ধিৎসা নেই।
এ কথা তো সত্যি, ফারজিনের দাদা ফজলুল কাদের চৌধুরী তৎকালীন পাকিস্তানের একজন জাঁদরেল রাজনীতিক ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি চরম বৈষম্যের সময়ও এই মুসলিম লীগ নেতা পাকিস্তানের শিক্ষামন্ত্রী, জাতীয় সংসদের স্পিকার এবং সেই সূত্রে কয়েকবার পাকিস্তানে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতিও হয়েছেন। স্পিকার থাকাকালে তিনি সব সময় নিরপেক্ষ থাকার চেষ্টা করতেন বলে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতারাও স্বীকার করেছেন। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারেও তাঁর অবদানের কথা স্মরণ করেন বিদ্বজ্জনেরা।
এসব কৃতিত্ব ও অবদানের কথা স্বীকার করার পর বলতে হবে, ফজলুল কাদের চৌধুরী এ দেশের মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষার সঙ্গে, স্বাধিকারের চেতনার সঙ্গে চিরদিনই বিরোধিতা করেছেন। এই বিরোধিতা শুধু আদর্শিক হলে বলার কিছু ছিল না। কিন্তু ফজলুল কাদের মুক্তিসংগ্রামী বাঙালির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে পাকিস্তানি সেনা ও এদেশীয় রাজাকারদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তাঁর নির্দেশে এ অঞ্চলে হত্যা-লুণ্ঠন-ধর্ষণ—হেন কোনো অপকর্ম নেই, যা করেনি এই সেনা ও রাজাকাররা।
পাকিস্তান আমলে আদর্শের দিক থেকে মুসলিম লীগের নেতা-সমর্থক ছিলেন অনেকেই। এমনকি পাকিস্তান অবিভক্ত থাকুক, এই আকাঙ্ক্ষাটাও ছিল অনেকের মনে। কিন্তু স্বদেশবাসীর ওপর যে অত্যাচার-নির্যাতন চালিয়েছিলেন ফারজিনের দেবতুল্য দাদা, তার দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ফজলুল কাদের চৌধুরী ও তাঁর ছেলের অত্যাচার-নির্যাতনের অনেক ঘটনাই আজও বিস্মৃত হননি এলাকার মানুষ। কেননা, ৪০ বছর এমন কিছু দূরের সময় নয়। অধ্যক্ষ নূতনচন্দ্র সিংহকে হত্যা বা রাউজানের জগৎমল্লপাড়া ও ঊনসত্তরপাড়ার শতাধিক সংখ্যালঘুকে হত্যার বিষয়টি বহুল আলোচিত, এ প্রসঙ্গে কিছু বলতে চাই না। শুধু ফারজিন কাদেরকে অনুরোধ করি, রহমতগঞ্জের একটি পাহাড়চুড়োয় ‘গুডস হিল’ নামে আপনার দেবতুল্য দাদার যে বাড়িটিতে আপনারা দীর্ঘদিন বাস করে আসছেন, তার প্রতিটি দেয়ালে একবার কান পাতুন—শুনতে পাবেন অনেক মুক্তিযোদ্ধার গোঙানির প্রতিধ্বনি। আনোয়ারার আবদুল কাদের ও নূরুল আমিন এখনো বেঁচে আছেন, তাঁদের সঙ্গে একবার কথা বলার চেষ্টা করুন। অকথ্য নির্যাতনের চিহ্ন এখনো শরীরে বয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা, একবার স্বচক্ষে দেখুন। তখনকার পিকিংপন্থী রাজনীতিক ব্যারিস্টার সলিমুল্লাহ খান মিল্কি কী কষ্ট করে তাঁদের সেই পাহাড়চুড়োর বাড়ি থেকে জেলখানায় পাঠিয়েছিলেন, সেই ঘটনাটি জেনে নিন, তাহলে বুঝতে পারবেন আপনার দেবতুল্য দাদার বাড়ির তুলনায় জেলখানাও ছিল স্বর্গতুল্য।
একাত্তর সালে এই বাড়িতে মুক্তিযোদ্ধা ওমর ফারুককে হত্যা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ আছে। না, মৃত ব্যক্তিকে সাক্ষী মানব না। বরং এখনো বেঁচে আছেন এমন দুজনের কাছে ওই বাড়িতে কয়েকটি দিন কাটানোর অভিজ্ঞতা শোনা অনেক বিশ্বাসযোগ্য হবে।
তখন মাত্র ১৮ বছর বয়স নিজামুদ্দিনের। আরও কয়েকজন সহযোদ্ধাসহ নগরের হাজারি লেনের একটি পোড়োবাড়িতে আস্তানা গেড়েছিলেন তিনি। এর মধ্যে বন্ধুদের একজন ধরা পড়ায় এই গোপন আস্তানার খবর জেনে গিয়েছিল শত্রুপক্ষ। ১৯৭১ সালের ৫ জুলাই সেই বাড়ি থেকে দুই সহযোদ্ধাসহ নিজামকে গ্রেপ্তার করা হয়। নিজামউদ্দিন বলেন, ‘তিন পাকিস্তানি সেনা ও দুই রাজাকারের এই দলের সঙ্গে একজন তরুণ ছিলেন, যাকে সবাই চৌধুরীর ছেলে বলে পরিচয় দিচ্ছিলেন। আমার ধারণা, তিনিই সালাউদ্দিন কাদের, তবে এত বছর পর আমি তা নিশ্চিত করে বলতে পারব না।’ পিছমোড়া করে বেঁধে তাঁদের নিয়ে আসা হলো গুডস হিলে। তখন ফকা চৌধুরী ড্রইংরুমে কয়েকজনের সঙ্গে আলাপ করছিলেন। তাঁদের দেখেই ক্ষিপ্ত হয়ে মা তুলে অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ শুরু করলেন চৌধুরী এবং মুখে ও বুকে এলোপাতাড়ি ঘুষি মারতে থাকলেন। ঘুষি মারা বন্ধ হতেই তাঁর দেহরক্ষী পাকিস্তানি সেনাটি শুরু করল প্রচণ্ড মারধর। এরপর সাদা পোশাকে কয়েকজন সেনা এসে নিজামকে তুলে নিয়ে গেল জিজ্ঞাসাবাদের জন্য। ইতিমধ্যে দুই সঙ্গী থেকে আলাদা করে ফেলা হয়েছে তাঁকে। শুরু হলো আরেক দফা নির্যাতন। চাবুক, লাঠি ও অন্যান্য শক্ত জিনিস দিয়ে কয়েক ঘণ্টা এমনভাবে আঘাত করা হলো, নিজামুদ্দিনের পুরো শরীর প্রায় নিথর হয়ে গিয়েছিল। নিজাম বলেন, ‘একপর্যায়ে মনে হচ্ছিল, যেকোনো মুহূর্তে মরে যাব আমি। গভীর রাতের দিকে নির্যাতনকারীরা ক্লান্ত হয়ে কিছুক্ষণের জন্য রেহাই দিয়েছিল। একটি ছেলে ও একটি মেয়ে এসেছিল কক্ষটিতে। এখনো মনে আছে, তারা আমাকে মৃতপ্রায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখে কৌতুক করছিল আর হাসছিল।’
এরপর নিয়ে যাওয়া হলো ওই বাড়ির গ্যারেজে। সেখানে দুই সঙ্গীকেও দেখতে পেলেন নিজাম। বোঝা গেল, একই রকম অত্যাচারের ঝড় বয়ে গেছে তাঁদের ওপরও। এরপর একটি কাঠের খুঁটির সঙ্গে বেঁধে আরেক দফা নির্যাতন শুরু হলো। ‘সেই দুঃসহ কষ্টের বর্ণনা দেওয়ার ভাষা আমার জানা নেই। কিন্তু সেই রাতটাও পোহাল।’ সকালে একটা রুটি আর এক কাপ চা দেওয়া হয়েছিল তিনজনকে। কেউ একজন হাতের বাঁধনও খুলে দিয়েছিল। খেতে গিয়ে বুঝতে পারলেন, হাত দিয়ে খাবার তুলে নেওয়ার বা মুখ দিয়ে চিবানোর সামর্থ্য নেই...। ৬ জুলাই ওই বাড়ি থেকে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল নিজামকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন তিনি।
সালেহউদ্দিনকে মোহরার একটি বাড়ি থেকে ধরে আনা হয়েছিল জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে, তারিখটি তাঁর মনে নেই। আগের রাতে একটি অপারেশন শেষ করে ভোর চারটার দিকে এসে ঘুমিয়েছিলেন। ভোর পাঁচটায় শিকারপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শামসু মিয়া অন্য তিনজন রাজাকারসহ এসে তাঁকে আটক করে পাকিস্তানি সেনাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় গুডস হিলের সেই বাড়িতে। সালেহউদ্দিন বলেন, ‘গিয়ে দেখি, একটি ইজি চেয়ারে বসা ফজলুল কাদের। জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কি সালেহউদ্দিন? তক্তা দাও।’ শুরু হলো নির্যাতন। একপর্যায়ে সেখানে সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী এসে নির্যাতনকারীদের বললেন, ‘কী মারলি, চোখের পানিই তো বের হয়নি। এরপর শুরু হলো আরও নিষ্ঠুর নির্যাতন। গ্যারেজে নিয়ে মোটরব্রিজের মাঝখানে ফেলে চলে দফায় দফায় নির্যাতন। নির্যাতনের মধ্যেই একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলি, আবার জ্ঞান ফিরে পাই। এভাবে চলতে থাকে সারা দিন। পুরো শরীরে জখম তো হয়েছিলই, পরনের কাপড়চোপড় পর্যন্ত টুকরো টুকরো হয়ে গিয়েছিল। আমার সামনেই একজনকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল মেরে ফেলার জন্য। আমিও প্রায় নিশ্চিত মৃত্যু ধরে নিয়েছিলাম। এর মধ্যে নূরুল ইসলাম নামের একজন এনএসএফ সদস্য আমাকে চিনত। সে জানত আমি ছাত্রলীগ করতাম না, ছাত্র ইউনিয়ন করতাম। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে জড়িত কি না। আমি না বলতে সে নির্যাতন থামানোর ব্যবস্থা করে। পরে বাদশা মিয়া সওদাগর, মাইজ্যা মিয়া মেম্বার প্রমুখ আমার পক্ষে সাফাই দিলে মুক্তি মেলে।’
নিজামুদ্দিন ও সালেহউদ্দিন—দুজনই এখনো শরীরে বহন করছেন সেই দুঃসহ নির্যাতনের স্মৃতিচিহ্ন। সেদিনের সেই দুই তরুণ আজ সমাজে প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি। নিজামুদ্দিন আহমেদ বিশিষ্ট সাংবাদিক, বর্তমানে বার্তা সংস্থা রয়টারের ঢাকা প্রতিনিধি। আর ড. সালেহউদ্দিন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, এখন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য।
ফারজিন, আপনার দাদাকে আপনি দেবতুল্য বলেছেন, তাতে আমাদের বলার কিছুই নেই। আপনজনদের প্রতি শ্রদ্ধা-ভালোবাসা থাকা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু ইতিহাস নির্মোহ। মনে রাখতে হবে, মানুষের কৃতকর্মের ইতিহাসই তাঁকে দেবতা বা দানবে রূপান্তরিত করে।
বিশ্বজিৎ চৌধুরী: কবি, লেখক ও সাংবাদিক।
bishwa_chy@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.